চরচা ডেস্ক

বিশ্বের ১৪০ কোটি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ চতুর্দশ লিও সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশে শুরু হওয়া এই যুদ্ধকে তিনি বর্ণনা করেছেন, অর্থহীন ও অমানবিক সহিংসতা হিসেবে। পোপ একের পর এক বক্তৃতায় মানুষের অর্থের লোভ, অহংকারের পরিণতি এবং মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থির করে তোলা এই সংঘাতের নিন্দা করে চলেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা কেটি রজার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোপের এই শান্তির আহ্বান শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের কাছে পৌঁছেছে এবং তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে চরম আক্রমণাত্মক।
রোববার রাতে ট্রুথ নামের সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প প্রথম আমেরিকান বংশোদ্ভূত পোপকে সরাসরি আক্রমণ করেন। তিনি লেখেন, “লিও-র কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কারণ সবাই জানে তার পোপ হওয়া ছিল এক চমকের ব্যাপার। তিনি কারও তালিকায়ই ছিলেন না। চার্চ তাকে শুধু এই কারণে মনোনীত করেছে যে তিনি একজন আমেরিকান এবং তারা ভেবেছিল এটাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের সাথে মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায়। আমি হোয়াইট হাউসে না থাকলে লিও ভ্যাটিকানে থাকতেন না।”
অপরাধপ্রবণ থেকে র্যাডিক্যাল বামপন্থী: ট্রাম্পের অভিযোগের ঝড়
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প পোপ লিও-কে ‘অপরাধের বিষয়ে দুর্বল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই অপমানসূচক বিশেষণ তিনি সাধারণত ডেমোক্র্যাট মেয়রদের জন্য ব্যবহার করেন। তিনি পোপকে ‘বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে ভয়াবহ’ বলেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে পোপ ‘র্যাডিক্যাল বামপন্থীদের তোষামোদ করছেন’।
পোস্টের শেষে ট্রাম্প একটি পরামর্শও দিয়েছেন, “একজন মহান পোপ হওয়ায় মনোযোগ দিন, রাজনীতিবিদ হওয়ায় নয়।”
এর চেয়েও কৌতূহলজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প পোপের ভাই লুই-এর প্রশংসা করেছেন কারণ লুই মাগা আন্দোলনের সমর্থক। ‘সে বোঝে!’– লিখেছেন ট্রাম্প। এর পাশাপাশি পোপের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র সমর্থনের অভিযোগ তুলে তাকে ‘অত্যন্ত উদারপন্থী’ বলেছেন ট্রাম্প। প্রতিবেদক কেটি রজার্স উল্লেখ করেছেন, রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামার পর সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে এই পোস্টের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, পোপ ভালো কাজ করছেন না এবং সম্ভবত ‘তিনি অপরাধ পছন্দ করেন’।
পোপ লিও-র পরিচয় ও তার ক্রমবর্ধমান সমালোচনা
পোপ চতুর্দশ লিওর জন্মনাম রবার্ট ফ্রান্সিস প্রিভোস্ট। তিনি শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ তিনি প্রথম আমেরিকান বংশোদ্ভূত পোপ। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোপ হিসেবে তার প্রথম বছরে তিনি খামখেয়ালি প্রেসিডেন্টের সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে চলেছেন এবং ট্রাম্পের প্রথম দিকের ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণও চুপচাপ এড়িয়ে গেছেন। তবে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকার বন্দী করার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তৃতা দেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পোপের সমালোচনা ক্রমেই কঠোর হয়েছে। বিশেষত যখন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি দিয়ে এই যুদ্ধকে ন্যায়সংগত প্রমাণের চেষ্টা শুরু করেন–যে যুদ্ধ কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া, আমেরিকার জনসমর্থন ছাড়া এবং অনেক মিত্র দেশের সমর্থন ছাড়াই শুরু হয়েছে। এই সময় পোপের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হয়েছে।
যুদ্ধের নামে যিশুর ব্যবহার: পোপের সরাসরি প্রতিবাদ
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মার্চ মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আমেরিকানদের যুদ্ধে বিজয় ও সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্য ‘যিশু খ্রিস্টের নামে’ প্রার্থনা করার আহ্বান জানান। এর অল্প পরেই পোপ লিও সরাসরি সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, যিশু যুদ্ধ পরিচালনাকারীদের প্রার্থনা শোনেন না, বরং প্রত্যাখ্যান করেন।
ইস্টার সপ্তাহে একটি হোমিলিতে পোপ বলেন, খ্রিস্টীয় মিশনকে ‘আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা বিকৃত করা হয়েছে, যা যিশু খ্রিস্টের পথের সাথে সম্পূর্ণ বিজাতীয়’। আর ইস্টার রোববারে সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে লক্ষাধিক বিশ্বাসীর সামনে তিনি শান্তির আহ্বান জানান। পোপ বলেন, “এই উৎসবের দিনে আসুন আমরা সংঘাত, আধিপত্য ও ক্ষমতার প্রতি যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করি।”
হরমুজ হুমকি ও পোপের সরাসরি নিন্দা
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দেন যে হরমুজ প্রণালী না খুললে ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই হুমকি পোপকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দিতে বাধ্য করে। সাংবাদিকদের কাছে পোপ লিও বলেন, এই হুমকি ‘সত্যিই অগ্রহণযোগ্য’। সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করার ট্রাম্পের হুমকি ‘আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। পোপ এই হুমকিকে বর্ণনা করেন ‘মানুষের ঘৃণা, বিভাজন ও ধ্বংসের সক্ষমতার নিদর্শন’ হিসেবে।
এই একই দিন রোববার সকালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তার হুমকির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, তিনি এটা নিয়ে ‘সন্তুষ্ট’। আর সেই রাতেই পোপকে আক্রমণ করে দীর্ঘ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি করেন ট্রাম্প। তার আগে মিয়ামিতে একটি মার্শাল আর্টস লড়াই উপভোগ করেন এবং তার গলফ ক্লাবে সমর্থকদের সাথে সময় কাটান তিনি। এর মধ্যে ইরানের সাথে আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে।
ভ্যাটিকানের সাথে প্রশাসনের গোপন বৈঠক ও বিতর্ক
এই উত্তেজনার মাঝে একটি আলাদা বিতর্কও উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা কার্ডিনাল ক্রিস্টোফ পিয়েরের সাথে দেখা করে পোপের নীতিমালার সমালোচনা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। কার্ডিনাল পিয়েরে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাটিকানের সাবেক পোপের দূত। উভয় পক্ষই এই বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স–যিনি নিজে ক্যাথলিক এবং বিশ্বাস বিষয়ক একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। তাকে যখন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি প্রথমে কার্ডিনাল পিয়েরে কে তা-ই বলতে পারেননি।
ক্যাথলিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া: ‘নৈতিক অধঃপতনের তলানি’
ট্রাম্পের এই আক্রমণের পর বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ক্যাথলিক নেতা পোপের পক্ষে সরব হয়েছেন। মার্কিন ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলনের সভাপতি আর্চবিশপ পল এস. কোকলি বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট পবিত্র পিতা সম্পর্কে এই ধরনের কটূক্তি লিখতে বেছে নিয়েছেন–এটা আমাকে হতাশ করেছে। পোপ লিও তার প্রতিদ্বন্দ্বী নন; পোপ কোনো রাজনীতিবিদ নন। তিনি খ্রিস্টের প্রতিনিধি যিনি সুসমাচারের সত্য থেকে এবং মানুষের আত্মার যত্নের জন্য কথা বলেন।”
আমেরিকান জেসুইট প্রিস্ট ও লেখক জেমস জোসেফ মার্টিন জুনিয়র সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “আমার সন্দেহ নেই যে পোপ লিও চতুর্দশ এ নিয়ে একটুও ঘুম হারাবেন না, বিশেষ করে যখন তিনি আগামীকাল আফ্রিকায় তার তীর্থযাত্রা শুরু করবেন। কিন্তু আমাদের বাকিদের উচিত চিন্তিত হওয়া। কারণ এটি উন্মত্ত, অদয়া এবং অখ্রিস্টান সুলভ কথা। এই নৈতিক অধঃপতনের কি কোনো তলানি নেই?”
রোববারের এই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের প্রেক্ষাপটটিও উল্লেখযোগ্য। সেই রাতেই ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আমেরিকান কার্ডিনাল ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের দেশ ও বিদেশের নীতির বিরুদ্ধে পোপকে সমর্থন জানিয়ে কথা বলেন। ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে কার্ডিনাল রবার্ট ম্যাকএলরয় বলেন, “এটি একটি জঘন্য শাসন এবং এটি সরানো উচিত”। তবে তিনি যোগ করেন, “কিন্তু এটি একটি পছন্দের যুদ্ধ যেখানে আমরা গিয়েছি, এবং আমি মনে করি এটি আমেরিকার জন্য একটি বৃহত্তর উদ্বেগজনক মুহূর্তের অংশ—যেখানে আমরা একের পর এক যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।”
দুই আমেরিকান, দুই ভিন্ন পথ
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদক কেটি রজার্স এই পুরো ঘটনাক্রমে একটি গভীর বৈপরীত্য চিহ্নিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্পের রাগী পাল্টা আঘাত এবং শান্তশিষ্ট পোপ লিও-র মধ্যকার পার্থক্য দেখিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের দুজন সবচেয়ে ক্ষমতাধর আমেরিকান কীভাবে ভিন্নভাবে সংঘাত সামলান। একজন শান্তির জন্য অনুনয় করেন, অন্যজন প্রতিশোধ নিতে চেয়ে উত্তাপ বাড়িয়ে দেন।
পোপের অপর ভাই জন প্রিভোস্ট গত মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমস-কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার ভাই ট্রাম্পের নীতির সাথে দ্বিমত হলে চুপ করে থাকবেন না। “আমি জানি অভিবাসন নিয়ে যা ঘটছে সে বিষয়ে তিনি খুশি নন। এটা আমি নিশ্চিতভাবে জানি। তিনি কতদূর যাবেন সেটা অনুমানের বিষয়, কিন্তু তিনি শুধু বসে থাকবেন না। আমার মনে হয় না তিনি নীরব থাকবেন।” পরবর্তী ঘটনাক্রম প্রমাণ করেছে, জন প্রিভোস্টের কথাই ঠিক।
ক্ষমতা ও বিবেকের লড়াই
নিউইয়র্ক টাইমস-এর এই প্রতিবেদন একটি অসাধারণ রাজনৈতিক মুহূর্তকে ধারণ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান– দুজনেই আমেরিকান বংশোদ্ভূত এখন প্রকাশ্যে মুখোমুখি। একটি যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেখানে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, যেখানে ধর্মকে যুদ্ধের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেখানে পোপের প্রতিটি বক্তব্য হয়ে উঠছে একটি নৈতিক প্রতিরোধের ঘোষণা।
ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া আক্রমণ প্রমাণ করে যে তার সমালোচনার কোনো সীমা নেই। এমনকি বিশ্বের দেড় শ কোটি ক্যাথলিকের ধর্মীয় নেতাও তার নিশানা থেকে রক্ষা পান না। কিন্তু এই আক্রমণের বিপরীতে ক্যাথলিক চার্চের ভেতর থেকে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে–আর্চবিশপ থেকে জেসুইট পুরোহিত পর্যন্ত, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নৈতিকতার প্রশ্নে পোপের পক্ষে একটি শক্তিশালী জনমত রয়েছে। এই বিতর্ক শুধু দুজন ব্যক্তির সংঘাত নয়–এটি ক্ষমতা ও বিবেকের, যুদ্ধ ও শান্তির, আধিপত্য ও মানবিকতার একটি বৃহত্তর লড়াইয়েরই প্রতিফলন।

বিশ্বের ১৪০ কোটি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ চতুর্দশ লিও সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় কথা বলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশে শুরু হওয়া এই যুদ্ধকে তিনি বর্ণনা করেছেন, অর্থহীন ও অমানবিক সহিংসতা হিসেবে। পোপ একের পর এক বক্তৃতায় মানুষের অর্থের লোভ, অহংকারের পরিণতি এবং মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থির করে তোলা এই সংঘাতের নিন্দা করে চলেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা কেটি রজার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোপের এই শান্তির আহ্বান শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের কাছে পৌঁছেছে এবং তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে চরম আক্রমণাত্মক।
রোববার রাতে ট্রুথ নামের সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প প্রথম আমেরিকান বংশোদ্ভূত পোপকে সরাসরি আক্রমণ করেন। তিনি লেখেন, “লিও-র কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কারণ সবাই জানে তার পোপ হওয়া ছিল এক চমকের ব্যাপার। তিনি কারও তালিকায়ই ছিলেন না। চার্চ তাকে শুধু এই কারণে মনোনীত করেছে যে তিনি একজন আমেরিকান এবং তারা ভেবেছিল এটাই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের সাথে মোকাবিলার সর্বোত্তম উপায়। আমি হোয়াইট হাউসে না থাকলে লিও ভ্যাটিকানে থাকতেন না।”
অপরাধপ্রবণ থেকে র্যাডিক্যাল বামপন্থী: ট্রাম্পের অভিযোগের ঝড়
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প পোপ লিও-কে ‘অপরাধের বিষয়ে দুর্বল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই অপমানসূচক বিশেষণ তিনি সাধারণত ডেমোক্র্যাট মেয়রদের জন্য ব্যবহার করেন। তিনি পোপকে ‘বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে ভয়াবহ’ বলেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে পোপ ‘র্যাডিক্যাল বামপন্থীদের তোষামোদ করছেন’।
পোস্টের শেষে ট্রাম্প একটি পরামর্শও দিয়েছেন, “একজন মহান পোপ হওয়ায় মনোযোগ দিন, রাজনীতিবিদ হওয়ায় নয়।”
এর চেয়েও কৌতূহলজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প পোপের ভাই লুই-এর প্রশংসা করেছেন কারণ লুই মাগা আন্দোলনের সমর্থক। ‘সে বোঝে!’– লিখেছেন ট্রাম্প। এর পাশাপাশি পোপের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র সমর্থনের অভিযোগ তুলে তাকে ‘অত্যন্ত উদারপন্থী’ বলেছেন ট্রাম্প। প্রতিবেদক কেটি রজার্স উল্লেখ করেছেন, রোববার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামার পর সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে এই পোস্টের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, পোপ ভালো কাজ করছেন না এবং সম্ভবত ‘তিনি অপরাধ পছন্দ করেন’।
পোপ লিও-র পরিচয় ও তার ক্রমবর্ধমান সমালোচনা
পোপ চতুর্দশ লিওর জন্মনাম রবার্ট ফ্রান্সিস প্রিভোস্ট। তিনি শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ তিনি প্রথম আমেরিকান বংশোদ্ভূত পোপ। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোপ হিসেবে তার প্রথম বছরে তিনি খামখেয়ালি প্রেসিডেন্টের সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে চলেছেন এবং ট্রাম্পের প্রথম দিকের ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণও চুপচাপ এড়িয়ে গেছেন। তবে জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকার বন্দী করার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তৃতা দেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পোপের সমালোচনা ক্রমেই কঠোর হয়েছে। বিশেষত যখন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি দিয়ে এই যুদ্ধকে ন্যায়সংগত প্রমাণের চেষ্টা শুরু করেন–যে যুদ্ধ কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া, আমেরিকার জনসমর্থন ছাড়া এবং অনেক মিত্র দেশের সমর্থন ছাড়াই শুরু হয়েছে। এই সময় পোপের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হয়েছে।
যুদ্ধের নামে যিশুর ব্যবহার: পোপের সরাসরি প্রতিবাদ
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মার্চ মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আমেরিকানদের যুদ্ধে বিজয় ও সৈন্যদের নিরাপত্তার জন্য ‘যিশু খ্রিস্টের নামে’ প্রার্থনা করার আহ্বান জানান। এর অল্প পরেই পোপ লিও সরাসরি সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, যিশু যুদ্ধ পরিচালনাকারীদের প্রার্থনা শোনেন না, বরং প্রত্যাখ্যান করেন।
ইস্টার সপ্তাহে একটি হোমিলিতে পোপ বলেন, খ্রিস্টীয় মিশনকে ‘আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা বিকৃত করা হয়েছে, যা যিশু খ্রিস্টের পথের সাথে সম্পূর্ণ বিজাতীয়’। আর ইস্টার রোববারে সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে লক্ষাধিক বিশ্বাসীর সামনে তিনি শান্তির আহ্বান জানান। পোপ বলেন, “এই উৎসবের দিনে আসুন আমরা সংঘাত, আধিপত্য ও ক্ষমতার প্রতি যাবতীয় আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করি।”
হরমুজ হুমকি ও পোপের সরাসরি নিন্দা
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দেন যে হরমুজ প্রণালী না খুললে ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই হুমকি পোপকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দিতে বাধ্য করে। সাংবাদিকদের কাছে পোপ লিও বলেন, এই হুমকি ‘সত্যিই অগ্রহণযোগ্য’। সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করার ট্রাম্পের হুমকি ‘আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। পোপ এই হুমকিকে বর্ণনা করেন ‘মানুষের ঘৃণা, বিভাজন ও ধ্বংসের সক্ষমতার নিদর্শন’ হিসেবে।
এই একই দিন রোববার সকালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তার হুমকির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, তিনি এটা নিয়ে ‘সন্তুষ্ট’। আর সেই রাতেই পোপকে আক্রমণ করে দীর্ঘ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি করেন ট্রাম্প। তার আগে মিয়ামিতে একটি মার্শাল আর্টস লড়াই উপভোগ করেন এবং তার গলফ ক্লাবে সমর্থকদের সাথে সময় কাটান তিনি। এর মধ্যে ইরানের সাথে আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে।
ভ্যাটিকানের সাথে প্রশাসনের গোপন বৈঠক ও বিতর্ক
এই উত্তেজনার মাঝে একটি আলাদা বিতর্কও উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা কার্ডিনাল ক্রিস্টোফ পিয়েরের সাথে দেখা করে পোপের নীতিমালার সমালোচনা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। কার্ডিনাল পিয়েরে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাটিকানের সাবেক পোপের দূত। উভয় পক্ষই এই বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স–যিনি নিজে ক্যাথলিক এবং বিশ্বাস বিষয়ক একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। তাকে যখন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি প্রথমে কার্ডিনাল পিয়েরে কে তা-ই বলতে পারেননি।
ক্যাথলিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া: ‘নৈতিক অধঃপতনের তলানি’
ট্রাম্পের এই আক্রমণের পর বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ক্যাথলিক নেতা পোপের পক্ষে সরব হয়েছেন। মার্কিন ক্যাথলিক বিশপ সম্মেলনের সভাপতি আর্চবিশপ পল এস. কোকলি বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট পবিত্র পিতা সম্পর্কে এই ধরনের কটূক্তি লিখতে বেছে নিয়েছেন–এটা আমাকে হতাশ করেছে। পোপ লিও তার প্রতিদ্বন্দ্বী নন; পোপ কোনো রাজনীতিবিদ নন। তিনি খ্রিস্টের প্রতিনিধি যিনি সুসমাচারের সত্য থেকে এবং মানুষের আত্মার যত্নের জন্য কথা বলেন।”
আমেরিকান জেসুইট প্রিস্ট ও লেখক জেমস জোসেফ মার্টিন জুনিয়র সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “আমার সন্দেহ নেই যে পোপ লিও চতুর্দশ এ নিয়ে একটুও ঘুম হারাবেন না, বিশেষ করে যখন তিনি আগামীকাল আফ্রিকায় তার তীর্থযাত্রা শুরু করবেন। কিন্তু আমাদের বাকিদের উচিত চিন্তিত হওয়া। কারণ এটি উন্মত্ত, অদয়া এবং অখ্রিস্টান সুলভ কথা। এই নৈতিক অধঃপতনের কি কোনো তলানি নেই?”
রোববারের এই সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের প্রেক্ষাপটটিও উল্লেখযোগ্য। সেই রাতেই ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আমেরিকান কার্ডিনাল ইরান যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের দেশ ও বিদেশের নীতির বিরুদ্ধে পোপকে সমর্থন জানিয়ে কথা বলেন। ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে কার্ডিনাল রবার্ট ম্যাকএলরয় বলেন, “এটি একটি জঘন্য শাসন এবং এটি সরানো উচিত”। তবে তিনি যোগ করেন, “কিন্তু এটি একটি পছন্দের যুদ্ধ যেখানে আমরা গিয়েছি, এবং আমি মনে করি এটি আমেরিকার জন্য একটি বৃহত্তর উদ্বেগজনক মুহূর্তের অংশ—যেখানে আমরা একের পর এক যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।”
দুই আমেরিকান, দুই ভিন্ন পথ
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদক কেটি রজার্স এই পুরো ঘটনাক্রমে একটি গভীর বৈপরীত্য চিহ্নিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ট্রাম্পের রাগী পাল্টা আঘাত এবং শান্তশিষ্ট পোপ লিও-র মধ্যকার পার্থক্য দেখিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের দুজন সবচেয়ে ক্ষমতাধর আমেরিকান কীভাবে ভিন্নভাবে সংঘাত সামলান। একজন শান্তির জন্য অনুনয় করেন, অন্যজন প্রতিশোধ নিতে চেয়ে উত্তাপ বাড়িয়ে দেন।
পোপের অপর ভাই জন প্রিভোস্ট গত মে মাসে নিউইয়র্ক টাইমস-কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার ভাই ট্রাম্পের নীতির সাথে দ্বিমত হলে চুপ করে থাকবেন না। “আমি জানি অভিবাসন নিয়ে যা ঘটছে সে বিষয়ে তিনি খুশি নন। এটা আমি নিশ্চিতভাবে জানি। তিনি কতদূর যাবেন সেটা অনুমানের বিষয়, কিন্তু তিনি শুধু বসে থাকবেন না। আমার মনে হয় না তিনি নীরব থাকবেন।” পরবর্তী ঘটনাক্রম প্রমাণ করেছে, জন প্রিভোস্টের কথাই ঠিক।
ক্ষমতা ও বিবেকের লড়াই
নিউইয়র্ক টাইমস-এর এই প্রতিবেদন একটি অসাধারণ রাজনৈতিক মুহূর্তকে ধারণ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান– দুজনেই আমেরিকান বংশোদ্ভূত এখন প্রকাশ্যে মুখোমুখি। একটি যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেখানে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, যেখানে ধর্মকে যুদ্ধের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা হচ্ছে, সেখানে পোপের প্রতিটি বক্তব্য হয়ে উঠছে একটি নৈতিক প্রতিরোধের ঘোষণা।
ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া আক্রমণ প্রমাণ করে যে তার সমালোচনার কোনো সীমা নেই। এমনকি বিশ্বের দেড় শ কোটি ক্যাথলিকের ধর্মীয় নেতাও তার নিশানা থেকে রক্ষা পান না। কিন্তু এই আক্রমণের বিপরীতে ক্যাথলিক চার্চের ভেতর থেকে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে–আর্চবিশপ থেকে জেসুইট পুরোহিত পর্যন্ত, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নৈতিকতার প্রশ্নে পোপের পক্ষে একটি শক্তিশালী জনমত রয়েছে। এই বিতর্ক শুধু দুজন ব্যক্তির সংঘাত নয়–এটি ক্ষমতা ও বিবেকের, যুদ্ধ ও শান্তির, আধিপত্য ও মানবিকতার একটি বৃহত্তর লড়াইয়েরই প্রতিফলন।

ওয়াকারের কথা রেখে চলেছেন নাহিদ। চলমান পিএসএলে খেলছেন পেশোয়ার জালমির হয়ে। এখন পর্যন্ত খেলেছেন তিন ম্যাচ, উইকেট নিয়েছেন ৫টি। এই পরিসংখ্যান দেখে বলতেই পারেন, এ আর এমন কী! তবে না, এই তিন ম্যাচে নাহিদের গতির আগুনে রীতিমতো কাঁপছে পিএসএল। সেরা বোলিংটা করেন করাচি কিংসের বিপক্ষে। চার ওভারে এক মেডেনসহ মাত্র ৭

আমেরিকা-ইরানের শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে গতকাল শনিবার বিশ্বের শত শত সাংবাদিকের গন্তব্য ছিল ইসলামাবাদ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারকে রূপান্তর করা হয়েছিল এক বিশাল মিডিয়া হাবে। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের আড়ালে সাংবাদিকদের সময় কেটেছে দীর্ঘ প্রতীক্ষায়।