Advertisement Banner

ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে কী আছে, যুক্তরাষ্ট্রে কি মানবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে কী আছে, যুক্তরাষ্ট্রে কি মানবে?

রাতভর ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পর শেষমেষ শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পরে ইসরায়েলও যুদ্ধবিরতিতে নিজেদের সম্মতির কথা জানিয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির শর্তের অংশ হিসেবে তেহরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে রাজি হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে হামলা জোরদারের পরিকল্পনা স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি তেহরানের কাছ থেকে একটি ‘কার্যকর’ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পেয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, “পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।”

কী আছে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে?

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হোয়াইট হাউসে পাঠানো ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের সমাপ্তি মেনে নেবে না ইরান।

ইরানের প্রকাশিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
  • হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা
  • মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার
  • ইরান ও তার মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ
  • জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা
  • যেকোনো চুক্তিকে বাধ্যতামূলক করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব গ্রহণ

ফার্সি সংস্করণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও, ইংরেজি সংস্করণে তা অনুপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে অবস্থান

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, আগামী দুই সপ্তাহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর ‘নিরাপদ যাতায়াত’ সম্ভব হবে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে এবং কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

এর অর্থ ইরান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানান, প্রস্তাব অনুযায়ী প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ইরান ও ওমান টোল আদায় করতে পারবে এবং এই অর্থ পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে।

তবে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে তেহরান আবারও প্রণালিটি বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির পর কী ঘটতে পারে?

যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্ততা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, আলোচনার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী শুক্রবার ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেখানে সব বিরোধের একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং মীমাংসিত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা শুরু হবে।

১০ দফা প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র রাজি হবে?

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, প্রায় এক বছর ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে উভয় পক্ষের ভিন্ন অবস্থান ও ছাড় দেওয়ার সীমিত মনোভাব দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথে বাধা হয়ে রয়েছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের দাবি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংঘাত শুরুর আগে এই প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিছু প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান জাহাজ চলাচলে প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল আরোপ করতে পারে এবং সেই অর্থ দেশের পুনর্গঠনে ব্যয় করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “এসব তথ্য কতটা সত্য জানা নেই, তবে যদি এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পায়, তাহলে তা বিশ্বে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এসব দাবি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা কম। তবে এগুলো আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

কোন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি সিদ্ধান্ত এলো?

গতকাল মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা দুই সপ্তাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান, যাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়া যায়। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালি দুই সপ্তাহের জন্য খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে তেহরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীনও আলোচনার অগ্রগতির মধ্যে ইরানকে যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে উৎসাহ দিয়েছে বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।

ট্রাম্প মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, তিনি মনে করেন চীন ইরানকে আলোচনায় আনতে সহায়তা করেছে।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, ফলে তার দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসে তাদের স্বল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে অসন্তোষ বাড়ছে।

ইতোমধ্যে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন একাধিক মার্কিন আইনপ্রণেতা। তারা দেশটির সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রাম্পকে অপসারণের দাবি তুলেছেন। এই সংশোধনী অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিধান রয়েছে।

ইরানকে লক্ষ্য করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য সতর্ক করে ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছিলেন, “একটি গোটা সভ্যতা আজ রাতে মারা যাবে, যা আর কখনও ফিরে আসবে না। আমি চাই না এমনটা হোক, কিন্তু সম্ভবত এটাই ঘটতে যাচ্ছে।”

জবাবে ইরানও কঠোর অবস্থান নেয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র রেড লাইন অতিক্রম করলে ইরানের জবাব আঞ্চলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবব্ধ থাকবে না।

এমন পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসে পাকিস্তান। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শেষে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মাত্র ১ ঘণ্টা হাতে থাকতে আসে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত।

সম্পর্কিত