বাংলাদেশের নির্বাচন ভারতের জন্য সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ

বাংলাদেশের নির্বাচন ভারতের জন্য সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং অস্থিরতার পর ব্যালট বাক্সে এক চূড়ান্ত রায় দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এই ফলাফলের প্রভাব বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বহুদূর বিস্তৃত। প্রতিবেশী ভারতের জন্য এই ফলাফল সেই সম্পর্ককে পুনর্গঠন বা ‘রিসেট’ করার একটি সুযোগ এনে দিয়েছে, যা পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলের পতনের পর থেকে তিক্ততায় আচ্ছন্ন ছিল।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের মিত্ররা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নির্বাচন কমিশন সারা দেশে ৬০.৩ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা ঘোষণা করেছে, যা ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের চেয়ে বেশি। সে সময় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪১.৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, দেশটি পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত।

২০২৪ সালের সেই নির্বাচনটিই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সূচনালগ্ন, যাদের এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিষিদ্ধ ছিল। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত। মূলত একটি তরুণ-প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন যখন তার উত্তরোত্তর স্বৈরাচারী ও বংশানুক্রমিক শাসনের অবসানের দাবিতে জাতীয় বিক্ষোভে রূপ নেয়, তখনই তার পতন ঘটে।

হাসিনার আমলে ভারতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতার যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেও সেই টানাপোড়েন বজায় ছিল, যাদের দায়িত্ব ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং এই ভোট কার্যক্রম তদারকি করা।

তবে বিএনপির প্রত্যাবর্তন যে বংশানুক্রমিক রাজনীতির অবসান ঘটাবে, তা নয়। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে। তার মা খালেদা জিয়া, যিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন; নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ডিসেম্বর মাসে মারা যান। গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত এই দুটি দল এবং তাদের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের সাথে তার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, যা গত এক দশকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে আরও বেগবান হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে টানাপোড়েন থাকলেও হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে বাংলাদেশের এই বিশাল প্রতিবেশীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যক ভোটে জয়ী হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যক ভোটে জয়ী হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

বিএনপির বিগত শাসনকালগুলোতে ভারতের সাথে সম্পর্ক প্রায়ই শীতল ছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার মতো তা এতটা উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছিল।

বিএনপি যখন সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিল, তখন ভারত অভিযোগ করেছিল যে, ঢাকা ভারত-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ ছাড়াও দিল্লি বারবার বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং চীনের সাথে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

বর্তমানে ভারত এই নির্বাচনের ফলাফলকে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগ হিসেবে দেখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের পরদিনই মোদি তারেক রহমানকে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশ যে ‘গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী’, সেই বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে, তারেক রহমানও ভারতের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের কাজ শুরু করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন যে, তিনি ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সম্পর্ক’ বজায় রাখতে চান।

ভারত তার অন্য কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে অস্থিরতা এড়াতে চাইবে, বিশেষ করে মালদ্বীপ ও নেপালের সঙ্গে সাম্প্রতিক তিক্ততা এবং পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার প্রেক্ষাপটে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সীমানার ৯০ শতাংশেরও বেশি যুক্ত থাকায়, এ দেশে স্থিতিশীলতা বজায় থাকা ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

এই সম্পর্কের অন্যতম প্রাথমিক পরীক্ষা হবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ ইস্যুটি, যেখানে গত বছর একটি সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি এখন মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন। বিষয়টি যেন দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কের ওপর আরও প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য দিল্লির উচিত তাকে তৃতীয় কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা, যাতে শুরুতেই এই উত্তেজনার অবসান ঘটে। যদিও এটি ঢাকা হয়তো ভালোভাবে গ্রহণ করবে না, তবে এটি অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা দূর করবে।

বর্তমানে ভারত এই নির্বাচনের ফলাফলকে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগ হিসেবে দেখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল
বর্তমানে ভারত এই নির্বাচনের ফলাফলকে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগ হিসেবে দেখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল

অগ্রগতির আরেকটি সুযোগ হতে পারে দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরবঙ্গের সেচ কাজের জন্য তিস্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবনরেখা। এক দশকেরও বেশি সময় আগে একটি খসড়া চুক্তি সম্পাদিত হলেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে তা আর চূড়ান্ত হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার তিস্তা নদীর অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যার তীব্র বিরোধিতা করেছিল দিল্লি। এই চীনা প্রকল্পটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সংযুক্তকারী মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’-এর খুব কাছে অবস্থিত। এই উত্তেজনা নিরসন করতে পারলে দুই দেশই সম্পর্কের ক্ষেত্রে সদিচ্ছার সংকেত দিতে পারবে।

বর্তমানে বেইজিং বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার বিনিয়োগ বন্দর থেকে শুরু করে ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা খাত পর্যন্ত বিস্তৃত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই সম্পর্ক থেকে সরে আসবে–এমন সম্ভাবনা কম। বরং তারেক রহমান সম্ভবত বেইজিং ও দিল্লি–উভয় পক্ষের সাথেই সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলবেন।

ভারতকে এটি মেনে নিতে হবে যে, চীন অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ছাড়ছে না এবং এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ভারতকে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। একই সাথে ঢাকাকেও কোনো একক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতার ফলে সৃষ্ট ঋণ এবং কৌশলগত ঝুঁকিগুলো সতর্কতার সাথে সামলাতে হবে।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশের উন্নয়ন ও সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মতো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি আসলে কী উপহার দিতে পারে।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দল নিরপেক্ষ, স্বাধীন থিংক ট্যাংক লোয়ি ইনস্টিটিউট পরিচালিত দ্য ইন্টারপ্রেটর-এর লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত।

গ্রেস করকরান অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের ‘ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ নীতি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক। এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মিনিলেটারালিজম এবং উন্নয়ন সহযোগিতা আগ্রহের বিষয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ, কৌশলগত উদ্যোগ এবং নীতি গবেষণার নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গ্রেসের আট বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে।

সম্পর্কিত