Advertisement Banner

আদ-দ্বীনের এনআইসিইউতে এখনো ৫০ শিশু, অনিশ্চয়তায় স্বজনরা

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
আদ-দ্বীনের এনআইসিইউতে এখনো ৫০ শিশু, অনিশ্চয়তায় স্বজনরা
রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতাল। ছবি: চরচা

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় লাইসেন্স বাতিলের পর রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতাল থেকে রোগী স্থানান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে আইসিইউ, এনআইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউতে চিকিৎসাধীন সংকটাপন্ন রোগীদের নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি স্বজনদের। অন্যদিকে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যেও রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ রয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরও ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, লাইসেন্স বাতিলের সময় প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৪১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে অনেকেই ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে দুই শতাধিক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সরেজমিনে হাসপাতালের শিশু বিভাগে গিয়ে জানা যায়, গতকাল এনআইসিইউতে প্রায় ৬৫ জন শিশু থাকলেও আজকে সেখানে চিকিৎসাধীন আছে ৫০ জন শিশু। ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫ জন শিশুকে বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আগামীকালের মধ্যে বাকি শিশুদেরও সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

রোগী স্থানান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক নবজাতকের মা বলেন, ‘‘আমার বাচ্চার বয়স মাত্র ২১ দিন। জন্মের পর থেকেই সে এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন এবং বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। আমরা অন্য হাসপাতালের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি, কিন্তু চিকিৎসকরা বলেছেন এই অবস্থায় তাকে স্থানান্তর করা ঝুঁকিপূর্ণ। এখন যদি তাড়াহুড়ো করে সরাতে হয়, তাহলে শিশুর জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। আমরা চাই, আগে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, তারপর যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা এখন বাচ্চাটাকে সুস্থ রাখা।’’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) মো. আবু আহমেদ শফি বলেন, ‘‘লাইসেন্স বাতিল মানে এখানে আর নতুন রোগী ভর্তি হবে না। কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, তবে সিলগালা করা হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেটি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’’

হাসপাতালের আইন কর্মকর্তা সিফাত শাহারিহার বলেন, ‘‘আমরা সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখানে অনেক ক্রিটিকাল রোগী রয়েছে। তাদের ঝুঁকিমুক্তভাবে স্থানান্তর করতে সময় প্রয়োজন। নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে এবং আমরা রোগীদের নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’’

অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনিক সংকটের মধ্যেও চিকিৎসা কার্যক্রমে নিয়োজিত কর্মীরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কয়েকজন নার্স ও কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিনের কর্মস্থলকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও রোগীদের সেবায় কোনো ঘাটতি রাখতে চান না তারা।

দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স ইনচার্জ সেলিম হোসেন বলেন, ‘‘আমাদের বেতন-ভাতা আটকে আছে। তারপরও কারও কোনো অভিযোগ নেই। আমরা সবাই এখন আরও বেশি সতর্ক হয়ে কাজ করছি। অনেক বছর ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করছি, এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়িনি। রোগীদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেটাই এখন আমাদের প্রধান চিন্তা।’’

হাসপাতালের বাইরে দেখা যায়, নিয়মিত চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী ফিরে যাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ রেজা বলেন, ‘‘আমরা বিগত ১০ বছর ধরে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছি। অন্যান্য অনেক হাসপাতালের তুলনায় এখানে খরচ কম, সেবাও ভালো। হাসপাতাল সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা অবশ্যই দুঃখজনক, কিন্তু এর কারণে শত শত রোগীকে নতুন করে বিপদে ফেলা উচিত নয়।’’

উল্লেখ্য, সম্প্রতি মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পায়। প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ভিড়, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশন না থাকা এবং বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সম্পর্কিত