২০০৩ সালে এক গবেষণা অনেককে চমকে দিয়েছিল। ওই গবেষণা মতে, সারা দুনিয়ার দেড় কোটির বেশি মানুষ নাকি মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খানের বংশধর! এই মোঙ্গল সম্রাট বা অন্য রাজাধিরাজদের কথা বাদ দিন! আপনার পাতের আলু ভর্তা যে খানিক ক্রিম মেখে আর কাঁচা মরিচ কুচিগুলোকে বাদ দিয়ে ম্যাশড পটেটো হয়ে বসে আছে-সে খবর ক’জন রাখেন। জিনিস কিন্তু ওই একই আলু চটকানো।
মশলার লোভ বলি কিংবা শান্তির খোঁজ; পেটে-ভাতে থাকবে এই আশায় নানা সময়ে এই উপমহাদেশে এসেছে নানা জাতি। দখল করেছে শাসন ক্ষমতাও। আমদানি করেছে নানা ধরনের খাবার। যার সাথে মিলে মিশে আমাদের নিজেদের এবং পাতের খাবারের অবস্থাও এখন চেঙ্গিস খানের বংশধরদের মতোই। এই নদীমাতৃক অঞ্চলের নদী-খাল বিলের জল কোথা থেকে কোন খাবার নিয়ে এলো তার খবর আমরা সবসময় রেখে উঠতে পারি না। আমাদের চিতই পিঠারই তুতো ভাই বা বোনতো দক্ষিণ ভারতে প্রতি পদে পদে মেলে। যেমন মিলবে ভাঁপা পিঠার আত্মীয়। এসব খাবার কোন পথে যে এলো আর কোন পথে গিয়ে কীভাবে আমাদের মতো নদীমাতৃক অঞ্চলের মানুষের খাদ্য তালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেল-সে খবর ইতিহাসের পাতিহাঁস খোজনেওয়ালারা রাখেন।
একটা উদাহরণ হিসেবে আমাদের অতি পরিচিত হালিমের কথাই ধরা যাক। সারা বছর রোজকার পাতে খাবার হিসেবে কিছুমাত্র গুরুত্ব না পেলেও, বাংলাদেশের শহুরে সব বাড়িতেই ইফতারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ- হালিম। ভারতীয় উপমহাদেশে হালিমের আসা এবং এর সঙ্গে নানাকিছু মিশে যাওয়ার গল্পটুকু পড়লেই বোঝা যায়, দুনিয়া শুধু খালি পেটে ঘোরে না, পেট ভর্তি করেই ঘোরে।
হালিম থেকে আলিশা

রমজানের পুরো মাসজুড়ে ইফতারের খাবার হিসেবে জনপ্রিয় হালিমের এবং এর ভাই-বোনদের মাধ্যমে আম-আদমির সাথে দেখা হয় মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশের খাবারের সংস্কৃতির। ভারতবর্ষের মশলা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে নিয়ে ব্যবসা করার বিদ্যা এক সময় ইউরোপীয়দের চেয়ে আরবেরা ঢের ভালো জানতো। এর সাক্ষী ইতিহাস দেবে।
‘মশলা বাগান’ বা ‘স্পাইস গার্ডেন’ হিসেবে খ্যাত এখনকার ভারতের কেরালা রাজ্য বা বলা ভালো মালাবার উপকূলে আরবরা আসে কয়েক’শ বছর আগে। ইউরোপিয়রা তখনও পথ খুঁজছে। আরবরা শুধু ব্যবসা করেই বসে থাকেনি। তাদের ধর্মও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। প্রচার করেছে। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিশেছে। মালাবার উপকূলে বিয়ে করে ঘর বসিয়েছে। দুই জাতি-গোষ্ঠীর মিলে জন্ম হয়েছে নতুন এক গোষ্ঠী- মোপলা মুসলিম জনগোষ্ঠীর। শুধু মুসলিম নয়, সিরিয়ান খ্রিস্টানরাও এসে ঘর বেঁধে স্থায়ী হয়েছে মালাবার উপকূলে। যাদের বংশধররা এখনও টিকিয়ে রেখেছে নিজস্ব সংস্কৃতি। যাদের খাবার বিখ্যাত হয়েছে মালাবার কুইজিন নামে। এই মালাবার কুইজিনে দীর্ঘদিনের নিজস্ব সংস্কৃতি যেমন আছে তেমন মিশেছে আরব মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সংস্কৃতি।
স্থানীয় ভাষায় মোপলা শব্দের অর্থ জামাই। এটাকে সূত্র ধরে এগোলে বোঝা যায়, আরবরা একসময় মালাবার উপকূলীয় নারীদের বিয়ে করায় স্থানীয়রা তাদের আদর করে ‘জামাই’ সম্বোধন করতেন। মালয়ালমভাষী এই জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে আরব প্রভাব যেমন আছে, তেমনই তাতে যুক্ত হয়েছে কেরালার জগদ্বিখ্যাত মশলা। এই যেমন ‘আলিশা’। এতে গম বা ডালের সঙ্গে মাংস মিলিয়ে দেওয়া হয়, তারপর অনেকক্ষণ ধরে সেটি রান্না করা হয়। যোগ করা হয় গুড় অথবা চিনি। এবার গুড় বা চিনিটুকু বাদ দিয়ে ভাবুনতো আপনার পরিচিত কোন খাবারের সাথে মিল পাচ্ছেন কিনা! আপনিই ঠিক। ‘হালিম’।
হালিম এলো কোথা থেকে
হালিম নামের উৎপত্তি আরবি ‘হারিস’ থেকে। যার অর্থ হচ্ছে পিষে ফেলা। তুরস্ক, ইরান, মধ্য এশিয়া, আরব, আর্মেনিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় এই খাবারের তুতো ভাইবোনদের দেখা মেলে। যার মূল উপাদান, মাংস, ডাল, গম বা বার্লি আর মসলা। এই মসলাই অঞ্চল ভেদে হালিমের স্বাদে এনেছে ভিন্নতা।
বাংলাদেশে যেমন ডাল, চাল, গম ও অন্য উপকরণের ঘন ঝোলের মধ্যে মাংসের টুকরো পাওয়া যায়, তেমনি আবার অনেক জায়গার হালিমে আস্ত মাংসের টুকরা খুঁজেই পাওয়া যাবে না। সেখানে মাংস পিষে বাকি উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে ঘন তরল একটা খাবার তৈরি করা হয়, যেটা খুব ঘন স্যুপের কাছাকাছি কিছু একটা।
প্রথম লিখিত আকারে হালিম, বা বলা ভালো হারিসের যে রন্ধনপ্রণালীর সন্ধান পাওয়া যায়, সেটা দশম শতাব্দীর। আরব লিপিকার আবু মোহাম্মদ আল-মুজাফফর ইবনে সায়রারের ‘কিতাব আল-তাবিখ’-এ হারিসের কথা জানা যায়।
হায়দ্রাবাদি হালিম
আরবদের সাম্রাজ্যের বিস্তারের হাত ধরেই এই খাদ্য দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে, আর যেতে যেতে পথে রূপ বদলায়। খাদ্য সংস্কৃতির সুলুক সন্ধান যারা করেন, তাদের অনেকেই মনে করেন, হায়দ্রাবাদের নিজামের সৈন্যদলের আরবীয় সৈনিকদের মাধ্যমে খাবারটি ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা পায়। অনেকে আবার মনে করেন, মুঘলদের হেঁশেলেও এই পদ রান্না হত। তাদের মাধ্যমেই এটা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
২০১০ সালে ভারতীয় জিআইএস রেজিস্ট্রি অফিসে হায়দ্রাবাদি হালিমকে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক খাদ্য’ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়। ভারতে হালিমই প্রথম আমিষ খাবার, যা এ ধরনের মর্যাদা পেয়েছে।
তুরস্ক, ইরান, মধ্য এশিয়ায় প্রচলিত ‘কেসকেক’; আর্মেনিয়ার হারিসা, পাকিস্তানের খিচড়া আর বাংলাদেশ ও ভারতের হালিম একই পরিবারের সদস্য। ‘ঢাকাই খাবার ও খাদ্য সংস্কৃতি’ বইয়ে সাদ উর রহমান লিখেছেন, ঢাকায় হালিমের আগমন মোগল সমসাময়িক সময়েই। পুরান ঢাকায় রোজা ছাড়াও মহররম উপলক্ষে বাড়িতে বাড়িতে হালিম তৈরির রেওয়াজ রয়েছে।
আদিতে এই হালিম রান্না হত ঢিমে আঁচে, বড় পাত্র এবং চুলায়। সময় লাগত ৭ থেকে ১২ ঘণ্টা। তবে সময়ের সাথে সাথে রান্নার কৌশলে নানা পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় মসলা যোগ হওয়ায় স্বাদে এসেছে বৈচিত্র। হায়দ্রাবাদে এখনও অনেক সময় ধরে হালিম রান্নার চল আছে। ওখানে কিছু ব্র্যান্ডও তৈরি হয়েছে যাদের হালিম প্যাকেটবন্দী হয়ে সারা ভারতে পরিবেশন করা হয়।
মাংস পিষে অন্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে ফেলার চল কিন্তু বাংলাদেশের হালিমে খুব একটা দেখা যায় না। এখানে ঘন হালিমের মাঝে পর্যাপ্ত মাংসের টুকরো না মিললে ভোজনরসিক ধরে নেন, বিক্রেতা তাকে ঠকিয়েছে!
ঢাকার শাহী হালিম

ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় কলাবাগানের ‘মামা হালিম’। দুই একটা পত্রিকায় এই মামা অর্থাৎ দীন মোহাম্মদ সাহেব দাবি করেছিলেন হালিম তিনিই ঢাকায় উদ্ভাবন করেছেন। দাবিটি সঠিক নয়। কারণ মামার জন্মের বহু আগেই রাজধানী শহরের পুরনো অংশে হালিম পৌঁছে গেছে। মামার দাবি ছিল ঢাকার বিহারিরা যেটাকে বানাতো সেটা ‘ডাল গোশত’, হালিম নয়। তিনিই হালিম তৈরি করেন এবং সেটা শতাধিক ধরনের মশলা দিয়ে। সে যাই হোক, সময়ের সাথে সাথে কত কিছুতো বদলায়! এই যেমন মোহাম্মদপুরের ‘মনা মামা’-এর হালিম। তিনি হালিমের সঙ্গে দেন কোয়েল পাখির ডিম। এর টানেই অনেকে সেখানে খেতে যান। আবার আনোয়ার ভাইয়ের হালিমও অনেকে পছন্দ করেন, কারণ তাতে মশলা হালকা। মাংসের টুকরাও ঠিকটাক পান ক্রেতারা।
পার্সিয়ান ইহুদির মধ্যেও হালিম খুব জনপ্রিয়। শাবাতের সময় হালিম খাওয়ার রীতি তাদের মধ্যে বিরাজমান যুগ যুগ ধরে। বলকানের দেশ আর্মেনিয়ার খাদ্য সংস্কৃতিতে হারিসাকে (হালিম) জাতীয় খাবার হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে। আর্মেনিয়ান খ্রিস্টানরা ইস্টারডে’তে হারিসা খাবেনই খাবেন। বুরুন্ডির বোকো বোকো- সেও কিন্তু হালিমের এক নিকটাত্মীয়।
চেঙ্গিসের খানের মোঙ্গল সেনাদের মতোই হালিমও ছড়িয়ে গেছে গোটা দুনিয়ায়। নিজে ও নিজের ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে।