বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা আগামী ১০ বছরে প্রায় ১২ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু এই বাড়তি জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করা, তরুণদের দক্ষতার সঙ্গে কাজের চাহিদার সমন্বয় এবং পরিবারভিত্তিক ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য যে ‘আঞ্চলিক অর্থনৈতিক আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, শ্রমবাজার, সামাজিক সুরক্ষা এবং সেবা বাণিজ্যের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, চাপে অর্থনীতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে এপ্রিলে আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৩.৬ শতাংশ। কিন্তু এখন এশিয়া ও প্যাসিফিক আঞ্চলিক পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১.১ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে। ২০২৭ সালের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসেও একই চিত্র–এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছিল ৩.২ শতাংশ, এখন আঞ্চলিক প্রতিবেদনে কমানো হয়েছে ১.১ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পেছনে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের সুবিধা না পাওয়া এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারের উচ্চ মূল্যের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির প্রভাবের কথা বলা হয়েছে।
আইএমএফ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ জ্বালানি ও ইউটিলিটির মূল্য স্থগিত রেখেছে (প্রাইস ফ্রিজ) এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভর্তুকি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাহিদা সামলাতে বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম), সরকারি খাতের কর্মঘণ্টা কমানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভ্রমণে বিধিনিষেধের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বাড়ছে কর্মক্ষম জনসংখ্যা, চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থানে
২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বাড়বে। তবে উচ্চ যুব বেকারত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতা প্রয়োজন–এমন কাজে নিয়োজিত থাকার প্রবণতা শ্রমবাজারের বড় সমস্যা।
কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের আধিক্যের কারণে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রত্যক্ষ প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অধিক উৎপাদনশীল নতুন কাজ তৈরিতে এআই চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাবে সামগ্রিক শ্রম চাহিদা আনুমানিক ২.১ শতাংশ কমার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে আইএমএফের বিশ্লেষণে।
অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত হবে না। প্রয়োজন দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ তৈরি এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো।
পারিবারিক ভোগ ও সামাজিক সুরক্ষার সম্ভাবনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয়ের তুলনায় ব্যক্তিগত ভোগ কম বেড়েছে। ফলে প্রায় ২০ শতাংশ ভোগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ৮০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় অনেক পরিবারের আয় অনিশ্চিত। ফলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি সামলাতে পরিবারগুলো ব্যয়ের পরিবর্তে সঞ্চয়ের দিকে ঝুঁকতে পারে।
আইএমএফের মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পেনশন কাভারেজ বাড়ালে ব্যক্তিগত ভোগ গড়ে ২.৪ শতাংশ বাড়তে পারে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের ১৫ শতাংশ পরিবারের জন্য শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা এবং নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ব্যবধান অর্ধেক কমানো গেলে পারিবারিক ভোগ ১৪.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এগুলো নীতি বাস্তবায়নের পর পাওয়া ফল নয়, বরং মডেলভিত্তিক সম্ভাব্য হিসাব।
সেবা রপ্তানিতেও বৈচিত্র্যের ঘাটতি
বাংলাদেশের সেবা রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি এখনো পরিবহন ও ভ্রমণের মতো ঐতিহ্যবাহী সেবার ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার অংশ ১০ শতাংশেরও কম। এই চিত্র সেবা রপ্তানিতে বৈচিত্র্য বাড়ানোর সম্ভাব্য গুরুত্ব তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফের প্রতিবেদন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ, পারিবারিক ভোগের ঘাটতি এবং সেবা রপ্তানির সীমিত বৈচিত্র্যকে সামনে এনেছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো তাই অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।