আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতই একমাত্র দেশ হিসেবে বর্তমানে একটি নয়, বরং দুটি সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পকে কার্যত পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
প্রতাপ ভানু মেহতা

আজকের দিনে এসে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থকে এত সহজে এক লাইনে মেলানো সম্ভব নয়। আর এই রূঢ় সত্যটির মুখোমুখি হওয়া আমাদের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-এর এক গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে, ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীর সত্যগুলোকে খোলা চোখে নিজেকে দেখতে হবে।
ইদানিং ভারত, তথা সমগ্র বিশ্বকে দেখলে মনে হয় যেন তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া কোনো হরিণ মাঝরাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র কেবল যে একটি অবিশ্বস্ত রাষ্ট্র, তা-ই নয়, বরং এই মুহূর্তে তারা বিশ্ব স্থিতিশীলতার বুকে সবচেয়ে বড় আঘাত বা ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ অন্যদিকে চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করার মধ্যেও রয়েছে এক চরম অস্বস্তি। এই দুই পরাশক্তিকে প্রতিহত করার মতো কোনো কার্যকর বিকল্প আন্তর্জাতিক জোটও এখনো গড়ে ওঠেনি।
ভারত মুখে সবসময় সভ্যতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুপক্ষীয় বিশ্বের কথা বলে, অথচ বাস্তবে দিন দিন তারা সাম্রাজ্যবাদী জবরদস্তির সঙ্গে আপস করতে এবং তা মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
তবে ভারতের বর্তমান দুর্দশার অনেকখানিই আসলে নিজেদের ডেকে আনা স্বখাত সলিল। ভারতকে সবার আগে নিজের লালিত বিভ্রমগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, আমেরিকার সাথে যেকোনো ধরনের লেনদেন বা কূটনীতির ক্ষেত্রে কেবল দ্বিপক্ষীয় সুবিধা কিংবা চীনকে নিয়ে দুশ্চিন্তার সমীকরণ মাথায় রাখলেই চলবে না, বরং পুরো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত সংকুচিত ও মর্যাদা হারিয়েছে। কারণ আমরা এখন এমন এক ধারণার ওপর ভিত্তি করে চলছি যেখানে মনে করা হয়–পৃথিবী ধ্বংস হলে হোক, আমাদের কেবল নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থটুকুর দিকে নজর দিলেই চলবে।
এই ভুলের জন্য কেবল ভারত একাই দায়ী নয়। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় কিছু তাৎক্ষণিক লাভ কিংবা অতি অল্প সময়ের কৌশলগত চিন্তাভাবনা করে ভারতের মতো একটি বিশাল দেশের দীর্ঘমেয়াদি উত্থান নিশ্চিত করা যাবে– এমন ভাবনা অত্যন্ত দূরদৃষ্টিহীন। ভারতের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে তাকালে এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক এবং বেদনাদায়ক যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতই একমাত্র দেশ হিসেবে বর্তমানে একটি নয়, বরং দুটি সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পকে কার্যত পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করল, তখন আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে ভারতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত মৃদু ও দায়সারা। আর অন্যদিকে ইরানের বিষয়ে ইসরায়েল এবং আমেরিকার কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলোকে ভারতের নীরব ও প্রায় প্রকাশ্য আলিঙ্গন এবং সমর্থন দেওয়াটা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
ভারত মুখে সবসময় সভ্যতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুপক্ষীয় বিশ্বের কথা বলে, অথচ বাস্তবে দিন দিন তারা সাম্রাজ্যবাদী জবরদস্তির সঙ্গে আপস করতে এবং তা মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। কিন্তু এই ধরনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্রয় দেওয়া সরাসরি ভারতের নিজস্ব বস্তুগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থেরই ক্ষতি করছে। আমরা অনেক দেরিতে হলেও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতিতে যেকোনো প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও অনেক বেশি বস্তুগত ক্ষতি সাধন করবে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির নীতিনির্ধারক মহলের একটি বড় অংশ, এমনকি জনমতের একাংশও অবচেতনভাবে এই ধারণাটি নিজেদের মনে স্থান দিয়ে ফেলেছে যে– ভারতের উত্থান অনিবার্যভাবেই মার্কিন ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে আছে এবং এর বাইরে কোনো পথ নেই।
আমাদের আবার এই চিন্তায় ফিরে যেতে হবে যে, যা পুরো বিশ্বের জন্য ভালো, তা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের নিজেদের জন্যও ভালো বয়ে আনবে। এর জন্য বর্তমান রূপে যুক্তরাষ্ট্রকে সঠিকভাবে চেনা প্রয়োজন– সেটি হলো একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এক নতুন এবং বিপজ্জনক শূন্যতাবাদের জন্ম দিচ্ছে। আমেরিকা কোনো ত্রাণকর্তা নয়, বরং তারা একটি প্রকাশ্য হুমকি।
প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো দেশের সঙ্গে সহজে ডিল করতে পারে না যারা তাদের আনুষ্ঠানিক মিত্র বা বন্ধু নয়, আর ভারত সবসময় নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু বর্তমান সময়টি এই চেনা ধারণার বাইরে গিয়ে দুটি ভিন্ন উপায়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রথমটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই তার বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরকে এক চরম ও লাঞ্ছনাকর নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী। গত কয়েক বছরে এটি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ভারতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি সাধারণ জোট বা মিত্রতার চেয়েও গভীর কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে মনে হবে, ভারত এখনো তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করছে–যেমন দেশটি এখনো রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে মাঝেমধ্যে আমেরিকার বিপক্ষে বা ভিন্ন কোনো ভোট দিচ্ছে। তবুও এই বাহ্যিক অঙ্গভঙ্গির বাইরে, আমাদের ভেতরে আরও গভীর কোনো পরিবর্তন ঘটে গেছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির নীতিনির্ধারক মহলের একটি বড় অংশ, এমনকি জনমতের একাংশও অবচেতনভাবে এই ধারণাটি নিজেদের মনে স্থান দিয়ে ফেলেছে যে– ভারতের উত্থান অনিবার্যভাবেই মার্কিন ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে আছে এবং এর বাইরে কোনো পথ নেই।
আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তির চেয়েও মনের ভেতরের এই পরনির্ভরশীলতার মনস্তত্ত্ব অনেক বেশি বিপজ্জনক। এই মানসিক পরিবর্তনের প্রমাণ আমরা আমাদের প্রকাশ্য আলোচনা বা ভূ-রাজনীতি মূল্যায়নের দিকে তাকালেই স্পষ্ট দেখতে পাই। এটি সত্যিই অবাক করার মতো বিষয় যে, হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া যেকোনো অস্থিতিশীলতার সমস্ত দায় কত সহজে এবং দ্রুততার সাথে কেবল ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কারণে যে এই প্রণালিটি বন্ধের উপক্রম হয়েছে– সেই সত্যটিকে কত নিখুঁতভাবে আড়াল করা বা খাটো করে দেখা হয়।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা সরকার সম্পর্কে যার যা-ই মতামত থাকুক না কেন, ইসরায়েল, আমেরিকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ভারতের এই প্রকাশ্য হাত মেলানো– যা বিশ্বব্যবস্থায় চরম নেতিবাচক দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে– তা আসলে ভারতের এই চিন্তাদৈন্য ও আদর্শিক আত্মসমর্পণেরই বহিঃপ্রকাশ।
আমেরিকার প্রতি ভারতের এই অন্ধত্ব ও মোহের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের দিকে তাকালে। এটি সবসময়ই স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই পাকিস্তানকে কেবল ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে না। কিন্তু আমাদের এই ভুল ভাঙল বারবার, বিশেষ করে ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়ে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এই উপমহাদেশীয় স্থিতিশীলতার একমাত্র এবং অপরিহার্য বহিরাগত গ্যারান্টার বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত হয়তো মুখে বা জনসমক্ষে কোনো ধরনের তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার ভাষা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কিন্তু আমেরিকা খুব কম সময়ই আঞ্চলিক সালিশকারীর ভূমিকা ত্যাগ করে এবং পাকিস্তান সবসময়ই তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ও থাকবে।
এই উপমহাদেশে আমাদের স্বার্থ কখনোই আমেরিকার সাথে মিলবে না, তাই আমাদের নিজস্ব শর্তে এবং নিজেদের শক্তিতেই এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের আরেকটি যে বড় মোহ ভেঙে গেছে তা হলো– এশিয়ায় মার্কিন কৌশলের জন্য ভারত অত্যন্ত অপরিহার্য ও অনবদ্য অংশ হবে। কিন্তু আসল সত্যটি হলো, আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব আসলে খুবই প্রতিস্থাপনযোগ্য বা সামান্য, তারা চাইলেই ভারতকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে সমীকরণ মেলাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা অবশ্যই ভারতের জন্য উপকারী হতে পারত। তবে ভারতের ওপর আমেরিকার আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্কগুলো কিন্তু কেবল তাদের শিল্পনীতির অংশ ছিল না, বরং তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে তার আসল অবস্থান বা সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করায় ভারত সাময়িকভাবে হয়তো কিছুটা হাফ ছেড়ে বেঁচেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে কতটা শোষণমূলক বা একতরফা সুবিধা আদায় করতে চায়, সে বিষয়ে আমাদের কোনো বিভ্রমে থাকা উচিত নয়। এবং ট্রাম্পের মেয়াদের বাইরেও আমেরিকার এই চরিত্র একই থাকবে। আবারও বলা যায়, ভারত আমেরিকার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে নিজেকে যুক্ত করে সুবিধা নিতে পারত। কিন্তু আমেরিকার টেবিলে যে গভীর অহংকার ও দম্ভ রয়েছে, তা ভারতকে খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। আমেরিকা মনে মনে নিশ্চিত যে ভারত প্রযুক্তির দিক থেকে তাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং ভারতের জন্য চীন কোনো নির্ভরযোগ্য বা গুরুত্ব দেওয়ার মতো প্রযুক্তির বিকল্প নয়। তাই তাদের ধারণা, ভারত শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাদের কাছেই ভিক্ষার পাত্র নিয়ে আসবে। এই জটিল ধাঁধার কোনো সহজ বা স্বল্পমেয়াদি উত্তর নেই।
বর্তমান ভারতীয় সরকারের ভেতরে যে আমেরিকা-পন্থী শক্তিশালী লবি রয়েছে, যারা আমেরিকার নাম শুনলেই লড়াই করার আগেই পরাজয় স্বীকার করে নেয় এবং আত্মসমর্পণ করে, তাদের এই পরাজয়বাদী মানসিকতাকে আমাদের অবশ্যই কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। এটিও অত্যন্ত পরিহাসের বিষয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই সফরটির সাফল্য পরিমাপ করবে মূলত এর মাধ্যমে– যে ভারতের কতখানি বিনিয়োগ তারা নিজেদের দেশে টেনে নিয়ে যেতে পারল। এখানেও আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ভারতের আম্বানি ও আদানি গ্রুপের মতো বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল আমাদের দেশকে আমেরিকার কাছে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল করে তুলেছে।
ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণের সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল যে, উভয় দেশই একটি উন্মুক্ত, উদার এবং মুক্ত সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা রাখত। কিন্তু বর্তমানের এই দুই দেশের শাসনব্যবস্থাকে যা সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি এনেছে, তা হলো অন্যায় ও কেবলই সুযোগসন্ধানী লেনদেনবাদের সাথে তাদের আপস ও সমঝোতা করার স্বাচ্ছন্দ্য। তবে এই অন্ধকারের মুহূর্তেও, ভারতকে নিজের এই অসহায় ও মেরুদণ্ডহীন আত্মসমর্পণ প্রবণতার মুখোমুখি হতে হবে। আমেরিকা ও নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সমস্ত অলীক বিভ্রম ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমাদের স্বার্থগুলো এত সহজে মিলে যাওয়ার মতো সরল নয়– আসুন আমরা প্রথমে এই কঠিন সত্যটি স্বীকার করার মধ্য দিয়েই পরিবর্তনের সূচনা করি।
লেখক: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

আজকের দিনে এসে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থকে এত সহজে এক লাইনে মেলানো সম্ভব নয়। আর এই রূঢ় সত্যটির মুখোমুখি হওয়া আমাদের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-এর এক গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে, ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীর সত্যগুলোকে খোলা চোখে নিজেকে দেখতে হবে।
ইদানিং ভারত, তথা সমগ্র বিশ্বকে দেখলে মনে হয় যেন তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া কোনো হরিণ মাঝরাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র কেবল যে একটি অবিশ্বস্ত রাষ্ট্র, তা-ই নয়, বরং এই মুহূর্তে তারা বিশ্ব স্থিতিশীলতার বুকে সবচেয়ে বড় আঘাত বা ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ অন্যদিকে চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করার মধ্যেও রয়েছে এক চরম অস্বস্তি। এই দুই পরাশক্তিকে প্রতিহত করার মতো কোনো কার্যকর বিকল্প আন্তর্জাতিক জোটও এখনো গড়ে ওঠেনি।
ভারত মুখে সবসময় সভ্যতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুপক্ষীয় বিশ্বের কথা বলে, অথচ বাস্তবে দিন দিন তারা সাম্রাজ্যবাদী জবরদস্তির সঙ্গে আপস করতে এবং তা মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
তবে ভারতের বর্তমান দুর্দশার অনেকখানিই আসলে নিজেদের ডেকে আনা স্বখাত সলিল। ভারতকে সবার আগে নিজের লালিত বিভ্রমগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রথমত, আমেরিকার সাথে যেকোনো ধরনের লেনদেন বা কূটনীতির ক্ষেত্রে কেবল দ্বিপক্ষীয় সুবিধা কিংবা চীনকে নিয়ে দুশ্চিন্তার সমীকরণ মাথায় রাখলেই চলবে না, বরং পুরো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত সংকুচিত ও মর্যাদা হারিয়েছে। কারণ আমরা এখন এমন এক ধারণার ওপর ভিত্তি করে চলছি যেখানে মনে করা হয়–পৃথিবী ধ্বংস হলে হোক, আমাদের কেবল নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থটুকুর দিকে নজর দিলেই চলবে।
এই ভুলের জন্য কেবল ভারত একাই দায়ী নয়। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় কিছু তাৎক্ষণিক লাভ কিংবা অতি অল্প সময়ের কৌশলগত চিন্তাভাবনা করে ভারতের মতো একটি বিশাল দেশের দীর্ঘমেয়াদি উত্থান নিশ্চিত করা যাবে– এমন ভাবনা অত্যন্ত দূরদৃষ্টিহীন। ভারতের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকে তাকালে এটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক এবং বেদনাদায়ক যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতই একমাত্র দেশ হিসেবে বর্তমানে একটি নয়, বরং দুটি সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পকে কার্যত পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করল, তখন আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে ভারতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত মৃদু ও দায়সারা। আর অন্যদিকে ইরানের বিষয়ে ইসরায়েল এবং আমেরিকার কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলোকে ভারতের নীরব ও প্রায় প্রকাশ্য আলিঙ্গন এবং সমর্থন দেওয়াটা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
ভারত মুখে সবসময় সভ্যতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুপক্ষীয় বিশ্বের কথা বলে, অথচ বাস্তবে দিন দিন তারা সাম্রাজ্যবাদী জবরদস্তির সঙ্গে আপস করতে এবং তা মেনে নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। কিন্তু এই ধরনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্রয় দেওয়া সরাসরি ভারতের নিজস্ব বস্তুগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থেরই ক্ষতি করছে। আমরা অনেক দেরিতে হলেও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ আমাদের অর্থনীতিতে যেকোনো প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও অনেক বেশি বস্তুগত ক্ষতি সাধন করবে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির নীতিনির্ধারক মহলের একটি বড় অংশ, এমনকি জনমতের একাংশও অবচেতনভাবে এই ধারণাটি নিজেদের মনে স্থান দিয়ে ফেলেছে যে– ভারতের উত্থান অনিবার্যভাবেই মার্কিন ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে আছে এবং এর বাইরে কোনো পথ নেই।
আমাদের আবার এই চিন্তায় ফিরে যেতে হবে যে, যা পুরো বিশ্বের জন্য ভালো, তা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের নিজেদের জন্যও ভালো বয়ে আনবে। এর জন্য বর্তমান রূপে যুক্তরাষ্ট্রকে সঠিকভাবে চেনা প্রয়োজন– সেটি হলো একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এক নতুন এবং বিপজ্জনক শূন্যতাবাদের জন্ম দিচ্ছে। আমেরিকা কোনো ত্রাণকর্তা নয়, বরং তারা একটি প্রকাশ্য হুমকি।
প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো দেশের সঙ্গে সহজে ডিল করতে পারে না যারা তাদের আনুষ্ঠানিক মিত্র বা বন্ধু নয়, আর ভারত সবসময় নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু বর্তমান সময়টি এই চেনা ধারণার বাইরে গিয়ে দুটি ভিন্ন উপায়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রথমটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই তার বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরকে এক চরম ও লাঞ্ছনাকর নির্ভরশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী। গত কয়েক বছরে এটি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ভারতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি সাধারণ জোট বা মিত্রতার চেয়েও গভীর কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে মনে হবে, ভারত এখনো তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করছে–যেমন দেশটি এখনো রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে মাঝেমধ্যে আমেরিকার বিপক্ষে বা ভিন্ন কোনো ভোট দিচ্ছে। তবুও এই বাহ্যিক অঙ্গভঙ্গির বাইরে, আমাদের ভেতরে আরও গভীর কোনো পরিবর্তন ঘটে গেছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির নীতিনির্ধারক মহলের একটি বড় অংশ, এমনকি জনমতের একাংশও অবচেতনভাবে এই ধারণাটি নিজেদের মনে স্থান দিয়ে ফেলেছে যে– ভারতের উত্থান অনিবার্যভাবেই মার্কিন ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে আছে এবং এর বাইরে কোনো পথ নেই।
আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তির চেয়েও মনের ভেতরের এই পরনির্ভরশীলতার মনস্তত্ত্ব অনেক বেশি বিপজ্জনক। এই মানসিক পরিবর্তনের প্রমাণ আমরা আমাদের প্রকাশ্য আলোচনা বা ভূ-রাজনীতি মূল্যায়নের দিকে তাকালেই স্পষ্ট দেখতে পাই। এটি সত্যিই অবাক করার মতো বিষয় যে, হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া যেকোনো অস্থিতিশীলতার সমস্ত দায় কত সহজে এবং দ্রুততার সাথে কেবল ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কারণে যে এই প্রণালিটি বন্ধের উপক্রম হয়েছে– সেই সত্যটিকে কত নিখুঁতভাবে আড়াল করা বা খাটো করে দেখা হয়।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা সরকার সম্পর্কে যার যা-ই মতামত থাকুক না কেন, ইসরায়েল, আমেরিকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ভারতের এই প্রকাশ্য হাত মেলানো– যা বিশ্বব্যবস্থায় চরম নেতিবাচক দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে– তা আসলে ভারতের এই চিন্তাদৈন্য ও আদর্শিক আত্মসমর্পণেরই বহিঃপ্রকাশ।
আমেরিকার প্রতি ভারতের এই অন্ধত্ব ও মোহের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের দিকে তাকালে। এটি সবসময়ই স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই পাকিস্তানকে কেবল ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে না। কিন্তু আমাদের এই ভুল ভাঙল বারবার, বিশেষ করে ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়ে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এই উপমহাদেশীয় স্থিতিশীলতার একমাত্র এবং অপরিহার্য বহিরাগত গ্যারান্টার বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত হয়তো মুখে বা জনসমক্ষে কোনো ধরনের তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার ভাষা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কিন্তু আমেরিকা খুব কম সময়ই আঞ্চলিক সালিশকারীর ভূমিকা ত্যাগ করে এবং পাকিস্তান সবসময়ই তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ও থাকবে।
এই উপমহাদেশে আমাদের স্বার্থ কখনোই আমেরিকার সাথে মিলবে না, তাই আমাদের নিজস্ব শর্তে এবং নিজেদের শক্তিতেই এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের আরেকটি যে বড় মোহ ভেঙে গেছে তা হলো– এশিয়ায় মার্কিন কৌশলের জন্য ভারত অত্যন্ত অপরিহার্য ও অনবদ্য অংশ হবে। কিন্তু আসল সত্যটি হলো, আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব আসলে খুবই প্রতিস্থাপনযোগ্য বা সামান্য, তারা চাইলেই ভারতকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে সমীকরণ মেলাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা অবশ্যই ভারতের জন্য উপকারী হতে পারত। তবে ভারতের ওপর আমেরিকার আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্কগুলো কিন্তু কেবল তাদের শিল্পনীতির অংশ ছিল না, বরং তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে তার আসল অবস্থান বা সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করায় ভারত সাময়িকভাবে হয়তো কিছুটা হাফ ছেড়ে বেঁচেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে কতটা শোষণমূলক বা একতরফা সুবিধা আদায় করতে চায়, সে বিষয়ে আমাদের কোনো বিভ্রমে থাকা উচিত নয়। এবং ট্রাম্পের মেয়াদের বাইরেও আমেরিকার এই চরিত্র একই থাকবে। আবারও বলা যায়, ভারত আমেরিকার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে নিজেকে যুক্ত করে সুবিধা নিতে পারত। কিন্তু আমেরিকার টেবিলে যে গভীর অহংকার ও দম্ভ রয়েছে, তা ভারতকে খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। আমেরিকা মনে মনে নিশ্চিত যে ভারত প্রযুক্তির দিক থেকে তাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং ভারতের জন্য চীন কোনো নির্ভরযোগ্য বা গুরুত্ব দেওয়ার মতো প্রযুক্তির বিকল্প নয়। তাই তাদের ধারণা, ভারত শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তাদের কাছেই ভিক্ষার পাত্র নিয়ে আসবে। এই জটিল ধাঁধার কোনো সহজ বা স্বল্পমেয়াদি উত্তর নেই।
বর্তমান ভারতীয় সরকারের ভেতরে যে আমেরিকা-পন্থী শক্তিশালী লবি রয়েছে, যারা আমেরিকার নাম শুনলেই লড়াই করার আগেই পরাজয় স্বীকার করে নেয় এবং আত্মসমর্পণ করে, তাদের এই পরাজয়বাদী মানসিকতাকে আমাদের অবশ্যই কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। এটিও অত্যন্ত পরিহাসের বিষয় যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই সফরটির সাফল্য পরিমাপ করবে মূলত এর মাধ্যমে– যে ভারতের কতখানি বিনিয়োগ তারা নিজেদের দেশে টেনে নিয়ে যেতে পারল। এখানেও আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ভারতের আম্বানি ও আদানি গ্রুপের মতো বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল আমাদের দেশকে আমেরিকার কাছে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল করে তুলেছে।
ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণের সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল যে, উভয় দেশই একটি উন্মুক্ত, উদার এবং মুক্ত সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা রাখত। কিন্তু বর্তমানের এই দুই দেশের শাসনব্যবস্থাকে যা সবচেয়ে বেশি কাছাকাছি এনেছে, তা হলো অন্যায় ও কেবলই সুযোগসন্ধানী লেনদেনবাদের সাথে তাদের আপস ও সমঝোতা করার স্বাচ্ছন্দ্য। তবে এই অন্ধকারের মুহূর্তেও, ভারতকে নিজের এই অসহায় ও মেরুদণ্ডহীন আত্মসমর্পণ প্রবণতার মুখোমুখি হতে হবে। আমেরিকা ও নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সমস্ত অলীক বিভ্রম ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমাদের স্বার্থগুলো এত সহজে মিলে যাওয়ার মতো সরল নয়– আসুন আমরা প্রথমে এই কঠিন সত্যটি স্বীকার করার মধ্য দিয়েই পরিবর্তনের সূচনা করি।
লেখক: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।