ads

‘বিরক্তিকর’ ম্যাচেই ইতিহাসের মহাকাব্য

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
‘বিরক্তিকর’ ম্যাচেই ইতিহাসের মহাকাব্য
ফাইনালের আগে বিশ্বকাপের এক পাগলাটে রাত। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ এক সাক্ষাৎ বিরক্তি। এই বিরক্তি মাঠে নামা দুই দল থেকে শুরু করে ফুটবলপ্রেমী—সবার। যেখানে সবার মনোযোগ থাকে ফাইনালের দিক, সেখানে এই ম্যাচটি সেভাবে আকর্ষণ তৈরি করতে পারে না। খেলোয়াড়দের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ম্যাচটা রীতিমতো অত্যাচারই। বিশেষ করে সেমিফাইনালে হারের পর যেখানে পরাজিত দুই দলের খেলোয়াড়েরা ক্লান্ত–বিধ্বস্ত ও মানসিকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, সেখানে এক বা দুই দিনের মাথায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ তাদের জন্য ভয়ংকর এক ব্যাপার।

কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটাও ঠাঁই পাচ্ছে ইতিহাসে। এ ম্যাচে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স জন্ম দিয়েছে মহাকাব্যের। দশ গোলের পাগলাটে রাতে যারা ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নিশ্চয়ই তাদের আক্ষেপের সীমা নেই।

Advertisement

ম্যাচের শুরু থেকেই ইংল্যান্ড বুঝিয়ে দিল, তৃতীয় স্থানের সান্ত্বনা তাদের কাছে এক অসমাপ্ত প্রতিশোধের মঞ্চ। গতিময় ফুটবল দিয়ে ফ্রান্সকে চেপে ধরে ৪৫ মিনিটেই ৪ গোল। ডান দিকে বুকায়ো সাকা আর বাম দিকে জুড বেলিংহাম—এই দুইয়ের যুগলবন্দীতে ফরাসি রক্ষণ উড়ে গেল খড়কুটোর মতোই।

ইতিহাস সৃষ্টির রাত ছিল এমবাপ্পের। ছবি: এপি/ইউএনবি
ইতিহাস সৃষ্টির রাত ছিল এমবাপ্পের। ছবি: এপি/ইউএনবি

ইংল্যান্ডের চারটি গোল যেন চার বজ্রপাত। ৩ মিনিটে ডেক্লান রাইস, ১৮ মিনিটে এজরি কনসার গোলের পর ৩৭ ও প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বুকায়ো সাকার আরও দুই গোল—পুরো বিশ্বকাপে যে ফ্রান্সকে অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছিল, সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর সেই ফ্রান্স কতটা বিধ্বস্ত সেটাই বোঝা যাচ্ছিল। প্রথমার্ধে যে ম্যাচে কোনো দল ৪–০ গোলে এগিয়ে যায়, সে ম্যাচের বাকি থাকে কি! ফুটবল রোমান্টিকেরা হয়তো আরও একটি ‘সেভেনআপ’ গল্প তৈরির অপেক্ষায় ছিলেন। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭–১ হারের সেই মহাকাব্যিক ইতিহাস, যে বিশ্বকাপের চিরন্তন এক গল্পই হয়ে আছে।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধেই ফ্রান্সের বোধহয় মনে পড়ল, তাদের কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো এক গোল মেশিন আছে।

যে রাত দেখল ভয়ংকর ইংল্যান্ডকে। ছবি: এপি/ইউএনবি
যে রাত দেখল ভয়ংকর ইংল্যান্ডকে। ছবি: এপি/ইউএনবি

বিরতির পর মাঠের সবুজ ঘাসে নামলেন এক অন্য এমবাপ্পে। তিনি যেন আর মানুষ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে ছুটে চলা এক জীবন্ত উল্কা। প্রথমে এক গোল, তারপর আরও এক। ব্র্যাডলি বারকোলা যোগ করলেন আরেকটি। উসমান দেম্বেলের জাদুতে ম্যাচ এমন এক রোমাঞ্চকর মোড় নিল, যেখানে ইংল্যান্ডের ৪-০ গোলের নিরাপদ পাহাড়টা হঠাৎ রূপ নিল ৫–৪ স্কোরলাইনে।

দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স, নির্দিষ্ট করে বললে, এমবাপ্পে আর দেম্বেলেদের ফুটবল শৈলিতে ফুটবল যে এক শিল্প, যেখানে প্রতিটি নতুন গোল আগের গোলের অর্থ বদলে দেয়, তা মায়ামির দর্শকরা স্তম্ভিত হয়ে দেখছিলেন। ফ্রান্সের এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ইংল্যান্ডের আধিপত্যকে এক ঝটকায় আতঙ্কে রূপ দিল। আর এই রোমাঞ্চকর ভয়ই তো ফুটবলকে সুন্দর করে তোলে। সেটাই দ্বিতীয়ার্ধে মনে পড়ছিল বারবার।

কিন্তু আবারও বুকায়ো সাকা! তিনি ফিরিয়ে আনলেন ইংল্যান্ডকে। পেনাল্টি থেকে গোল করে পূরণ করলেন হ্যাটট্রিক। এরপর জুড বেলিংহাম। মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে তিনি যে দৌড় শুরু করেছিলেন, তা শুধু গোল করার চেষ্টা ছিল না, ছিল এক রাজকীয় ঘোষণা। ফরাসি ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে তিনি যখন বল জালে জড়ালেন, স্কোরবোর্ড তখন জ্বলজ্বল করছে— ৬–৪।

তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান নির্ধারণী ম্যাচটা কিলিয়ান এমবাপ্পের অমরত্বের ম্যাচও ছিল। দুই গোল করেছেন। বিশ্বকাপের নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ১০–এ। বিশ্বকাপটা জিততে না পারেন, গোল্ডেন বুট জয়ের পথে তিনি এগিয়ে গেলেন অনেকটা পথই। লিওনেল মেসি যখন রোববার রাতে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালটা খেলতে নামবেন, তখন তিনি এমবাপ্পের চেয়ে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে পিছিয়ে। এমবাপ্পে বিশ্বকাপেই নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ২২–এ। সেটাও মেসির ২১ গোলের চেয়ে একটি বেশি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন এই এমবাপ্পেই।

ফুটবল এমনই—একই রাতে একজন মানুষ ইতিহাস গড়েন, অথচ ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে পারেন না। গোল্ডেন বুটের চূড়ায় উঠেও তার মুখের নীরবতায় মিশে রইল ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব আর দলের ব্যর্থতার এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

ফরাসিরা বিধ্বস্ত বুকায়ো সাকার হাতে। ছবি: এপি/ইউএনবি
ফরাসিরা বিধ্বস্ত বুকায়ো সাকার হাতে। ছবি: এপি/ইউএনবি

১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে এটাই ইংল্যান্ডের সেরা পারফরম্যান্স। দীর্ঘ ছয় দশকের হাহাকার, টাইব্রেকারের অভিশাপ আর সেমিফাইনালের ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে বেলিংহ্যাম, সাকা, কোল পামার আর ডেকলান রাইসদের এই তরুণ প্রজন্ম প্রমাণ করল—ইংল্যান্ডের ফুটবলের ভবিষ্যৎ এবার সত্যিই আলোর মুখ দেখছে।

তবে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান নির্ধারণী ম্যাচের অন্য একটা দিক খেয়াল করেছেন কেউ? এ ম্যাচে দুই দলের গোলগুলো কারা করলেন? গোলগুলোর উৎস ম্যানচেস্টার, লন্ডন কিংবা প্যারিসে তৈরি হয়নি। এই গোলগুলোর উৎস নাইজেরিয়ার উপকূল, ঘানার জনপদ আর জ্যামাইকার দ্বীপ। একই সঙ্গে ক্যামেরুন, আলজেরিয়া আর মৌরিতানিয়ায়। ইংল্যান্ড–ফ্রান্স দুটি দলের শক্তিই এখন অভিবাসী ফুটবলারদের দিয়ে গড়া। দুটি দলই ঔপনিবেশিক অতীতের প্রতিধ্বনি। যে দুই সাম্রাজ্য একসময় পৃথিবীকে ভাগ করেছিল, সেই ইতিহাসেরই সন্তানরা আজ ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের জার্সিকে দিচ্ছে নতুন অর্থ। মায়ামির দর্শক থেকে শুরু করে ‘বিরক্তিকর’ এই ম্যাচ যারা বিরক্তি নিয়ে দেখতে বসেছিলেন, তারা সবাই এক দারুণ ইতিহাসেরই সাক্ষী।

সম্পর্কিত