Advertisement Banner

চীন নিয়ে উভয় সংকটে ট্রাম্প

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
চীন নিয়ে উভয় সংকটে ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে ট্রাম্পের আরোপ করা অবরোধ এখন একটি নতুন সংকট তৈরি করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদক ডেভিড ই. স্যাঙ্গার ও টাইলার পেজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার চীন যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানিতে মার্কিন অবরোধকে ‘বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’ অ্যাখ্যা দিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে আসা একটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠল। চ্যালেঞ্জটি হলো—ইরানের সাথে এই সংঘাত যেন চীনের সাথে তার গড়ে ওঠা নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

ট্রাম্প আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে বেইজিং সফরে যাবেন বলে কথা রয়েছে। এই সফর বিশ্বের বৃহত্তম এই দুই অর্থনীতির সম্পর্ককে নতুন রূপ দেওয়ার জন্য এই সফরটিকে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে এই সফর একবার পিছিয়েছেন এবং হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, আমেরিকা এখনো ইরানি তেল রপ্তানিকে চেপে ধরলেও সফর আবার পেছানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। আর এই অবরোধের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের স্বার্থ। কারণ, এই যুদ্ধ শুরুর আগে তারা প্রতিদিন ১৩ লাখেরও বেশি ব্যারেল তেল ইরানের কাছ থেকে কিনত, যা দেশটির রপ্তানির ৯০ শতাংশ।

প্রথম দিকে চীন এই সামরিক অভিযান নিয়ে তুলনামূলকভাবে নীরব ছিল। সমুদ্রে ইতিমধ্যে থাকা চালান এবং জরুরি তেলের বিশাল মজুদ তাদের সাময়িকভাবে স্বস্তিতে রেখেছিল। প্রণালি খোলা রাখতে চীনকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ট্রাম্পের দাবি উপেক্ষা করে তারা উভয় পক্ষকে পিছু হটার আহ্বান জানিয়ে দায়সারা বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু সোমবার অবরোধ শুরু হলে চীনা পতাকাবাহী জাহাজ, এমনকি চীনা নাবিকদের পরিচালিত জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনী ফিরিয়ে দিতে পারে এই আশঙ্কা সামনে আসতেই তাদের সুরের পরিবর্তন ঘটে।

মঙ্গলবার যুদ্ধ নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য বক্তব্য দেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। আবুধাবির যুবরাজের সাথে বৈঠকে তিনি বলেন, “বিশ্ব জঙ্গলের আইনে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না।” বক্তব্যে চীনের প্রেসিডেন্ট আমেরিকা বা ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি। করার দরকার পড়েনি। তিনি যোগ করেন, আন্তর্জাতিক আইনের কর্তৃত্ব রক্ষা করতে হলে সুবিধামতো সময়ে তা ব্যবহার করা এবং যখন মন চাইবে তখন ত্যাগ করা চলবে না।

এটি ছিল ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট বার্তা। কারণ জানুয়ারিতে ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, তার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই এবং কখন আন্তর্জাতিক আইন তার কাজে প্রযোজ্য হবে তা তিনি নিজেই ঠিক করবেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও কঠোর ভাষায় বলেছে, মার্কিন লক্ষ্যভিত্তিক অবরোধ মুখোমুখি সংঘাত বাড়াবে, উত্তেজনা তীব্র করবে, ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াত আরও বিপন্ন হবে।

এই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে ট্রাম্পের দুটি বড় লক্ষ্য এখন সরাসরি সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও এশিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান কার্ট ক্যাম্পবেল এটি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আমেরিকার প্রথম লক্ষ্য হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া সব পণ্যসহ চীনের পণ্যও পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা। অন্য লক্ষ্য হলো, বেইজিং সফরকে সুস্পষ্টভাবে ইতিবাচক করা।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩ লাখ ব্যারেল তেল ইরান থেকে চীনে রপ্তানি হতো। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১৩ লাখ ব্যারেল তেল ইরান থেকে চীনে রপ্তানি হতো। ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, চীনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওভাল অফিসে আসন্ন সফর নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরান সংঘাত শুরুর আগে ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) স্কট বেসেন্ট দুই দেশের মধ্যে ঘোষণা করার মতো অর্থনৈতিক উদ্যোগের রূপরেখা আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ, চীনের দ্রুত বর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এবং দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক উপস্থিতিসহ মূল নিরাপত্তা বিষয়গুলিতে অনেক কম অগ্রগতি হয়েছে।

একটি স্পর্শকাতর বিষয়ও সামনে এসেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য পেয়েছে যে, চীন সম্ভবত ইরানিদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে। তবে এই তথ্য নিশ্চিত নয় এবং মার্কিন বা ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সন্দেহ করেন না যে চীন এটা করেছে। তবে এর সাথে তিনি এটাও বলেছেন যে, যদি গোয়েন্দাদের তথ্য সত্য হয় তাহলে চীনের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। কিন্তু এরপর তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, নতুন শুল্কের হুমকি বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নষ্ট করতে পারে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও বাইডেন প্রশাসনের সাবেক চীন বিষয়ক উপদেষ্টা রাশ ডোশি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় চিপ বা বিরল খনিজের মতো তীব্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে দুই দেশে কেউই সুর নরম করতে পারেনি। অবরোধ আরও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যদি মার্কিন নৌবাহিনী ও চীনা বাণিজ্যিক জাহাজের মধ্যে সংঘাত হয়। যদিও এই পরিস্থিতি উভয় পক্ষই এড়িয়ে চলতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। আরেকটি ঝুঁকি হলো, চীনের ইরানকে মারণাস্ত্র সহায়তা পাঠানোর সম্ভাবনা, যা কংগ্রেস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গুরুত্বের সাথে দেখছেন।

প্রতিবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। চীনা সামরিক বাহিনী সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে আমেরিকা কীভাবে ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে এবং ইরান আক্রমণ করেছে। চীনা কর্মকর্তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যে যুদ্ধের প্রথম ঘণ্টায় কত দ্রুত ইরানি নেতৃত্ব নির্মূল করা হয়েছে। এই পর্যবেক্ষণ দেশটির নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে।

সামগ্রিকভাবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এই প্রতিবেদন একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ট্রাম্প একই সাথে ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখতে চান এবং চীনের সাথে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক উন্নয়নের সফরও করতে চান। কিন্তু হরমুজ প্রণালি অবরোধ এই দুটি লক্ষ্যকে পারস্পরিক বিরোধী করে তুলেছে। চীনের তেলের পথ বন্ধ হলে বেইজিং সফর বেশ খারাপ হতে পারে। আর চীনের জাহাজকে ছাড় দিলে অবরোধের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ট্রাম্প কোন পথ বেছে নেন– সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সম্পর্কিত