চরচা ডেস্ক

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা একটি পরিচিত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলতি মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মাত্র কয়েক দিন পরেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীনে পৌঁছান। এই দ্বৈত সফর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি নতুন ‘গ্রেট ট্রায়াঙ্গেল’ বা ত্রিমুখী সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার সুযোগ করে দেয়।
রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স পত্রিকার প্রধান সম্পাদক, কাউন্সিল অন ফরেন অ্যান্ড ডিফেন্স পলিসির প্রিসিডিয়াম চেয়ারম্যান এবং ভালদাই ইন্টারন্যাশনাল ডিসকাশন ক্লাবের গবেষণা পরিচালক ফিওদর লুকিয়ানভ আরটি–তে প্রকাশিত তার নিবন্ধে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে লুকিয়ানভ মনে করেন, এই দুই সফরের সময়কালের মিলটি মূলত একটি কাকতাল মাত্র। কারণ পুতিনের এই সফরটি অনেক আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। বর্তমানে রুশ ও চীনা নেতাদের মধ্যে এই ধরনের বৈঠক একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এটি তাদের উত্তরোত্তর শক্তিশালী হতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বেরই একটি অংশ।
এর বিপরীতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরটি এর আগে বেশ কয়েকবার পিছিয়ে দিতে হয়েছিল, যার সাম্প্রতিকতম কারণ ছিল ইরানের সাথে যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টতই একজন যুদ্ধকালীন নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বেইজিংয়ে আসতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। কারণ যুদ্ধের চলমান পরিস্থিতির ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এমনকি শেষ পর্যন্ত যখন তিনি বেইজিংয়ে পৌঁছালেন, তখনো তাকে একজন বিজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল না। কারণ ইরান মার্কিন চাপের মুখে নতি স্বীকার করেনি এবং ওয়াশিংটনের নিজস্ব অবস্থানও এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

ফিওদর লুকিয়ানভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ত্রিমুখী শক্তির তুলনাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও বোধগম্য। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র হলো বর্তমান বিশ্বের এমন তিনটি প্রধান শক্তি যাদের বৈশ্বিক রাজনীতিকে রূপ দেওয়ার মতো সবচেয়ে বেশি সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই তিন দেশের শক্তির উৎস ও ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমেরিকার রয়েছে অতুলনীয় সামরিক সক্ষমতা এবং বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। সেখানে চীন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনে এক ঐতিহাসিক এবং বিশাল শক্তির অধিকারী। অন্যদিকে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও শক্তিশালী। ফলস্বরূপ, এই তিনটি শক্তির মধ্যকার যেকোনো ধরনের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অবধারিতভাবেই সামগ্রিক আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তবে লুকিয়ানভ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই মিলগুলো কেবল তাত্ত্বিক পর্যায় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, কারণ বাস্তব ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরিত্র ও ভিত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের।
এই নিবন্ধে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যা কোনো সাময়িক সংকট বা ক্ষণস্থায়ী বিষয় নয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরটি এই সত্যকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, দুই দেশের এই সম্পর্কটি কতটা আমূল বদলে গেছে। বিগত কয়েক দশক ধরে উভয় পক্ষই এক ধরনের অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সুবিধা ভোগ করে আসছিল। বাণিজ্যিক স্বার্থগুলো যেখানে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে আড়াল করে রাখত। কিন্তু সেই সোনালী অধ্যায়ের এখন সম্পূর্ণ অবসান ঘটেছে।
ওয়াশিংটন এখন এই সম্পর্কটিকে নিজের সুবিধামতো পুনর্গঠন করতে চাইছে। একই সাথে চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানকে কঠোরভাবে টেনে ধরার চেষ্টা করছে। আমেরিকার এই বৈরী নীতি বেইজিংকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও দৃঢ় অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। বিগত বছরে চীনের পক্ষ থেকে বিরল খনিজ বা রেয়ার-আর্থ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের হাতে এমন কিছু মোক্ষম কৌশলগত হাতিয়ার রয়েছে যার কোনো কার্যকর জবাব এখনো ওয়াশিংটন খুঁজে পায়নি। তার চেয়েও বড় কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে।

চীনা নেতৃত্ব এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, চীনের ওপর মার্কিন চাপ বা নিষেধাজ্ঞা কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসন বা কোনো প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত মেজাজ-মর্জির ফল নয়, বরং এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি কাঠামোগত এবং স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। ফলস্বরূপ, ট্রাম্প এবং সি চিনপিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কটি এখন কোনো পারস্পরিক ঐকমত্যের দিকে না গিয়ে বরং একটি নিয়ন্ত্রিত দূরত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে উত্তেজনা কখনো বাড়বে আবার কখনো আংশিক কমবে। কোনো পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে একটি মারাত্মক ও চূড়ান্ত বিপর্যয় বা সম্পর্কচ্ছেদ চায় না, তবে উভয় দেশই এখন এটি মেনে নিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতা তাদের জন্য অনিবার্য।
এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, রাশিয়া এবং চীনের সম্পর্কটি গড়ে উঠেছে একেবারেই ভিন্ন এক মজবুত ভিত্তির ওপর। লুকিয়ানভের মতে, মস্কো ও বেইজিং একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। বরং তারা নিজেদেরকে দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে আবদ্ধ কৌশলগত অংশীদার মনে করে। যা ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিবেশ দ্বারা চালিত। উভয় দেশই ইউরেশীয় ভূখণ্ডকে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় রঙ্গমঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক সংঘাতগুলো এই অঞ্চলেই ঘটছে, যার পরিধি পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত।
একই সাথে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ সংঘাতটি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দানা বেঁধে উঠতে পারে। এই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সহযোগিতাকে কোনো সাময়িক বিকল্প নয়, বরং একটি পরম কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখে। তাদের এই অংশীদারত্ব এখন রাজনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, অর্থায়ন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সামরিক সমন্বয়ের মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গভীরভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। যদিও এই সম্পর্কের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও এর অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি নিজেই এখন সমকালীন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান ও নির্ধারক উপাদানে পরিণত হয়েছে।
লুকিয়ানভ তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, রুশ-চীন অক্ষের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিকে দুর্বল করা এবং তাদের মধ্যে একটি ফাটল ধরানোই এখন ওয়াশিংটনের প্রধান এবং অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। অনেক মার্কিন কৌশলবিদ প্রকাশ্যে এই মত প্রকাশ করেন যে, বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার একাধিপত্য ধরে রাখতে হলে যেকোনো মূল্যে মস্কো এবং বেইজিংয়ের মধ্যে একটি দূরত্বের প্রাচীর তৈরি করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অব্যাহত বৈরী চাপ হিতে বিপরীত ফল বয়ে এনেছে এবং এই দুই ইউরেশীয় শক্তিকে আরও বেশি কাছাকাছি ও নিবিড়ভাবে একত্রিত হতে বাধ্য করেছে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়া এবং চীনের এই সম্পর্কটি সম্পূর্ণ ঘাত-প্রতিঘাতহীন বা বিতর্কহীন।
রাশিয়া এবং চীন উভয়ই দীর্ঘ ইতিহাস, প্রখর জাতীয়তাবাদ এবং নিজস্ব কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পন্ন দুটি স্বাধীন পরাশক্তি। ফলস্বরূপ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস বা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মতো বাস্তবসম্মত বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য, ক্ষোভ, বিলম্ব বা দরকষাকষি হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং তা ঘটছেও। তবে মার্কিন-চীন সম্পর্কের সাথে এর মূল ও মৌলিক তফাতটি হলো, রাশিয়া ও চীনের এই মতভেদ বা বিরোধগুলো কখনোই অস্তিত্ব সংকটের মতো মারাত্মক বা আদর্শিক নয়। মার্কিন-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিযোগিতাটি মূলত একে অপরকে সীমিত ও অবদমিত করার চারপাশে আবর্তিত হয়, সেখানে রাশিয়া এবং চীন একে অপরকে মৌলিকভাবে শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে না। তাই তাদের মধ্যকার যেকোনো বাস্তবসম্মত বিবাদ বা সাময়িক অসন্তোষ মূল সম্পর্কের ভিত্তিকে কখনোই বিপন্ন বা হুমকির মুখে ফেলে না।
ফিওদর লুকিয়ানভ আরও বলেছেন যে, পরিস্থিতি যদি কখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা জটিল হয়ে ওঠে, তবে উভয় পক্ষই হয়তো কৌশলগত কারণে সরাসরি একে অপরকে তাৎক্ষণিক সমর্থন দেওয়া থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকতে পারে বা সংযম প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষই অন্য কোনো ক্ষেত্রে সামান্য কোনো কৌশলগত বা সাময়িক সুবিধা পাওয়ার আশায় তাদের এই বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারত্বকে খর্ব বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে প্রস্তুত নয়। কারণ এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি তাদের নিজেদের কাছেই অত্যন্ত মূল্যবান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই কাঠামোগত স্থিতিশীলতার কারণেই পুতিন এবং সি চিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকগুলো ট্রাম্পকে যুক্ত করে হওয়া অন্য যেকোনো সম্মেলনের তুলনায় বিশ্বজুড়ে কম নাটকীয়তা বা উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
এই সম্পর্কের মৌলিক দিকনির্দেশনা এবং লক্ষ্য আগে থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্ধারিত হওয়ায় এখানে কোনো নাটকীয়তা বা অনিশ্চয়তার অবকাশ থাকে না। এই দুটি দেশ বছরের পর বছর ধরে নিজেদের মধ্যে একটি অত্যন্ত গভীর স্তরের রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে তুলেছে, যা বর্তমানের ভঙ্গুর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিরল একটি বিষয়। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল পৃথিবীতে যেখানে রাষ্ট্রীয় স্তরে নির্ভরযোগ্যতা একটি অত্যন্ত দুর্লভ উপাদানে পরিণত হয়েছে, সেখানে রাশিয়া ও চীনের এই সুগভীর পারস্পরিক বিশ্বাসই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক প্রতিনিয়ত চরম অনিশ্চয়তা, পারস্পরিক সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে মস্কো এবং বেইজিং নিজেদের মধ্যে এমন একটি দৃঢ় ও অবিচল সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর গতিপথ কোনো সাময়িক রাজনৈতিক হাওয়া, মিডিয়ার আবহাওয়া বা ক্ষণস্থায়ী মেজাজের ওপর নির্ভর করে না। আর এই চরম অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক পরিবেশে কেবল এই একটিমাত্র কারণে রুশ-চীন অংশীদারত্ব বৈশ্বিক রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অভেদ্য এক প্রাচীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা একটি পরিচিত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলতি মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মাত্র কয়েক দিন পরেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চীনে পৌঁছান। এই দ্বৈত সফর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে রাশিয়া, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি নতুন ‘গ্রেট ট্রায়াঙ্গেল’ বা ত্রিমুখী সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার সুযোগ করে দেয়।
রাশিয়া ইন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স পত্রিকার প্রধান সম্পাদক, কাউন্সিল অন ফরেন অ্যান্ড ডিফেন্স পলিসির প্রিসিডিয়াম চেয়ারম্যান এবং ভালদাই ইন্টারন্যাশনাল ডিসকাশন ক্লাবের গবেষণা পরিচালক ফিওদর লুকিয়ানভ আরটি–তে প্রকাশিত তার নিবন্ধে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে লুকিয়ানভ মনে করেন, এই দুই সফরের সময়কালের মিলটি মূলত একটি কাকতাল মাত্র। কারণ পুতিনের এই সফরটি অনেক আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। বর্তমানে রুশ ও চীনা নেতাদের মধ্যে এই ধরনের বৈঠক একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এটি তাদের উত্তরোত্তর শক্তিশালী হতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বেরই একটি অংশ।
এর বিপরীতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরটি এর আগে বেশ কয়েকবার পিছিয়ে দিতে হয়েছিল, যার সাম্প্রতিকতম কারণ ছিল ইরানের সাথে যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টতই একজন যুদ্ধকালীন নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বেইজিংয়ে আসতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। কারণ যুদ্ধের চলমান পরিস্থিতির ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এমনকি শেষ পর্যন্ত যখন তিনি বেইজিংয়ে পৌঁছালেন, তখনো তাকে একজন বিজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল না। কারণ ইরান মার্কিন চাপের মুখে নতি স্বীকার করেনি এবং ওয়াশিংটনের নিজস্ব অবস্থানও এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

ফিওদর লুকিয়ানভের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ত্রিমুখী শক্তির তুলনাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও বোধগম্য। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র হলো বর্তমান বিশ্বের এমন তিনটি প্রধান শক্তি যাদের বৈশ্বিক রাজনীতিকে রূপ দেওয়ার মতো সবচেয়ে বেশি সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই তিন দেশের শক্তির উৎস ও ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমেরিকার রয়েছে অতুলনীয় সামরিক সক্ষমতা এবং বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। সেখানে চীন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনে এক ঐতিহাসিক এবং বিশাল শক্তির অধিকারী। অন্যদিকে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক আকার তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও শক্তিশালী। ফলস্বরূপ, এই তিনটি শক্তির মধ্যকার যেকোনো ধরনের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অবধারিতভাবেই সামগ্রিক আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তবে লুকিয়ানভ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই মিলগুলো কেবল তাত্ত্বিক পর্যায় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, কারণ বাস্তব ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরিত্র ও ভিত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের।
এই নিবন্ধে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যা কোনো সাময়িক সংকট বা ক্ষণস্থায়ী বিষয় নয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরটি এই সত্যকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে যে, দুই দেশের এই সম্পর্কটি কতটা আমূল বদলে গেছে। বিগত কয়েক দশক ধরে উভয় পক্ষই এক ধরনের অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সুবিধা ভোগ করে আসছিল। বাণিজ্যিক স্বার্থগুলো যেখানে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে আড়াল করে রাখত। কিন্তু সেই সোনালী অধ্যায়ের এখন সম্পূর্ণ অবসান ঘটেছে।
ওয়াশিংটন এখন এই সম্পর্কটিকে নিজের সুবিধামতো পুনর্গঠন করতে চাইছে। একই সাথে চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানকে কঠোরভাবে টেনে ধরার চেষ্টা করছে। আমেরিকার এই বৈরী নীতি বেইজিংকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও দৃঢ় অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে। বিগত বছরে চীনের পক্ষ থেকে বিরল খনিজ বা রেয়ার-আর্থ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের হাতে এমন কিছু মোক্ষম কৌশলগত হাতিয়ার রয়েছে যার কোনো কার্যকর জবাব এখনো ওয়াশিংটন খুঁজে পায়নি। তার চেয়েও বড় কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেইজিংয়ের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে।

চীনা নেতৃত্ব এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, চীনের ওপর মার্কিন চাপ বা নিষেধাজ্ঞা কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসন বা কোনো প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত মেজাজ-মর্জির ফল নয়, বরং এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি কাঠামোগত এবং স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। ফলস্বরূপ, ট্রাম্প এবং সি চিনপিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কটি এখন কোনো পারস্পরিক ঐকমত্যের দিকে না গিয়ে বরং একটি নিয়ন্ত্রিত দূরত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে উত্তেজনা কখনো বাড়বে আবার কখনো আংশিক কমবে। কোনো পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে একটি মারাত্মক ও চূড়ান্ত বিপর্যয় বা সম্পর্কচ্ছেদ চায় না, তবে উভয় দেশই এখন এটি মেনে নিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতা তাদের জন্য অনিবার্য।
এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, রাশিয়া এবং চীনের সম্পর্কটি গড়ে উঠেছে একেবারেই ভিন্ন এক মজবুত ভিত্তির ওপর। লুকিয়ানভের মতে, মস্কো ও বেইজিং একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। বরং তারা নিজেদেরকে দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে আবদ্ধ কৌশলগত অংশীদার মনে করে। যা ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিবেশ দ্বারা চালিত। উভয় দেশই ইউরেশীয় ভূখণ্ডকে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় রঙ্গমঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক সংঘাতগুলো এই অঞ্চলেই ঘটছে, যার পরিধি পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত।
একই সাথে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ সংঘাতটি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দানা বেঁধে উঠতে পারে। এই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় সহযোগিতাকে কোনো সাময়িক বিকল্প নয়, বরং একটি পরম কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখে। তাদের এই অংশীদারত্ব এখন রাজনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, অর্থায়ন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সামরিক সমন্বয়ের মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গভীরভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। যদিও এই সম্পর্কের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও এর অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটি নিজেই এখন সমকালীন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান ও নির্ধারক উপাদানে পরিণত হয়েছে।
লুকিয়ানভ তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, রুশ-চীন অক্ষের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিকে দুর্বল করা এবং তাদের মধ্যে একটি ফাটল ধরানোই এখন ওয়াশিংটনের প্রধান এবং অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। অনেক মার্কিন কৌশলবিদ প্রকাশ্যে এই মত প্রকাশ করেন যে, বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার একাধিপত্য ধরে রাখতে হলে যেকোনো মূল্যে মস্কো এবং বেইজিংয়ের মধ্যে একটি দূরত্বের প্রাচীর তৈরি করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অব্যাহত বৈরী চাপ হিতে বিপরীত ফল বয়ে এনেছে এবং এই দুই ইউরেশীয় শক্তিকে আরও বেশি কাছাকাছি ও নিবিড়ভাবে একত্রিত হতে বাধ্য করেছে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়া এবং চীনের এই সম্পর্কটি সম্পূর্ণ ঘাত-প্রতিঘাতহীন বা বিতর্কহীন।
রাশিয়া এবং চীন উভয়ই দীর্ঘ ইতিহাস, প্রখর জাতীয়তাবাদ এবং নিজস্ব কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পন্ন দুটি স্বাধীন পরাশক্তি। ফলস্বরূপ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস বা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মতো বাস্তবসম্মত বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য, ক্ষোভ, বিলম্ব বা দরকষাকষি হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং তা ঘটছেও। তবে মার্কিন-চীন সম্পর্কের সাথে এর মূল ও মৌলিক তফাতটি হলো, রাশিয়া ও চীনের এই মতভেদ বা বিরোধগুলো কখনোই অস্তিত্ব সংকটের মতো মারাত্মক বা আদর্শিক নয়। মার্কিন-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিযোগিতাটি মূলত একে অপরকে সীমিত ও অবদমিত করার চারপাশে আবর্তিত হয়, সেখানে রাশিয়া এবং চীন একে অপরকে মৌলিকভাবে শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে না। তাই তাদের মধ্যকার যেকোনো বাস্তবসম্মত বিবাদ বা সাময়িক অসন্তোষ মূল সম্পর্কের ভিত্তিকে কখনোই বিপন্ন বা হুমকির মুখে ফেলে না।
ফিওদর লুকিয়ানভ আরও বলেছেন যে, পরিস্থিতি যদি কখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা জটিল হয়ে ওঠে, তবে উভয় পক্ষই হয়তো কৌশলগত কারণে সরাসরি একে অপরকে তাৎক্ষণিক সমর্থন দেওয়া থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকতে পারে বা সংযম প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষই অন্য কোনো ক্ষেত্রে সামান্য কোনো কৌশলগত বা সাময়িক সুবিধা পাওয়ার আশায় তাদের এই বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারত্বকে খর্ব বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে প্রস্তুত নয়। কারণ এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি তাদের নিজেদের কাছেই অত্যন্ত মূল্যবান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই কাঠামোগত স্থিতিশীলতার কারণেই পুতিন এবং সি চিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকগুলো ট্রাম্পকে যুক্ত করে হওয়া অন্য যেকোনো সম্মেলনের তুলনায় বিশ্বজুড়ে কম নাটকীয়তা বা উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
এই সম্পর্কের মৌলিক দিকনির্দেশনা এবং লক্ষ্য আগে থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্ধারিত হওয়ায় এখানে কোনো নাটকীয়তা বা অনিশ্চয়তার অবকাশ থাকে না। এই দুটি দেশ বছরের পর বছর ধরে নিজেদের মধ্যে একটি অত্যন্ত গভীর স্তরের রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে তুলেছে, যা বর্তমানের ভঙ্গুর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিরল একটি বিষয়। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল পৃথিবীতে যেখানে রাষ্ট্রীয় স্তরে নির্ভরযোগ্যতা একটি অত্যন্ত দুর্লভ উপাদানে পরিণত হয়েছে, সেখানে রাশিয়া ও চীনের এই সুগভীর পারস্পরিক বিশ্বাসই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক প্রতিনিয়ত চরম অনিশ্চয়তা, পারস্পরিক সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে মস্কো এবং বেইজিং নিজেদের মধ্যে এমন একটি দৃঢ় ও অবিচল সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর গতিপথ কোনো সাময়িক রাজনৈতিক হাওয়া, মিডিয়ার আবহাওয়া বা ক্ষণস্থায়ী মেজাজের ওপর নির্ভর করে না। আর এই চরম অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক পরিবেশে কেবল এই একটিমাত্র কারণে রুশ-চীন অংশীদারত্ব বৈশ্বিক রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অভেদ্য এক প্রাচীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।