চরচা ডেস্ক

দশকের পর দশক ধরে ইরানে যেসব অস্থিরতা হয়ে আসছে, সবগুলোই একটি নির্দিষ্ট ধাঁচ অনুসরণ করে। এসবের শুরু হয় মূলত কোনো একটি উসকানিমূলক ঘটনা দিয়ে—তা হতে পারে কোনো হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনে কারচুপি কিংবা মুদ্রার আকস্মিক দরপতন। আর এসব ঘটনার পরবর্তী বিক্ষোভগুলো সাধারণত নেতৃত্বহীন এবং অসংগঠিত ধরনের হয়। বিক্ষোভ যদি যথেষ্ট বড় আকার ধারণ করে, তবে শাসনব্যবস্থা তাদের দমন-পীড়নের চিরাচরিত পথ বেছে নেয়। ব্যবহার করা হয় সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী, বন্ধ হয় ইন্টারনেট, চলে গণগ্রেপ্তার। এর মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরলেও মূল সমস্যার সমাধান হয় না। কয়েক বছর পর আবারও একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ইলেকট্রনিক্স বিক্রেতারা ধর্মঘট শুরু করেন। এসব ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ পণ্যই আমদানিকৃত এবং মুদ্রার চরম দরপতনের ফলে এসব পণ্য কেনাবেচা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘তেহরানের হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত গ্র্যান্ড বাজারের দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও এই কর্মবিরতিতে যোগ দিয়েছেন। বিক্ষোভ রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং এখনও অব্যাহত রয়েছে।
২০২২ সালের পর এটিই ইরানে দেশের সবচেয়ে বড় অস্থিরতা। তবে এখনও দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়নি। বেশিরভাগ মিছিলে মাত্র কয়েক শ মানুষ অংশ নিচ্ছে এবং এগুলো মূলত এমন সব মফস্বল শহরে কেন্দ্রীভূত, যা খুঁজে পেতে তেহরানের বাসিন্দাদেরও মানচিত্রের সাহায্য নিতে হতে পারে। সারা দেশে কারখানা এবং সরকারি অফিসগুলো এখনও খোলা রয়েছে।
তা সত্ত্বেও, সরকারকে এবার অনেক বেশি আতঙ্কিত মনে হচ্ছে। তেহরানের কেন্দ্রস্থলের গলিগুলোতে দাঙ্গা পুলিশ এবং জলকামান মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকের বাহিনী মোড়ে মোড়ে জটলা হওয়ার আগেই মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। গণবিক্ষোভ ঠেকাতে ‘বায়ু দূষণের অজুহাতে’ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এবারের বিক্ষোভ আগের ধরণ থেকে দুটি কারণে আলাদা। প্রথমত, শাসনব্যবস্থার দেউলিয়া দশা (আর্থিক ও আদর্শিক উভয় দিক থেকেই) এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান। ইরান গত এক বছর ধরে অর্থনৈতিক ধস, যুদ্ধ এবং পরিবেশগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির নেতাদের কাছে এসব সমস্যার কোনো সমাধান নেই। দ্বিতীয়ত, বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা, তা ইসরায়েল বা আমেরিকা—যার মাধ্যমেই হোক। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা থেকে নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর অনেক ইরানি এখন ভাবছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য তাদের দেশ হতে পারে কিনা।
এই বিক্ষোভের মূলে রয়েছে সেই জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ, যাদের একসময় সরকার নিজেদের লোক বলে মনে করত। আর তারা হলো বেকার তরুণ সমাজ। রাষ্ট্র তাদের দাবির কোনো জবাব দিতে পারছে না।
২০২২ সালে সরকার পোশাকের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে এবং নৈতিকতা পুলিশ তুলে নিয়ে বিক্ষোভ প্রশমিত করেছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটের ক্ষেত্রে এমন কোনো সহজ সমাধান নেই। বিক্ষোভের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন, “আমি কিছুই করতে পারছি না।”
ইরানি মুদ্রার মান কমছেই। বর্তমানে এটি প্রতি ডলারে ১৫ লাখ রিয়ালে লেনদেন হচ্ছে। গত এক বছরে এর মান ৪৫% এবং গত দশকে ৯৮% কমেছে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দরিদ্র ইরানিরা না খেয়ে থাকছেন। পেজেশকিয়ানের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান চেষ্টা ছিল আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ বিনিময় হার বাতিল করা এবং সেই অর্থ দিয়ে প্রতিটি নাগরিককে মাসে ১ কোটি রিয়াল করে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া।
নীতিগতভাবে এটি ভালো উদ্যোগ হলেও, এই অর্থের পরিমাণ ৮ ডলারের চেয়েও কম, যা দিয়ে বড়জোর এক ব্যাগ চাল বা এক বোতল ভোজ্যতেল কেনা সম্ভব। এ ছাড়া একক বিনিময় হার চালু করায় মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে, যা ইতিমধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি স্বীকার করেছেন, এর ফলে মুরগি ও ডিমসহ নিত্যপণ্যের দাম “উল্লেখযোগ্যভাবে” বৃদ্ধি পাবে।

সরকার যদি সংস্কারের মাধ্যমে সংকট কাটাতে না পারে, তবে দমন-পীড়নও বুমেরাং হয়ে ফিরবে। আহত বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করতে নিরাপত্তা বাহিনীর হাসপাতালে অভিযানের ফুটেজ জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। বন্দিদের মুক্ত করতে কোনো কোনো বিক্ষোভকারী থানায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। যে ধর্মীয় আদর্শ একসময় এই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল, তা এখন ম্লান হয়ে গেছে।
এদিকে, বিচ্ছিন্ন বিরোধীরা এখন ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহের নির্বাসিত ছেলেকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। রাজতন্ত্র এখনও অনেকের কাছেই অপছন্দের। কিন্তু যারা একসময় রেজা পাহলভিকে গুরুত্ব দিতেন না, তারা এখন এই ৬৫ বছর বয়সী ব্যক্তিকে নিয়ে ‘সিরিয়াসলি’ ভাবছেন।
পেছনের পটভূমিতে কাজ করছে আরেকটি যুদ্ধের হুমকি। ইসরায়েল গত গ্রীষ্মে ইরানে ১২ দিন ধরে বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্বিতীয় দফায় হামলার জন্য উন্মুখ বলে মনে হচ্ছে। কারণ ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। গত ২৯ ডিসেম্বর মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সাক্ষাতে যুদ্ধের বিষয়টি আলোচনায় ছিল।
২ জানুয়ারি ট্রাম্প নিজেও হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যেন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা না করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “আমেরিকা তাদের উদ্ধারে আসবে। আমরা প্রস্তুত এবং লক্ষ্যভেদে বদ্ধপরিকর।” তিনি আসলে কী বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়: কেবল শক্তির মহড়া নাকি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযান?
এর পরের দিনই মার্কিন কমান্ডোরা ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালায়। তার মানে এই নয় যে, আমেরিকা ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ধরতে একই ধরণের অভিযান চালাবে। ১৯৮০ সালে জিম্মি সংকটের সময় তেহরানে চালানো শেষ মার্কিন অভিযানটি তাদের লজ্জার ইতিহাস। ওই সময় মরুভূমিতে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে এবং আটজন মার্কিন সেনা নিহতের মাধ্যমে অভিযান ব্যর্থ হয়।
তবে মাদুরোর দ্রুত পতন ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক কর্মকর্তা খামেনির মৃত্যুর পর দেশে পরিবর্তনের অপেক্ষা করছিলেন। তারা এখন সেই পরিবর্তনটি আরও আগেই চাইছেন। নির্বাসিত এক ইরানি বিশ্লেষক বলেন, “পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, সরকার এখন বলির পাঁঠা খুঁজছে।”
কেউ কেউ ভেনেজুয়েলা স্টাইলে সমাধান খুঁজছেন। আর তা হলে শাসনব্যবস্থাকে বাঁচাতে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেওয়া। আয়াতুল্লাহ আলি খামিনিকে একজন শক্তিশালী সামরিক নেতার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাঈদ লায়লাজ। তিনি সংসদ স্পিকার এবং আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি গত বছর যুদ্ধের সময় খামেনি আত্মগোপনে থাকাকালীন অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে শোনা যায়। এমনকি আইআরজিসির সম্মতিতে শেষ চেষ্টা হিসেবে রেজা পাহলভির নামও আলোচনায় আসতে পারে।
তবে খামেনি হয়তো অন্য কোনো পথ বেছে নিতে পারেন। তেহরানের বিশাল বিলবোর্ডগুলোতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পতাকায় মোড়ানো কফিনের ছবি দেখা যাচ্ছে। উপদেষ্টারা হুমকি দিচ্ছেন, বিদেশি হামলা হলে তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি শহরগুলোতে হামলা চালিয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করবেন। এতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও শঙ্কিত। হয়তো খামেনির সহযোগীরা আবারও দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছেন, যেমনটি তারা গত জুনের যুদ্ধের সময় করেছিলেন। এবার কী তা কাজে দেবে?
যেভাবেই হোক, খামেনির শাসনামলের ৩৭তম বছরটি শেষ শাহের মতোই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, যিনি ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পরেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
দ্য ইকোনোমিস্টের নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত

দশকের পর দশক ধরে ইরানে যেসব অস্থিরতা হয়ে আসছে, সবগুলোই একটি নির্দিষ্ট ধাঁচ অনুসরণ করে। এসবের শুরু হয় মূলত কোনো একটি উসকানিমূলক ঘটনা দিয়ে—তা হতে পারে কোনো হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনে কারচুপি কিংবা মুদ্রার আকস্মিক দরপতন। আর এসব ঘটনার পরবর্তী বিক্ষোভগুলো সাধারণত নেতৃত্বহীন এবং অসংগঠিত ধরনের হয়। বিক্ষোভ যদি যথেষ্ট বড় আকার ধারণ করে, তবে শাসনব্যবস্থা তাদের দমন-পীড়নের চিরাচরিত পথ বেছে নেয়। ব্যবহার করা হয় সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী, বন্ধ হয় ইন্টারনেট, চলে গণগ্রেপ্তার। এর মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরলেও মূল সমস্যার সমাধান হয় না। কয়েক বছর পর আবারও একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ইলেকট্রনিক্স বিক্রেতারা ধর্মঘট শুরু করেন। এসব ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ পণ্যই আমদানিকৃত এবং মুদ্রার চরম দরপতনের ফলে এসব পণ্য কেনাবেচা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘তেহরানের হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে পরিচিত গ্র্যান্ড বাজারের দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও এই কর্মবিরতিতে যোগ দিয়েছেন। বিক্ষোভ রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং এখনও অব্যাহত রয়েছে।
২০২২ সালের পর এটিই ইরানে দেশের সবচেয়ে বড় অস্থিরতা। তবে এখনও দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়নি। বেশিরভাগ মিছিলে মাত্র কয়েক শ মানুষ অংশ নিচ্ছে এবং এগুলো মূলত এমন সব মফস্বল শহরে কেন্দ্রীভূত, যা খুঁজে পেতে তেহরানের বাসিন্দাদেরও মানচিত্রের সাহায্য নিতে হতে পারে। সারা দেশে কারখানা এবং সরকারি অফিসগুলো এখনও খোলা রয়েছে।
তা সত্ত্বেও, সরকারকে এবার অনেক বেশি আতঙ্কিত মনে হচ্ছে। তেহরানের কেন্দ্রস্থলের গলিগুলোতে দাঙ্গা পুলিশ এবং জলকামান মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকের বাহিনী মোড়ে মোড়ে জটলা হওয়ার আগেই মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। গণবিক্ষোভ ঠেকাতে ‘বায়ু দূষণের অজুহাতে’ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এবারের বিক্ষোভ আগের ধরণ থেকে দুটি কারণে আলাদা। প্রথমত, শাসনব্যবস্থার দেউলিয়া দশা (আর্থিক ও আদর্শিক উভয় দিক থেকেই) এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান। ইরান গত এক বছর ধরে অর্থনৈতিক ধস, যুদ্ধ এবং পরিবেশগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির নেতাদের কাছে এসব সমস্যার কোনো সমাধান নেই। দ্বিতীয়ত, বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা, তা ইসরায়েল বা আমেরিকা—যার মাধ্যমেই হোক। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা থেকে নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর অনেক ইরানি এখন ভাবছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য তাদের দেশ হতে পারে কিনা।
এই বিক্ষোভের মূলে রয়েছে সেই জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ, যাদের একসময় সরকার নিজেদের লোক বলে মনে করত। আর তারা হলো বেকার তরুণ সমাজ। রাষ্ট্র তাদের দাবির কোনো জবাব দিতে পারছে না।
২০২২ সালে সরকার পোশাকের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে এবং নৈতিকতা পুলিশ তুলে নিয়ে বিক্ষোভ প্রশমিত করেছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটের ক্ষেত্রে এমন কোনো সহজ সমাধান নেই। বিক্ষোভের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন, “আমি কিছুই করতে পারছি না।”
ইরানি মুদ্রার মান কমছেই। বর্তমানে এটি প্রতি ডলারে ১৫ লাখ রিয়ালে লেনদেন হচ্ছে। গত এক বছরে এর মান ৪৫% এবং গত দশকে ৯৮% কমেছে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দরিদ্র ইরানিরা না খেয়ে থাকছেন। পেজেশকিয়ানের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান চেষ্টা ছিল আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ বিনিময় হার বাতিল করা এবং সেই অর্থ দিয়ে প্রতিটি নাগরিককে মাসে ১ কোটি রিয়াল করে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া।
নীতিগতভাবে এটি ভালো উদ্যোগ হলেও, এই অর্থের পরিমাণ ৮ ডলারের চেয়েও কম, যা দিয়ে বড়জোর এক ব্যাগ চাল বা এক বোতল ভোজ্যতেল কেনা সম্ভব। এ ছাড়া একক বিনিময় হার চালু করায় মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে, যা ইতিমধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি স্বীকার করেছেন, এর ফলে মুরগি ও ডিমসহ নিত্যপণ্যের দাম “উল্লেখযোগ্যভাবে” বৃদ্ধি পাবে।

সরকার যদি সংস্কারের মাধ্যমে সংকট কাটাতে না পারে, তবে দমন-পীড়নও বুমেরাং হয়ে ফিরবে। আহত বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করতে নিরাপত্তা বাহিনীর হাসপাতালে অভিযানের ফুটেজ জনগণকে ক্ষুব্ধ করেছে। বন্দিদের মুক্ত করতে কোনো কোনো বিক্ষোভকারী থানায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। যে ধর্মীয় আদর্শ একসময় এই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল, তা এখন ম্লান হয়ে গেছে।
এদিকে, বিচ্ছিন্ন বিরোধীরা এখন ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহের নির্বাসিত ছেলেকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। রাজতন্ত্র এখনও অনেকের কাছেই অপছন্দের। কিন্তু যারা একসময় রেজা পাহলভিকে গুরুত্ব দিতেন না, তারা এখন এই ৬৫ বছর বয়সী ব্যক্তিকে নিয়ে ‘সিরিয়াসলি’ ভাবছেন।
পেছনের পটভূমিতে কাজ করছে আরেকটি যুদ্ধের হুমকি। ইসরায়েল গত গ্রীষ্মে ইরানে ১২ দিন ধরে বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্বিতীয় দফায় হামলার জন্য উন্মুখ বলে মনে হচ্ছে। কারণ ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। গত ২৯ ডিসেম্বর মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সাক্ষাতে যুদ্ধের বিষয়টি আলোচনায় ছিল।
২ জানুয়ারি ট্রাম্প নিজেও হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যেন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা না করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “আমেরিকা তাদের উদ্ধারে আসবে। আমরা প্রস্তুত এবং লক্ষ্যভেদে বদ্ধপরিকর।” তিনি আসলে কী বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়: কেবল শক্তির মহড়া নাকি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযান?
এর পরের দিনই মার্কিন কমান্ডোরা ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালায়। তার মানে এই নয় যে, আমেরিকা ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ধরতে একই ধরণের অভিযান চালাবে। ১৯৮০ সালে জিম্মি সংকটের সময় তেহরানে চালানো শেষ মার্কিন অভিযানটি তাদের লজ্জার ইতিহাস। ওই সময় মরুভূমিতে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে এবং আটজন মার্কিন সেনা নিহতের মাধ্যমে অভিযান ব্যর্থ হয়।
তবে মাদুরোর দ্রুত পতন ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক কর্মকর্তা খামেনির মৃত্যুর পর দেশে পরিবর্তনের অপেক্ষা করছিলেন। তারা এখন সেই পরিবর্তনটি আরও আগেই চাইছেন। নির্বাসিত এক ইরানি বিশ্লেষক বলেন, “পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, সরকার এখন বলির পাঁঠা খুঁজছে।”
কেউ কেউ ভেনেজুয়েলা স্টাইলে সমাধান খুঁজছেন। আর তা হলে শাসনব্যবস্থাকে বাঁচাতে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেওয়া। আয়াতুল্লাহ আলি খামিনিকে একজন শক্তিশালী সামরিক নেতার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাঈদ লায়লাজ। তিনি সংসদ স্পিকার এবং আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি গত বছর যুদ্ধের সময় খামেনি আত্মগোপনে থাকাকালীন অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে শোনা যায়। এমনকি আইআরজিসির সম্মতিতে শেষ চেষ্টা হিসেবে রেজা পাহলভির নামও আলোচনায় আসতে পারে।
তবে খামেনি হয়তো অন্য কোনো পথ বেছে নিতে পারেন। তেহরানের বিশাল বিলবোর্ডগুলোতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পতাকায় মোড়ানো কফিনের ছবি দেখা যাচ্ছে। উপদেষ্টারা হুমকি দিচ্ছেন, বিদেশি হামলা হলে তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি শহরগুলোতে হামলা চালিয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করবেন। এতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও শঙ্কিত। হয়তো খামেনির সহযোগীরা আবারও দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছেন, যেমনটি তারা গত জুনের যুদ্ধের সময় করেছিলেন। এবার কী তা কাজে দেবে?
যেভাবেই হোক, খামেনির শাসনামলের ৩৭তম বছরটি শেষ শাহের মতোই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, যিনি ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পরেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
দ্য ইকোনোমিস্টের নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করে প্রকাশিত