ভারতে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যে বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র শীর্ষ নেতারা কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা ইভিএম-এর পরিবর্তে কাগজের ব্যালটে ভোট গ্রহণের জোরাল দাবি জানিয়েছেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)-এর বিতর্কিত ভূমিকার বিরুদ্ধে আগামী ৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন কার্যালয় অভিমুখে একটি যৌথ প্রতিবাদ মিছিল আয়োজন করা হবে।
আজ বুধবার বৈঠকের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করে বলেন, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করছেন। গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে আগামী ১ নভেম্বর নতুন দিল্লিতে বিরোধীদের পক্ষ থেকে একটি বিশাল ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সামগ্রিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন ব্যবস্থার জটিলতাগুলো তুলে ধরতে ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের জোর দাবি তুলেছেন এবং তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গে ভোট প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জালিয়াতি বা লুণ্ঠন চালানো হয়েছে, যার বিরুদ্ধে তারা নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন। জ্ঞানেশ কুমারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ তোলেন যে, নির্বাচন কমিশনার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম পুড়িয়ে তথ্য প্রমাণ নষ্ট করেছেন। মমতা স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে অপসারণ করা না হলে তাদের আন্দোলন রাজপথ থেকে শুরু করে সারা দেশে চরম রূপ ধারণ করবে।
একই সুরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী উল্লেখ করেন, ইন্ডিয়া জোটের অন্তর্ভুক্ত সকল রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও জ্ঞানেশ কুমার ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছেন। ভারতীয় গণতন্ত্রকে যারা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধী জোটের প্রতিবাদ কর্মসূচি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মল্লিকার্জুন খাড়গে জানান যে, দেশের সাধারণ নাগরিক, বেসরকারি সংস্থা এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষদের সম্পৃক্ত করে একটি দেশব্যাপী প্রতিবাদ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের সব জেলায় ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এর অংশ হিসেবে আগামী ৬ অক্টোবর ইন্ডিয়া জোটের সব স্তরের আইনপ্রণেতারা (সংসদ সদস্য) দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের দিকে পদযাত্রা পরিচালনা করবেন।
ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোর চূড়ান্ত ও অখণ্ড কর্তৃত্ব সাধারণ জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই বিরোধী জোটের মূল লক্ষ্য বলে খাড়গে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন। এই লক্ষ্যে ইভিএমের পরিবর্তে পুনরায় কাগজের ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের দাবি তোলার জন্য তিনি জোটের শরিকদের আহ্বান জানান।
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে খাড়গে বিরোধীদের পক্ষ থেকে ছয়টি মূল দাবি উপস্থাপন করেন এবং স্পষ্ট জানান যে, তারা স্বচ্ছতার পরিবর্তে গোপনীয়তার চর্চা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। খাড়গে বলেন, প্রজাতন্ত্রের মূল ভিত্তি অর্থাৎ ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট, এক মূল্য’—এই আদর্শকে সংকুচিত করার যেকোনো চেষ্টা রুখে দেওয়া হবে। খাড়গের উত্থাপিত দাবিসমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবি ছিল, আগামী নির্বাচনগুলোতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন (এসআইআর)-এর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা ব্যবহার করা। ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রতিটি কেন্দ্র ও বুথভিত্তিক সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধনের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা থেকে কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে উপযুক্ত কারণ ব্যাখ্যা করে পূর্ব নোটিশ দেওয়া এবং আপিল করার কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে খাড়গের উপস্থাপিত অন্যান্য দাবিগুলোও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয়ত রয়েছে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নথিপত্রের অভাব বা অসচেতনতার কারণে কোনো যোগ্য ভোটার যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তার আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।
চতুর্থ দাবি হিসেবে ইভিএমের পরিবর্তে সরাসরি ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া, নির্বাচনী কারচুপি ও এসআইআর সংক্রান্ত সব মামলার বিচার সুপ্রিম কোর্টে দ্রুত নিষ্পত্তি করার দাবি জানান তিনি। সর্বশেষ দাবি হিসেবে খাড়গে একটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিমূলক নির্বাচন কমিশন গঠনের আহ্বান জানান, যা পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সার্বিক আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
তৃণমূলের দলীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শরিকদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন যে, পুরো এসআইআর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ভুল ও ত্রুটিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। নির্বাচনী–উত্তর পরিস্থিতি ও বিজেপির একচ্ছত্র শাসনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার বাড়ি থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সাবেক সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ ও কে সি ভেনুগোপাল, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও সমাজবাদী পার্টি, সিপিআই, সিপিআইএম, এনসিপি (শরদ পাওয়ার), এবং শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে)-সহ মোট ২০টি বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। মোদি সরকারের বারবার সংবিধানের ওপর হামলা এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভোট চুরির যে চক্রান্ত চলছে, তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক বার্তায় জোটভুক্ত ১৯টি রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করে জানান, এরা সবাই ভারতের সংবিধান রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোট চুরির সরকারি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে চলমান বিতর্কের মূল কারণটি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম এবং খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটিরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র বিতর্কের মুখে রয়েছেন। বিরোধীরা তার পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার অন-রেকর্ড বা লিখিতভাবে এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, কমিশনারদের না জানিয়ে বা কোনো সুপারিশ ছাড়াই এসব আদেশ জারি করা হয়েছিল। এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও কমিশনারদের আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর, নির্বাচন কমিশন এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে নিজেদের অ্যাপ্লিকেশনের সংবিধিবদ্ধ ‘ফর্ম ৬’ থেকে এসআইআর সংক্রান্ত ডিক্লারেশনটি সরিয়ে ফেলে।