রাফাল চুক্তি: ইউরোপের সংকল্প, ইউক্রেনের আশা, ভারতের হিসাব

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
রাফাল চুক্তি: ইউরোপের সংকল্প, ইউক্রেনের আশা, ভারতের হিসাব
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

ফ্রান্স ও ইউক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তি কেবল একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। এটি ইউরোপ, ইউক্রেন ও ভারতের মধ্যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জটিলতার এক প্রতীক। ১৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্যারিস সফরের সময় এই চুক্তি ঘোষণা করা হয়। ফ্রান্স জানায়, তারা প্রায় এক দশকের মধ্যে ইউক্রেনকে সর্বোচ্চ ১০০টি রাফাল এফ-৪ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে। পাশাপাশি উন্নত রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং উৎপাদন-সংক্রান্ত অংশীদারত্বও দেওয়া হবে। এই বড় আকারের চুক্তিটি কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অঙ্গীকার। এই ১০০ রাফাল যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা হবে ২০৩৫ সালের মধ্যে। এছাড়া এসব সমরাস্ত্র কেনায় অর্থায়নের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

চুক্তিটি ইউক্রেনকে সহায়তায় ইউরোপের কৌশলগত নেতৃত্বকে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে যখন আমেরিকা সরাসরি ইউক্রেনের সাথে সম্পৃক্ততা কমতে পারে। এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিকভাবে রাফাল কর্মসূচির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও নির্দেশ করে। যেখানে ভারত একটি প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে এবং ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তার এরোস্পেস সক্ষমতা আরও গভীর করছে। এদিকে রাশিয়া চুক্তিটিকে তুচ্ছ বলে মন্তব্য করেছে। তবে উন্নত মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্র-সজ্জিত এসব যুদ্ধবিমান ভবিষ্যতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

১. ফ্রান্স-ইউক্রেন রাফাল চুক্তি: সারসংক্ষেপ ও প্রেক্ষাপট

  • ঘোষণা: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনকে ১০০টি রাফাল এফ-৪ যুদ্ধবিমান সরবরাহের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
  • সরবরাহের সময়সীমা: প্রায় ১০ বছরে, ২০৩৫ সালের দিকে শেষ হবে।
  • অতিরিক্ত সহায়তা: উন্নত রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, এবং সম্ভাব্য যৌথ উৎপাদন চুক্তি অন্তর্ভুক্ত।
  • অর্থায়ন: এখনো চূড়ান্ত নয়; অর্থায়ন কীভাবে হবে তা অনিশ্চিত।
  • রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ইউরোপ ও ফ্রান্স ইউক্রেনকে সহযোগিতায় নেতৃত্ব দিতে চাইছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জব্দ সম্পদ (২২৫ বিলিয়ন ডলার) এবং তার বার্ষিক সুদ (৩ বিলিয়ন ডলার) ব্যবহার করার কথাও ভাবছে।

২. রাফাল ও মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের সামরিক গুরুত্ব

  • ইউক্রেনের বর্তমান সীমাবদ্ধতা: রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (মাসে প্রায় ৬ হাজার ‘গ্লাইড বোমা’) মোকাবেলায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অপর্যাপ্ত।
  • রাফায়েল এফ-৪ সক্ষমতা: উন্নত অ্যাভিয়নিক্স এবং মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় এটিকে বিশেষভাবে কার্যকর করে।
  • মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের সুবিধা:
    • সর্বোচ্চ ১৮০ কিমি পাল্লা–রাশিয়ার ৫০-৭০ কিমি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রকে ছাপিয়ে যায়।
    • রামজেট ইঞ্জিনের কারণে শেষ পর্যায়েও উচ্চগতিতে থাকে–এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
    • রুশ বিমানের হামলা এড়াতে বা ঠেকাতে কার্যকর।
  • কৌশলগত প্রভাব: রাফাল এফ৪+ মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত ইউক্রেনীয় বিমান রুশ বিমানকে দূরে থাকতে বাধ্য করতে পারে, ফলে বোমাবর্ষণ কমতে পারে।

রাফাল যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স
রাফাল যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স

৩. উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সীমাবদ্ধতা

  • বৈশ্বিক চাহিদা: বর্তমানে ফ্রান্সের কাছে ৫৩৩টি রাফালের অর্ডার রয়েছে- ভারত, মিশর, ইউএই, গ্রিস, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, সার্বিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশের।
  • বর্তমান উৎপাদন হার: মাসে ২-৩টি; বাড়িয়ে মাসে ৪টি করার পরিকল্পনা।
  • ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: মাসে ৪টি হলেও চাহিদা পূরণ হবে না।
  • ভারতের ভূমিকা:
    • ভারত ইতিমধ্যে রাফাল এফ৩আর পরিচালনা করছে এবং এফ৪ সংস্করণ চায়।
    • ১১৪টি রাফাল ভারতে তৈরি করার পরিকল্পনা। হায়দরাবাদে টাটার সঙ্গে ফিউজলাজ তৈরি শুরু হয়েছে।
    • প্রথম দেশ হিসেবে ভারত সম্পূর্ণ প্রযুক্তি স্থানান্তরসহ নিজস্ব জেট ইঞ্জিন তৈরি করছে, যা আমেরিকা বা রাশিয়া কখনো ভারতকে দেয়নি।
    • ভারত রাফাল উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

৪. ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা

  • ইউরোপের ‘কোয়ালিশন অফ দ্য উইলিং’: আমেরিকার মনোযোগ কমলেও ফ্রান্স ও ব্রিটেন ইউক্রেন সমর্থনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
  • ইউরোপীয় আর্থিক দ্বিধা: জমাটবদ্ধ রুশ সম্পদ ব্যবহারেআইনগত সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক রয়েছে।
  • রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া:
    • চুক্তিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে উপহাস করছে এবং পশ্চিমাদের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ করছে।
    • তবে রাশিয়া জানে, মিটিওর-সজ্জিত রাফাল ইউক্রেনের হাতে গেলে তা গুরুতর হুমকি হবে।
  • ইউক্রেনের তাৎক্ষণিক সংকট:
    • ফ্রন্টলাইনে চাপ,
    • বাজেট ঘাটতি (প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার),
    • দুর্নীতির কেলেঙ্কারি
    • শীতে জ্বালানি সংকট- ফলে রাফাল চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি, তাৎক্ষণিক সমাধান নয়।

রাফাল যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স
রাফাল যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স

৫. ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ

  • ভারত–ফ্রান্স অংশীদারত্ব:
    • শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৃহৎ এরোস্পেস উৎপাদন ভারতের জন্য বড় সুবিধা।
  • রাশিয়ার চাপ:
    রাশিয়া চাইবে না ভারত ইউক্রেনকে রাফায়েল সরবরাহে পরোক্ষভাবে সাহায্য করুক। তাই তারা ভারতকে দিতে পারে-
    • সস্তায় এসইউ-৩০ আপগ্রেড,
    • এসইউ-৫৭ বা এসইউ-২৭৫ এর প্রযুক্তি,
    • বেশি বেশি তেল বাণিজ্য,
    • ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি-যাতে ভারত নিরপেক্ষ থাকে।
  • ভারতের অবস্থান:
    • পশ্চিমা দেশ ও রাশিয়া-দু’দিকের সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
    • ইউক্রেন যুদ্ধকে নিজেদের প্রতিরক্ষা-কূটনীতিতে প্রভাব ফেলতে দিতে চায় না।

মূল বিষয়

  • ফ্রান্স–ইউক্রেন রাফাল চুক্তি ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় নিদর্শন।
  • মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
  • তাৎক্ষণিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রভাব কম, কারণ সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদি।
  • ভারত রাফায়েল উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
  • রাশিয়া চুক্তিকে হুমকি হিসেবে দেখছে এবং ভারতের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
  • বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সরবরাহ শৃঙ্খল, কৌশলগত জোট ও আধুনিক যুদ্ধনীতি-সবই এই চুক্তির মাধ্যমে নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে।

ফ্রান্স ও ইউক্রেনের রাফাল চুক্তি কেবল অস্ত্র বিক্রির ঘটনা নয়; এটি ইউরোপ, এশিয়া ও বৈশ্বিক কৌশলগত পরিমণ্ডলে শক্তির পুনর্গঠনের প্রতীক। তাৎক্ষণিক সামরিক সুবিধা সীমিত হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি ইউরোপীয় নেতৃত্ব, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভারতের প্রতিরক্ষা উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতা, অর্থায়ন, ও কূটনৈতিক পাল্টা-প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়ে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ রূপ নির্ধারিত হবে–বিশেষ করে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্পর্কিত