প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশোধনী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ১৯টি সংগঠন। তাদের মতে, সংশোধনীগুলো কোনো কার্যকর জনপরামর্শ ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে এবং এর উপাদানগুলো অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর চেয়েও বেশি দমনমূলক।
গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এসব কথা বলেছেন।
বিবৃতিটিতে স্বাক্ষর করেছে টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আর্টিকেল ১৯, বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন, সাইবার টিনস, ডিজিটালি রাইট, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি, ইনস্টিটিউট ফর ইনফর্মড ডেভেলপমেন্ট, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নারীর পক্ষ, সুরক্ষা ফাউন্ডেশন, দ্য টেক একাডেমি এবং ভয়েস।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো তৈরির ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর জনপরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় খসড়াটি এগিয়ে নেওয়ার আগে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, প্রযুক্তিবিদ এবং সাধারণ জনগণের খসড়াটি পর্যালোচনা বা প্রতিক্রিয়া জানানোর কোনো প্রকৃত সুযোগ ছিল না। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল নয়, বরং ২০১৮ সালে কোনো জনপরামর্শ ছাড়াই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করার পর থেকে পরপর আসা সরকারগুলোর মধ্যে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কোনো খসড়া কেবল সবার জন্য উন্মুক্ত করলেই তা ‘কার্যকর পরামর্শ’ হয়ে যায় না; যতক্ষণ না সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে মতামত দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের সুপারিশগুলো চূড়ান্ত ফলাফলে প্রতিফলিত হচ্ছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানির সংজ্ঞাকে অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ‘অপপ্রচার’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ সংক্রান্ত নতুন অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—যার প্রতিটির সংজ্ঞা এতই বিস্তৃত ও অস্পষ্ট যে তা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে। কোনো মন্তব্য মানহানিকর, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা গুজব কি না, তা সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের বিষয় নয়; বরং এর জন্য বিচারিক তথ্য-প্রমাণের সুনির্দিষ্ট পর্যালোচনার প্রয়োজন।
এই খসড়ায় প্রকাশনার স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা জনস্বার্থে সাংবাদিকতার সুরক্ষায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে কোনো সংকীর্ণ বা সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি, সুনির্দিষ্ট ক্ষতির কোনো প্রমাণ চাওয়া হয়নি এবং অপব্যবহার প্রতিরোধের মতো পর্যাপ্ত পদ্ধতিগত সুরক্ষাও রাখা হয়নি। এটি অনলাইন বাকস্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, বিচারপূর্বক আটক রাখার সুযোগ দেয় এবং ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যা মূল দাবিগুলোর সত্যতা সঠিকভাবে যাচাই করার আগেই বৈষম্যমূলক প্রয়োগ ও শাস্তির মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবারই প্রথম এই সংশোধনী প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে—যা অতীতের চর্চা থেকে একটি ব্যতিক্রম। কারণ সাইবার সংক্রান্ত আইনগুলো সাধারণত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকত। এই ভূমিকার ভিত্তি ও পরিধি এখনো অস্পষ্ট।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। ‘মানহানি’, ‘অপপ্রচার’, ‘গুজব’ এবং ‘অপতথ্য’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো তথ্য ও বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের প্রতি ক্রমবর্ধমান ঝোঁককে প্রকাশ করে। এটি ঔপনিবেশিক আমলের আইনগত ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
আরও বেশ কিছু পরিবর্তন পুরো আইনি কাঠামোকে দুর্বল করে তুলেছে, যা মূলত সুরক্ষামূলক হয়নি। কিছু অপরাধকে ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর আওতায় বিচারযোগ্য করায় তা বাকস্বাধীনতা ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার এবং সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি তৈরি করে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ধারা ৮-এর সংশোধনের ফলে তথ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য নির্বাহী সংস্থাগুলো সুস্পষ্ট পদ্ধতিগত মানদণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের নোটিশ, স্বাধীন যাচাই-বাছাই বা আপিলের কার্যকর পথ ছাড়াই বিষয়বস্তু অপসারণ করার জন্য আরও ব্যাপক ক্ষমতা পাবে।
সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশোধনীর বর্তমান খসড়াটি প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি সংশোধিত খসড়া তৈরির আগে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ এবং অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে একটি সময়বদ্ধ ও কার্যকর আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে দলগুলো।
সংস্থাগুলোর দাবি, ব্যাপক অংশীদারদের আলোচনার ভিত্তিতে এমন একটি সংশোধিত খসড়া তৈরি করা হোক, যা সাইবার স্পেসের বিস্তৃত উদ্বেগগুলোকে সমাধান করে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করে।