‘পাওয়ার ন্যাপ’ কীভাবে কাজে আসে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘পাওয়ার ন্যাপ’ কীভাবে কাজে আসে?
পাওয়ার ন্যাপ' আমাদের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারের অন্যতম সহজ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত উপায়। ছবি: ফ্রিপিক

দুপুরের ক্লান্তি, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসা, মনোযোগ হঠাৎ কমে যাওয়া- এই অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই। কাজের ব্যস্ততা এবং মানসিক চাপের কারণে দিনের মাঝামাঝি সময়ে শরীর যখন একটু বিশ্রাম দাবি করে, তখন অল্প সময়ের ঘুম অর্থাৎ ‘পাওয়ার ন্যাপ’ আমাদের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারের অন্যতম সহজ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত উপায়। এই নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জেমস বি মাস এর নাম দেয় ‘পাওয়ার ন্যাপ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। সে সময় তিনি কর্মক্ষেত্রে ছোট ঘুমের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে সমর্থন করার জন্য এই শব্দটি চালু করেন। তিনি দাবি করেন, মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটের এই ঘুম শরীর-মনকে অবিশ্বাস্যভাবে রিচার্জ করতে পারে। পরে এর আরও অনেক উপকারি দিক বিজ্ঞানীরা বের করেন।

মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বেলা স্বল্প সময়ের ন্যাপ মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশকে সক্রিয় করে, যা স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। আপনি যদি সকাল থেকে টানা কাজ করে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, একটি পাওয়ার ন্যাপ মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে আবার তীক্ষ্ণ করে তোলে। শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, প্রোগ্রামার কিংবা যেকোনো মানুষ যাদের মস্তিষ্ক-নির্ভর কাজ বেশি তাদের জন্য এই ছোট্ট ন্যাপ কার্যকরভাবে ‘মেন্টাল রিসেট’ হিসেবে কাজ করে।

পাওয়ার ন্যাপ মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে আবার তীক্ষ্ণ করে তোলে। ছবি: পেক্সেল ডট কম
পাওয়ার ন্যাপ মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণকে আবার তীক্ষ্ণ করে তোলে। ছবি: পেক্সেল ডট কম

স্ট্রেস কমায় এবং মেজাজ ভালো করে

স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল দিনের শেষভাগে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে থাকে। তবে একটি পাওয়ার ন্যাপ এর মাত্রা কমিয়ে মস্তিষ্কে প্রশান্তি আনে। এতে চাপ, বিরক্তি কমে যায় এবং মন ভালো হয়ে ওঠে। যারা অফিসের কাজে অতিরিক্ত চাপ অনুভব করেন বা সম্পর্কজনিত দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তাদের জন্য ১৫ মিনিটের ন্যাপ মানসিক সুস্থতার ফার্স্ট-এইডের মতো কাজ করতে পারে।

সৃজনশীলতা বাড়ায়

পাওয়ার ন্যাপ সৃজনশীলতাও বাড়ায়। ঘুমের হালকা প্রথম ধাপে (এনওয়ান) মস্তিষ্ক অবচেতনভাবে নানা সংযোগ তৈরি করে, যা আইডিয়া জেনারেশনের ক্ষমতা বাড়ায়। অনেক লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী বা ডিজাইনার দুপুরে ছোট ঘুমকে ‘আইডিয়া ট্রিগার’ হিসেবেই ব্যবহার করেন। আপনি যদি লেখালেখি, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, স্টোরিটেলিং বা যেকোনো সৃজনশীল কাজ করেন এক কাপ কফির চেয়েও একটি পাওয়ার ন্যাপ হতে পারে অনেক বেশি কার্যকর।

হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষা করে

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্বল্প সময়ের ন্যাপ হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, হার্টরেট কিছুটা কমায় এবং শরীরকে সামগ্রিকভাবে আরাম দেয়। যারা অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন বা মানসিক চাপ বেশি নেন- তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন, অল্প ন্যাপ দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে।

শরীরের এনার্জি পুনরুদ্ধার

দিনের মাঝামাঝি সময়ে শরীরের এনার্জি নেমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে ভারী লাঞ্চ, ঘুমের ঘাটতি বা রাতের অনিদ্রা থাকলে ক্লান্তি দ্রুত চলে আসে। একটি পাওয়ার ন্যাপ শরীরের এনার্জি লেভেলকে আবার পূরণ করে, মাংসপেশিকে আরাম দেয় এবং টানটান ভাব কমায়। ফলাফল দুপুরের পরের কাজগুলো আপনি অনেক বেশি মনোযোগ ও সতেজতা নিয়ে করতে পারবেন।

পাওয়ার ন্যাপ শরীরের এনার্জি লেভেলকে আবার পূরণ করে। ছবি: ফ্রিপিক
পাওয়ার ন্যাপ শরীরের এনার্জি লেভেলকে আবার পূরণ করে। ছবি: ফ্রিপিক

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে

ঘুমের অভাব ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করে। অল্প সময়ের পাওয়ার ন্যাপ শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলোকে কিছুটা হলেও সক্রিয় করে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। তাই যারা নিয়মিত কম ঘুমের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাদের জন্য পাওয়ার ন্যাপ একটি দ্রুত পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি।

সঠিক সময় ও দৈর্ঘ্য গুরুত্বপূর্ণ

সব ন্যাপ কিন্তু পাওয়ার ন্যাপ নয়। পাওয়ার ন্যাপকে কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয় জরুরি—

সময়: দুপুর ১টা থেকে ৩টার মধ্যে ন্যাপ নিলে সবচেয়ে ভালো।

দৈর্ঘ্য: ১০-২০ মিনিট আদর্শ। এর বেশি ঘুমালে ‘স্লিপ ইনর্শিয়া’ (ঘুম ঘুম ভাব এবং মাথা ভার হয়ে থাকে) তৈরি হয়।

পরিবেশ: শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক জায়গা বেছে নিন।

ক্যাফেইন: ন্যাপের ১ ঘণ্টা আগে কফি বা চা না খাওয়াই ভালো।

তথ্যসূত্র: হেলথ এসেনশিয়ালস

সম্পর্কিত