দেশে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতির সার্বিক চিত্রে কতিপয় ক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া, কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়ে যাওয়া, অজ্ঞাতনামা লাশের আধিক্য এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা জননিরাপত্তা, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের সুরক্ষাকে গভীর ঝুঁকিতে ফেলেছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’ (এমএসএফ) কর্তৃক সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মাসিক প্রতিবেদনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিক এবং নিজস্ব মানবাধিকার কর্মীদের মাধ্যমে মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে এই চিত্র তুলে এনেছে এমএসএফ।
এমএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের রাজনীতিতে সহিংসতা এবং অস্থিরতার রূপ আরও ভয়াবহ হয়েছে। আগস্ট মাসে যেখানে রাজনৈতিক সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন ৯৫ জন, সেপ্টেম্বরে তা একলাফে তিন গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮৪ জনে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যকার সংঘর্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কোন্দল এ সহিংসতার প্রধান কারণ। সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে ৩৫৫ জন বিএনপি, ২৫ জন জামায়াত এবং ৪ জন এনসিপি-র নেতাকর্মী।
এর পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের হামলায় মাসজুড়ে ৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৪ জন বিএনপি এবং ৩ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অজ্ঞাত হামলা আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম আশঙ্কাজনক সূচক হিসেবে সামনে এসেছে কারা হেফাজতে বন্দিদের মৃত্যুর ঘটনা। সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ২৪ জন হাজতি ও কয়েদির মৃত্যু হয়েছে। আগস্ট মাসে এই সংখ্যাটি ছিল ৯ জন—অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। নিহতদের সবাই পুরুষ; যার মধ্যে ১০ জন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ১৪ জন বিচারাধীন মামলার হাজতি আসামি। তাদের মধ্যে ৩ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীও রয়েছেন।
কারাগারগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাব, নিরাপত্তা হীনতা এবং মানবিক আচরণের ঘাটতি এই মৃত্যুর মিছিলের পেছনে বড় কারণ বলে মনে করছে এমএসএফ। এছাড়া সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ১ জন নারী আসামির মৃত্যু হয়েছে (বরিশালের বাকেরগঞ্জে), যেখানে স্বজনরা অভিযোগ করেছেন—পুলিশি নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু ঘটেছে।
দেশজুড়ে বিভিন্ন নির্জন বা পরিত্যক্ত স্থান থেকে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ধারাবাহিকতা সেপ্টেম্বর মাসেও বজায় ছিল এবং তা আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশ থেকে মোট ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যা আগস্টে ছিল ৫৬টি।
লাশগুলোর বড় অংশই নদী, ডোবা, মহাসড়কের পাশ, কালভার্টের নিচে বা ফসলি জমিতে পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গলা কাটা, বস্তাবন্দী, হাত-পা বাঁধা ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার হওয়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গভীর নিরাপত্তার সংকটকে স্পষ্ট করে তোলে।
সেপ্টেম্বরে মব সহিংসতায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। আগস্টের ৩৫ জন নিহতের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা কমে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে আহতের সংখ্যা আগস্টের মতোই ৭৪ জনে অপরিবর্তিত রয়েছে। মাসজুড়ে মোট ৬৫টি মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন করে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে অপরাধীদের ধরে মব করার মানসিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি সমাজে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
সেপ্টেম্বরে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমেছে । আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৩৬টি। সেপ্টেম্বরে এটি কমে দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে। তবে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে আইনি হয়রানি। আগস্টে ৪ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানির শিকার হলেও সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। বিশেষ করে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের হাতে ৩ জন এবং এনসিপির হাতে ২ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন।
একই সময়ে ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সাইবার আইনে মামলার সংখ্যা ৩টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮টিতে, আসামির সংখ্যা ৪ থেকে বেড়ে ১৪ জন এবং গ্রেপ্তার সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান, মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি ও মানহানিকর পোস্টের অভিযোগে এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে ফেসবুক পোস্টের কারণেও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সেপ্টেম্বরে বড় ধাক্কা খেয়েছে। আগস্টে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ১টি নথিভুক্ত হলেও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, নওগাঁ, পাবনা, সিলেট, শরীয়তপুর, বগুড়া, পঞ্চগড় ও কুষ্টিয়া জেলায় এসব ঘটনা ঘটে। এছাড়া খাগড়াছড়িতে ১টি জাতিগত নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে কুষ্টিয়ার মহাশ্মশানে গরু জবাই করে পিকনিক এবং সমাধি ও চিতাস্থলে জুতো পায়ে ছবি তোলার অসংবেদনশীল ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সীমান্তে বিএসএফ-এর আগ্রাসী মনোভাব অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে বিএসএফের গুলিতে ২ জন বাংলাদেশি নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আরও ২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৫ জন বিএসএফের হাতে আটক হয়েছেন। ভারতীয় সীমান্ত থেকে ১০৩ জন নাগরিককে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে ১ জন বাংলাদেশি জেলে আহত হয়েছেন।
সেপ্টেম্বর মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযানে ৬ হাজার ৫৬৫ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন , যা আগস্টে ছিল ৫ হাজার ১৯৬ জন। এছাড়া পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তারদের মধ্যে কিশোর গ্যাং সন্দেহে ১ হাজার ৭০৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী মামলায় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৯৪ জন নেতাকর্মীকে সেপ্টেম্বর মাসে গ্রেপ্তার হয়েছে।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে— সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ঢালাওভাবে ‘উন্নত’ বা ‘অবনতিশীল’ বলা সম্ভব নয়। একদিকে মব ভায়োলেন্সে মৃত্যু কমলেও অন্যদিকে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত, কারা হেফাজতে মৃত্যু, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অনেক বেড়েছে।
সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, মানবাধিকারের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা বন্ধ করা, হেফাজতে থাকা বন্দিদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধান, স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ তৈরি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যথাযথ আইনি সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার বজায় রাখাই বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।