গত বছর নেপালে জেন-জি প্রজন্মের হাত ধরে একটি রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল, যা দেশটির পুরো ক্ষমতা কাঠামোকে বদলে দেয়। ভোটের পর একটি নতুন সরকার গঠিত হয়। তাদের কাছে প্রত্যাশা ছিল অতীতের কলঙ্কমুক্ত এক সংস্কারবাদী নেপাল। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক মাস পার হতে না হতেই জনমনে সংশয় জাগছে—নতুন নেতৃত্ব কি আসলেই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া বলেন শাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার সরকার অস্থিরতার মুখে পড়েছে। মাত্র ২৬ দিনের মাথায় দুজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, যা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এই পদত্যাগগুলো বলেন শাহের সংস্কারবাদী ভাবমূর্তি এবং তার দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’র (আরএসপি) দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দুর্নীতি দমন এবং স্বচ্ছ শাসনের অঙ্গীকার করেই দলটি ক্ষমতায় এসেছিল।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং দ্বিতীয় মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেছেন। তার বিনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
এক জনসমক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে গুরুং জানান, জবাবদিহিতার স্বার্থে তিনি পদত্যাগ করছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পদের চেয়ে নৈতিকতা বড় এবং জনজীবন অবশ্যই কলঙ্কমুক্ত হওয়া উচিত।
নেপালের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরং। ছবি: রয়টার্সএর আগে, শ্রমমন্ত্রী দীপক কুমার শাহকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি নিজ ক্ষমতা অপব্যবহার করে তার স্ত্রীকে স্বাস্থ্য বীমা বোর্ডের সদস্য পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। শপথ নেওয়ার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় নিজ দলের চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন।
বর্তমানে বলেন শাহ নিজেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষোভও এখন চরমে, বিশেষ করে ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকায়।
নতুন এক নিয়ম অনুযায়ী, ভারত থেকে ১০০ নেপালি রুপির বেশি মূল্যের পণ্য আনলেই শুল্ক দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ কঠোরভাবে এই নিয়ম কার্যকর করা শুরু করেছে এবং যারা শুল্ক দিতে অস্বীকার করছে তাদের পণ্য জব্দ করা হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের জন্য এটি একটি বড় আঘাত, কারণ তারা দৈনন্দিন নিত্যপণ্যের জন্য ভারতের সস্তা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই নীতির ফলে নেপালে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এবং আইন প্রয়োগের বিভিন্ন ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে এই নির্দেশের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি নেই, যা এর প্রয়োগ নিয়ে আরও ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
নেপালের জেন-জি আন্দোলন। ছবি: রয়টার্সঅর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের প্রভাবে নেপালে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১৫০ নেপালি রুপি থেকে বেড়ে প্রায় ২২৫ রুপি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে।
ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং কড়াকড়ির ফলে জনমনে অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বর্তমানে ১৮০টি দেশের মধ্যে নেপালের অবস্থান ১০৯তম।
তবে মেয়াদের শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়া, মন্ত্রীদের বিদায় এবং অজনপ্রিয় কিছু নীতি বলেন শাহ প্রশাসনকে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।