সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি ও সহিংসতার ধরন দিন দিন আধুনিক হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির সহায়তায় নারী সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে যৌন হয়রানি, সাইবার হামলা ও ছবি বিকৃত করে অপপ্রচারের ঘটনা বাড়ছে। অথচ এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হুমকির বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, দ্রুত প্রতিকার এবং জেলা পর্যায়ে সমান নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা অবসানবিষয়ক আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার পরও কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু ওই সাংবাদিকই ঝুঁকিতে পড়েন না, তার সহকর্মীদের মধ্যেও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
বিএনএনআরসি সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রতি সাংবাদিকদের সুরক্ষাকে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকির দ্রুত জবাব দিতে হবে এবং হামলার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান কোনোভাবেই বিচারের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়।
ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার হার ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১২ সালে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরুর পর এটিই প্রথম বৃদ্ধি। সংস্থাটির হিসাবে, দুই বছরে বিশ্বজুড়ে ১৮৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১২৭ জন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে এক হাজার ৭০০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ছয়টি যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু ড্রোন হামলাতেই ৫০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার অপরাধের ধরন বদলে দিলেও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা সেই গতিতে এগোচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের স্তব্ধ করতে শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, অপহরণ, নির্যাতন, অন্যায় আটক ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো পন্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধের চেষ্টা চলছে। এসব ঘটনায় বিচারহীনতা অব্যাহত থাকলে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপরাধের তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিএনএনআরসি বলেছে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের এক দশকের বেশি সময় পার হলেও মামলাটির বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দীর্ঘসূত্রতার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের অনেক ঘটনারও বিচার হয়নি।
প্রযুক্তির সহায়তায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ভয়াবহতা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনেস্কো ও আইসিএফজের এক প্রতিবেদনে জরিপে অংশ নেওয়া নারী সাংবাদিকদের ৭৩ শতাংশ কাজের সূত্রে অনলাইন সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশেও বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষায় যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, সাইবার হয়রানি এবং এআই ব্যবহার করে ছবি বিকৃত করার মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের নীরব করার চেষ্টা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে জানায় বিএনএনআরসি।
সংস্থাটি জানায়, তারা ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড’ কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
বিএনএনআরসি আরও বলেছে, সাংবাদিকদের অনলাইন ও মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। হুমকির প্রমাণ সংরক্ষণ, অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিচয় ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিবৃতিতে জাতিসংঘের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও বিচারহীনতা রোধে কর্মপরিকল্পনার (ইউএন প্ল্যান অব অ্যাকশন) কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ২০১২ সালে গৃহীত এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেরও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে কার্যকর জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে।
সংস্থাটির মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু গণমাধ্যমের বিষয় নয়, এটি সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো সাংবাদিক সহায়তা চাওয়ার পর রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তদন্ত কতটা এগোচ্ছে এবং অপরাধীদের বিচার হচ্ছে কি না, তার ওপরই প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করছে। প্রতিটি জেলায় কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা বন্ধ করা সম্ভব।