চরচা ডেস্ক

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকেরা যেকোনো বড় ধরনের ওলটপালট বা ধাক্কা সামলাতে অভ্যস্ত। এসব তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। ১৯৭৩ সালের তেলের বাজারে আকস্মিক সংকটকে কাজে লাগিয়েই এই অঞ্চলের তেল-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো ব্যাপক ধনী হয়ে উঠেছিল।
তার ঠিক ছয় বছর পর, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে ইরানে যখন বিপ্লব ঘটল, তখন নিজেদের সুরক্ষার জন্য এই দেশগুলোর বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়েছিল। আর অতি সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ হয়ে গেল, সেটিও এই অঞ্চলের দেশগুলোকে বেশ অস্থির ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যেভাবে অবিশ্বাস্য রকম উদার ও লোভনীয় শান্তির শর্ত দিচ্ছেন, তা যুদ্ধ-পরবর্তী এই নতুন কূটনৈতিক বোঝাপড়া বা চুক্তিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আর এটিই উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করছে। আগামী কয়েক মাসে এই অঞ্চলের বহু পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত সমীকরণ চিরতরে বদলে যেতে চলেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিশাল পরিবর্তনের সাথে এই অঞ্চলের দেশগুলো কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবে?
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি কেবল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোল পাম্প বা তেলের খনিই নয়। এর বিমানবন্দরগুলো যাত্রী পরিবহন, কার্গো এবং অন্যান্য লজিস্টিকস বা পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য বৈশ্বিক হাব বা প্রধান কেন্দ্র।
এখানকার আর্থিক কেন্দ্র বা ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারগুলোও দিন দিন আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। অনেক ধনী প্রবাসী এখানকার ট্যাক্স সুবিধা এবং চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছেন।
তবে এই সব সুযোগ-সুবিধা সচল রাখার জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলয়ের প্রয়োজন, বিশেষ করে এমন একটি অঞ্চলে যা অন্য সব দিক থেকে অত্যন্ত অস্থির।

আর ইরান এখন এই নিরাপদ বলয়টিকেই ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালির ওপর বর্তমানে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তারা এখন এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী তেল ট্যাংকারগুলোর ওপর চড়া ফি ধার্য করার পরিকল্পনা করছে, যা হয়তো বাধ্যতামূলক বিমা প্রিমিয়ামের নামে চালানো হতে পারে।
এর মাধ্যমে ইরান বছরে শত শত কোটি ডলার আয় করতে পারে। অন্যদিকে, তেল ব্যবহারকারী বড় বড় দেশগুলো যেভাবে তেল বর্জন করে নিজেদের অর্থনীতিকে বিকল্প জ্বালানির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তা-ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তাহলে এখন করণীয় কী? উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো খুব ভালো করেই জানে যে তারা এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আমেরিকা হয়তো ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঠেকিয়ে দিতে সাহায্য করেছে, কিন্তু এই পরাশক্তি এখন বেশ অধৈর্য এবং নিরাপত্তার বিশ্বস্ত রক্ষক হিসেবে দিন দিন আরও বেশি নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছে।
তাই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে এখন নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি করে নিজেদের হাতেই তুলে নিতে শিখতে হবে। আর এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতি পদে আমেরিকার ডাক বা মধ্যস্থতার জন্য অপেক্ষা না করে, নিজেদের মধ্যে একসাথে কাজ করার এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ খুঁজে বের করা।
সবচেয়ে জরুরি হলো সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ব্যক্তিগতভাবে সামরিক সরঞ্জামের পেছনে বিপুল অর্থ ঢাললেও, কারো পক্ষেই এককভাবে এবং অন্যের সাহায্য ছাড়া ইরানের হামলা ঠেকানো সম্ভব ছিল না।

এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত , যাদের নিজস্ব আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক, তাদেরও শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়ার শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। আর আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সে সময় ইসরায়েল তড়িঘড়ি করে তাদের একটি আয়রন ডোম ব্যাটারি সেখানে পাঠিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তার উপসাগরীয় মিত্রদেরকে একে অপরের সাথে আরও বেশি সহযোগিতা করার জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে। তারা এতদিন এই পরামর্শ এড়িয়ে চললেও, এখন আর নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস টিকিয়ে রাখার বিলাসিতা করার সুযোগ তাদের নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের কার্যকর আদান-প্রদান নিশ্চিত করা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া একটি কার্যকর সূচনা হতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, ড্রোনের উপস্থিতি আরও আগেভাগে শনাক্ত করার জন্য এই অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষায় একটি নতুন অ্যাকোস্টিক-সেন্সর বা শব্দ-তরঙ্গভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঠিক যেমনটা ইউক্রেন করেছে। আর ইউক্রেন ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম এবং উপদেষ্টা দিয়ে সাহায্য করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
এরপর আসে অবকাঠামোর বিষয়টি। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ বা রুট তৈরি করতে হবে। তারা অন্য কোনো পথ দিয়ে যেমন লোহিত সাগর বা ভূমধ্যসাগরের দিকে নতুন আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন বা ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে যত বেশি তেল ও গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে, ইরানের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ততই দুর্বল হয়ে পড়বে।
যে দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াবে, প্রতিবেশীদের নিজেদের বন্দর ব্যবহার করতে দেবে এবং রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে আরও শক্তিশালী সড়ক ও রেলপথ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, পরবর্তীতে কোনো হুমকি এলে তারাই বেশি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী থাকবে। সময়ের সাথে সাথে তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণকে স্রেফ একটি মূল্যহীন বা অকার্যকর সম্পদে পরিণত করা।
এই সবকিছুই আসলে প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। আর এর জন্য প্রয়োজন কৌশলগত পরিবর্তন, পররাষ্ট্রনীতির তিক্ত বৈরিতাগুলো কাটিয়ে ওঠা, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। কারণ তারা উভয় পক্ষই নিজেকে এই অঞ্চলের যোগ্য নেতৃত্ব মনে করে। ইয়েমেন এবং হর্ন অব আফ্রিকা বা আফ্রিকার শিং অঞ্চলে তাদের যে মারাত্মক হস্তক্ষেপ ও নাক গলানো, তা মূলত নিজেদেরই ক্ষতি করার মতো এক আত্মঘাতী বিভ্রান্তি ছিল।
ইরানের মতো একটি সাধারণ ও যৌথ হুমকির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ন্যূনতম আশাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে হলে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই অন্য কোথাও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের এই বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই বৈরিতাগুলো কমে যাওয়ার বদলে দিন দিন যেন আরও বেশি কঠোর ও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
কেবল একটি ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের পক্ষেই ইরানি আগ্রাসনের মুখে টিকে থাকা সম্ভব। এক্ষেত্রে ইউরোপ যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে বেঁচে আছে, তা একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। তবে সৌদি আর আমিরাত যে তাদের দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারবে তা কেউই আশা করে না। আর ঠিক এই কারণেই, কাজটি এখনই শুরু করা আরও বেশি জরুরি।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকেরা যেকোনো বড় ধরনের ওলটপালট বা ধাক্কা সামলাতে অভ্যস্ত। এসব তাদের জন্য নতুন কিছু নয়। ১৯৭৩ সালের তেলের বাজারে আকস্মিক সংকটকে কাজে লাগিয়েই এই অঞ্চলের তেল-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো ব্যাপক ধনী হয়ে উঠেছিল।
তার ঠিক ছয় বছর পর, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে ইরানে যখন বিপ্লব ঘটল, তখন নিজেদের সুরক্ষার জন্য এই দেশগুলোর বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়েছিল। আর অতি সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ হয়ে গেল, সেটিও এই অঞ্চলের দেশগুলোকে বেশ অস্থির ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন যেভাবে অবিশ্বাস্য রকম উদার ও লোভনীয় শান্তির শর্ত দিচ্ছেন, তা যুদ্ধ-পরবর্তী এই নতুন কূটনৈতিক বোঝাপড়া বা চুক্তিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আর এটিই উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করছে। আগামী কয়েক মাসে এই অঞ্চলের বহু পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত সমীকরণ চিরতরে বদলে যেতে চলেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিশাল পরিবর্তনের সাথে এই অঞ্চলের দেশগুলো কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবে?
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি কেবল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোল পাম্প বা তেলের খনিই নয়। এর বিমানবন্দরগুলো যাত্রী পরিবহন, কার্গো এবং অন্যান্য লজিস্টিকস বা পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য বৈশ্বিক হাব বা প্রধান কেন্দ্র।
এখানকার আর্থিক কেন্দ্র বা ফাইন্যান্সিয়াল সেন্টারগুলোও দিন দিন আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। অনেক ধনী প্রবাসী এখানকার ট্যাক্স সুবিধা এবং চমৎকার রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছেন।
তবে এই সব সুযোগ-সুবিধা সচল রাখার জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলয়ের প্রয়োজন, বিশেষ করে এমন একটি অঞ্চলে যা অন্য সব দিক থেকে অত্যন্ত অস্থির।

আর ইরান এখন এই নিরাপদ বলয়টিকেই ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালির ওপর বর্তমানে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তারা এখন এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী তেল ট্যাংকারগুলোর ওপর চড়া ফি ধার্য করার পরিকল্পনা করছে, যা হয়তো বাধ্যতামূলক বিমা প্রিমিয়ামের নামে চালানো হতে পারে।
এর মাধ্যমে ইরান বছরে শত শত কোটি ডলার আয় করতে পারে। অন্যদিকে, তেল ব্যবহারকারী বড় বড় দেশগুলো যেভাবে তেল বর্জন করে নিজেদের অর্থনীতিকে বিকল্প জ্বালানির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তা-ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তাহলে এখন করণীয় কী? উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো খুব ভালো করেই জানে যে তারা এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আমেরিকা হয়তো ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঠেকিয়ে দিতে সাহায্য করেছে, কিন্তু এই পরাশক্তি এখন বেশ অধৈর্য এবং নিরাপত্তার বিশ্বস্ত রক্ষক হিসেবে দিন দিন আরও বেশি নির্ভরযোগ্যতা হারাচ্ছে।
তাই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে এখন নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি করে নিজেদের হাতেই তুলে নিতে শিখতে হবে। আর এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতি পদে আমেরিকার ডাক বা মধ্যস্থতার জন্য অপেক্ষা না করে, নিজেদের মধ্যে একসাথে কাজ করার এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ খুঁজে বের করা।
সবচেয়ে জরুরি হলো সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ব্যক্তিগতভাবে সামরিক সরঞ্জামের পেছনে বিপুল অর্থ ঢাললেও, কারো পক্ষেই এককভাবে এবং অন্যের সাহায্য ছাড়া ইরানের হামলা ঠেকানো সম্ভব ছিল না।

এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত , যাদের নিজস্ব আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত ও আধুনিক, তাদেরও শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ও দক্ষিণ কোরিয়ার শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। আর আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সে সময় ইসরায়েল তড়িঘড়ি করে তাদের একটি আয়রন ডোম ব্যাটারি সেখানে পাঠিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তার উপসাগরীয় মিত্রদেরকে একে অপরের সাথে আরও বেশি সহযোগিতা করার জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে। তারা এতদিন এই পরামর্শ এড়িয়ে চললেও, এখন আর নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস টিকিয়ে রাখার বিলাসিতা করার সুযোগ তাদের নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের কার্যকর আদান-প্রদান নিশ্চিত করা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া একটি কার্যকর সূচনা হতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, ড্রোনের উপস্থিতি আরও আগেভাগে শনাক্ত করার জন্য এই অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষায় একটি নতুন অ্যাকোস্টিক-সেন্সর বা শব্দ-তরঙ্গভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঠিক যেমনটা ইউক্রেন করেছে। আর ইউক্রেন ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম এবং উপদেষ্টা দিয়ে সাহায্য করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
এরপর আসে অবকাঠামোর বিষয়টি। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ বা রুট তৈরি করতে হবে। তারা অন্য কোনো পথ দিয়ে যেমন লোহিত সাগর বা ভূমধ্যসাগরের দিকে নতুন আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন বা ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে যত বেশি তেল ও গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে, ইরানের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ততই দুর্বল হয়ে পড়বে।
যে দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াবে, প্রতিবেশীদের নিজেদের বন্দর ব্যবহার করতে দেবে এবং রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে আরও শক্তিশালী সড়ক ও রেলপথ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, পরবর্তীতে কোনো হুমকি এলে তারাই বেশি সুরক্ষিত ও শক্তিশালী থাকবে। সময়ের সাথে সাথে তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণকে স্রেফ একটি মূল্যহীন বা অকার্যকর সম্পদে পরিণত করা।
এই সবকিছুই আসলে প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। আর এর জন্য প্রয়োজন কৌশলগত পরিবর্তন, পররাষ্ট্রনীতির তিক্ত বৈরিতাগুলো কাটিয়ে ওঠা, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। কারণ তারা উভয় পক্ষই নিজেকে এই অঞ্চলের যোগ্য নেতৃত্ব মনে করে। ইয়েমেন এবং হর্ন অব আফ্রিকা বা আফ্রিকার শিং অঞ্চলে তাদের যে মারাত্মক হস্তক্ষেপ ও নাক গলানো, তা মূলত নিজেদেরই ক্ষতি করার মতো এক আত্মঘাতী বিভ্রান্তি ছিল।
ইরানের মতো একটি সাধারণ ও যৌথ হুমকির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ন্যূনতম আশাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে হলে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই অন্য কোথাও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের এই বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই বৈরিতাগুলো কমে যাওয়ার বদলে দিন দিন যেন আরও বেশি কঠোর ও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
কেবল একটি ঐক্যবদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের পক্ষেই ইরানি আগ্রাসনের মুখে টিকে থাকা সম্ভব। এক্ষেত্রে ইউরোপ যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে বেঁচে আছে, তা একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। তবে সৌদি আর আমিরাত যে তাদের দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারবে তা কেউই আশা করে না। আর ঠিক এই কারণেই, কাজটি এখনই শুরু করা আরও বেশি জরুরি।