সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হয়েছে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩। আইন অনুযায়ী, এই আসনে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন করতে হবে। তবে সাধারণ সংসদীয় আসনের মতো এ নির্বাচনে দেশের সব ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন না। আসনটি যে রাজনৈতিক দলের অনুকূলে বরাদ্দ ছিল, সেই দলের সংসদ সদস্যরাই ভোটার হবেন এবং ওই দলই প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে।
মিষ্টি বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।
ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই দিনই স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরপরই আসন শূন্য ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে সংসদ সচিবালয়। তার পদত্যাগে শূন্য হওয়া আসনটির উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন ও ভোটের প্রক্রিয়ায় বিএনপির সংসদ সদস্যরাই সংশ্লিষ্ট থাকবেন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও বলেছেন, আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে এই পদ পূরণে নির্বাচন হবে এবং একক প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।
৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন
জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর ধারা ২৭-এ সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ধারায় বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো কারণে কোনো সংরক্ষিত নারী আসন শূন্য হলে, আসনটি শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই ধারার শর্ত অনুযায়ী, যে রাজনৈতিক দল বা জোটের অনুকূলে আসনটি আগে বণ্টন করা হয়েছিল, সেই দল বা জোটের মনোনীত প্রার্থী বা প্রার্থীদের মধ্য থেকেই এবং ওই দল বা জোটের ভোটারদের মাধ্যমে আসনটি পূরণ করতে হবে।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ফাইল ছবি
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে কারা ভোটার, তা আইনের ধারা ২-এর সংজ্ঞা এবং ধারা ৫-এ নির্ধারিত হয়েছে। ধারা ২(ঠ)-এ ‘ভোটার’ বলতে সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকারী সংসদ সদস্যকে বোঝানো হয়েছে। আর ধারা ৫(১) অনুযায়ী, সাধারণ আসনে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া ব্যক্তিরাই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে ভোটার হন। ধারা ৫(৩) অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন এসব সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক দল বা জোটভিত্তিক পৃথক ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে।
ফলে মিষ্টির আসনের উপনির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যদের ভোটেই প্রয়োজন হলে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
শুধু বিএনপিই প্রার্থী দিতে পারবে
সংরক্ষিত আসনটি যে দলের অনুকূলে গেছে, তার ওপর পরবর্তী উপনির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের অধিকার নির্ভর করে।
আইনের ধারা ৯(১) বলছে, নির্বাচন কমিশন ধারা ৪ অনুযায়ী যে রাজনৈতিক দল বা জোটের অনুকূলে কোনো সংরক্ষিত মহিলা আসন বণ্টন করেছে, সেই আসনের প্রার্থী কেবল ওই রাজনৈতিক দল বা জোটই মনোনয়ন দিতে পারবে। মনোনীত প্রার্থীর নাম সংশ্লিষ্ট দল বা জোটের একজন ভোটার প্রস্তাব এবং আরেকজন ভোটার সমর্থন করবেন।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর ও লুটপাট। ছবি:সংগৃহীত
তাই মিষ্টির শূন্য হওয়া আসনে অন্য কোনো দল নতুন করে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ পাবে না। বিএনপির মনোনীত প্রার্থীকেই এই আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
প্রার্থীর যোগ্যতার ক্ষেত্রেও আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। ধারা ৮ অনুযায়ী, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকা কোনো নারী সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী হতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, কোনো সংসদ সদস্য পদত্যাগ করলে সংসদ সচিবালয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করবে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানাবে। এরপর আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে পদটি পূরণের জন্য নির্বাচন হবে।
গত ১ অক্টোবর সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, এই উপনির্বাচনের জন্য পূর্ণাঙ্গ তফসিল দিতে হবে। তবে এখানে ভোটার হবেন যে দলের সংরক্ষিত আসন থেকে পদত্যাগকারী নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই দলের সংসদ সদস্যরা। একক প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন।
আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশন একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। প্রয়োজন হলে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তাও নিয়োগ করা যাবে।
মনোনয়ন ও বাছাই
তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় নির্ধারিত থাকবে। ধারা ৯ (৪) অনুযায়ী নির্ধারিত ফরমে মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
ধারা ১০ অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র যাচাই করবেন। প্রার্থী সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য না হলে, প্রস্তাবক বা সমর্থক ভোটার না হলে, আইনের কোনো বিধান অনুসরণ না হলে কিংবা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোট প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিলে মনোনয়নপত্র বাতিল করা যেতে পারে।
এরপর ধারা ১১ অনুযায়ী বৈধ প্রার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ধারা ১২ অনুযায়ী চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবেন।
একক প্রার্থী হলে ভোট নয়
মিষ্টির আসনে বিএনপি যদি একজন প্রার্থী মনোনয়ন দেয় এবং তার মনোনয়ন বৈধ থাকে, তাহলে ভোটের দরবার পড়বে না।
আইনের ধারা ১২(২)-এ বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের অনুকূলে বণ্টনকৃত আসনের সংখ্যার সমান বা তার চেয়ে কম সংখ্যক বৈধ প্রার্থী থাকলে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবেন। আর প্রার্থীর সংখ্যা সংশ্লিষ্ট দলের জন্য বণ্টিত আসনের চেয়ে বেশি হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একটি আসনের ক্ষেত্রে তাই বিএনপির একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা ভোটে নির্বাচিত হবেন।
কখন অন্য দল প্রার্থী দিতে পারবে
আইনে একটি বিশেষ পরিস্থিতির কথাও বলা আছে। ধারা ৩০ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের জন্য বরাদ্দ আসনে সব মনোনয়নপত্র না পাওয়া গেলে, ভোটগ্রহণে ওই দলের সব ভোটার একযোগে ভোট না দিলে, সব ব্যালট বাতিল হলে অথবা ধারা ১২(৪)-এর কারণে নির্বাচন প্রয়োজন হলে সেই আসন সব রাজনৈতিক দল ও জোটের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। তখন সব দলের ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন।
তবে মিষ্টির আসনটি সাধারণভাবে শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিধান ধারা ২৭। অর্থাৎ আসনটি যে দলের অনুকূলে আগে বণ্টন করা হয়েছিল, সেই দলের মনোনীত প্রার্থীর মধ্য থেকেই ৯০ দিনের মধ্যে আসনটি পূরণ করার বিধান রয়েছে।
ফলাফল গেজেটে
নির্বাচন হলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফলের বিবরণী নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত প্রার্থীর নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশ করবে।
অর্থাৎ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া আসনের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি হবে—আসন শূন্য ঘোষণা, নির্বাচন কমিশনের তফসিল, বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন, মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার। এরপর একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন; একাধিক প্রার্থী থাকলে বিএনপির সংসদ সদস্যদের ভোটে একজন নির্বাচিত হবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি আসন শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।