চলতি অক্টোবর মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো তেলের মূল্যের নেতিবাচক প্রভাব এখনও বহাল রয়েছে ঢাকার নিত্যপণ্যের বাজারে। বাড়তি পরিবহন খরচের দোহাই দিয়ে সবজি, মাংস ও ডিমের দাম বাড়িয়ে চলেছেন ব্যবসায়ীরা, যার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
গতকাল বুধবার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, অক্টোবরে তেলের নতুন দর কার্যকর হচ্ছে না। এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় সরকার। এতে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা ও কেরোসিন ১৫৫ টাকায় ঠেকেছে।
রাজধানীর শান্তিনগর, বাড্ডা, রামপুরা ও মালিবাগ বাজার ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে খুচরা বাজারে। বাড্ডার সবজি বিক্রেতা হারুন বলেন, “তেলের দাম বাড়ার পর থেকে ট্রাক বা পিকআপের ভাড়া ট্রিপপ্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে সবজি আনার খরচও এক লাফ অনেক বেড়েছে।”
রামপুরা কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মুসলিম বলেন, “গত ১০ দিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়েছে।”
বাজারে মানভেদে গোল বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে, যা তেলের দাম বাড়ার আগে ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। বরবটির দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে। এছাড়া, ঝিঙে, করলা ও পটল ৫০-৬০ টাকার জায়গায় এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়।
উত্তাপ ছড়িয়েছে মাংস ও ডিমের বাজারেও। মধ্য বাড্ডা বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৮০০ টাকা। মাংস বিক্রেতা সাদ্দাম বলেন, ‘‘আমাদের বেশিভাগ গরু আসে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে। ওইসব এলাকা থেকে ট্রাক ভাড়া ট্রিপপ্রতি ৫-৬ হাজার টাকা বেড়েছে। বাধ্য হয়ে আমাদেরও দাম বাড়াতে হয়েছে।”
অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া এক ডজন ডিমের দাম এখন ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় পৌঁছেছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ ক্রেতারা। বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত মঈনুল হাসান বলেন, ‘‘একদিকে নতুন বেতন স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুন করা হলো, অন্যদিকে রাতারাতি তেলের দাম বাড়ানো হলো। সব বোঝা এসে পড়েছে আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঘাড়ে। জীবনযাত্রা চালানো এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল বায়েস সতর্ক করে বলেন, ‘‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পুরো ধাক্কা এখনো বাজারে আসেনি। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকদের সেচ খরচ প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা বেড়ে যাবে। ফলে চাল, ডাল, গমসহ সব খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও দাম দুই-ই বাড়বে।” সার সংকটের মধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যমূল্যকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, “অনেক অসাধু ব্যবসায়ী তেলের দামের অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত দাম আদায় করছে। কড়া বাজার মনিটরিং ছাড়া এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, “টেকসই জ্বালানি নীতি ছাড়া হুট করে দাম বাড়ানো হলে তার মাশুল পুরোপুরি সাধারণ ভোক্তাদেরই গুনতে হয়।”