তেল বারবার ব্যবহার করা নিরাপদ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
তেল বারবার ব্যবহার করা নিরাপদ?
রান্নার তেল দুই থেকে তিনবারের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। ছবি: ফ্রিপিক

গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে শুরু করে হোটেল-রেঁস্তোরাতে একবার কড়াইয়ে তেল ঢেলে সেটি বারবার ব্যবহারের দৃশ্য খুবই সাধারণ। তবে এই পদ্ধতি খাবারের মানের অবনতিসহ স্বাস্থ্যেরও ব্যাপক ক্ষতি করে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের আকাশ হেলথকেয়ারের ডায়েটেটিকস বিভাগের প্রধান ডায়েটিশিয়ান জিন্নি কালরার মতে, “রান্নার তেল বারবার ব্যবহার করা উৎসাহিত করা উচিত না, বিশেষ করে যদি তা ঘন ঘন বা সঠিকভাবে সংরক্ষণ ছাড়া করা হয়।”

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, তেল বারবার গরম করলে এতে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অঙ্গ ও কোষের ক্ষতি করতে পারে।

ডা. জিন্নি বলেন, “ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের (আইসিএমআর) নির্দেশিকা অনুযায়ী, রান্নার তেল দুই থেকে তিনবারের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়। এর বেশি ব্যবহার করলে তেল ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে ওঠে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, তেল যদি ছেঁকে নেওয়া হয়, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং অতিরিক্ত গরম না করা হয়-তাহলে বাড়িতে তেল বারবার ব্যবহার করা কিছুটা গ্রহণযোগ্য হতে পাারে। তবে বাণিজ্যিক রান্নাঘরে ঝুঁকি বেশি থাকে।

তেল বারবার গরম করলে কী হয়?

ডা. জিন্নি বলেন, “তেল বারবার গরম করলে এতে একাধিক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। ট্রাইগ্লিসারাইড ভেঙে গিয়ে অ্যালডিহাইডের মতো ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয়, যা শরীরের ডিএনএ ও প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্ষতি করতে পারে। এসব পদার্থ অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বাড়ায়, যা জীবনযাপনজনিত নানা রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।”

বারবার গরম করা তেলে রান্না করা খাবার নিয়মিত খেলে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক
বারবার গরম করা তেলে রান্না করা খাবার নিয়মিত খেলে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক

এই বিশেষজ্ঞ আরও জানান, অতিরিক্ত গরমের ফলে তেলের অম্লতা ও পারঅক্সাইডের মাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা তেলকে খাওয়ার অনুপযুক্ত করে তোলে।

তেলের ধরন কি গুরুত্বপূর্ণ?

তেলের ধরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানান ডা. জিন্নি। প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ তেল-যেমন কোল্ড-প্রেসড সরিষার তেল, চিনাবাদাম তেল ও তিসির তেল অত্যধিক পরিশোধিত তেলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “কোনো তেলই ক্ষতির বাইরে নয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ তেলও বারবার অতিরিক্ত তাপে গরম করলে নষ্ট হয়ে যায়।”

কখন ভাজার তেল ফেলে দেওয়া উচিত?

ডা. জিন্নির মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে ভাজার তেল সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেওয়া উচিত।

  • তেলের রং গাঢ় বাদামি বা কালচে হয়ে যাওয়া
  • বাসি, পুড়ে যাওয়া বা অপ্রীতিকর গন্ধ
  • স্বাভাবিক তাপমাত্রায় অতিরিক্ত ধোঁয়া ওঠা
  • উপরে ফেনা বা বুদবুদ তৈরি হওয়া
  • তেল আঠালো বা ঘন হয়ে যাওয়া

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “এগুলো স্পষ্ট রাসায়নিক ভাঙনের লক্ষণ। এ অবস্থায় তেল ব্যবহার করলে শুধু স্বাদই নষ্ট হয় না, ক্ষতিকর যৌগের সংস্পর্শও বাড়ে।”

দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি

বারবার গরম করা তেলে রান্না করা খাবার নিয়মিত খেলে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ডা. জিন্নি। তার ভাষ্য, এ ধরনের তেল টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ এতে ক্ষতিকর চর্বি ও অক্সিডেটিভ যৌগের মাত্রা বেশি থাকে।

ডা. জিন্নি কালরার পরামর্শ, “ভোক্তা হিসেবে রান্নার অভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। রান্নায় টাটকা তেল ব্যবহার রান্না দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের জন্য একটি বিনিয়োগ।”

সম্পর্কিত