বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন আর শুধু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই। ধীরে ধীরে তা চলে যাচ্ছে গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের হাতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতার চাপে এসব প্রতিষ্ঠান এশিয়ার সমুদ্রপথে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নতুন সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে চীনকে এড়িয়ে নতুন রুট তৈরি, দক্ষিণ চীন সাগরের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা এক নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেন, “সমুদ্রের তলদেশ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।”
তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্টিক সাগর ও তাইওয়ানের আশপাশে পানির নিচের বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট কেবল কেটে যাওয়ার ঘটনা বৈশ্বিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এরপর মার্লেসসহ আরও ১৬টি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা মিলে বিশ্বের সমুদ্রতলে থাকা প্রায় ৭০০টি যোগাযোগ কেবল সুরক্ষিত রাখার এক যৌথ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই কেবলগুলোর বেশিরভাগই সমুদ্রের তলদেশে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে এবং বিশ্বের ইন্টারনেট ও তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বলছে, এশিয়ার সরকার ও সামরিক বাহিনী সম্প্রতি পানির নিচের এসব কেবলের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। যদিও কেবল কেটে যাওয়ার সব ঘটনা যে পরিকল্পিত নাশকতা ছিল, তার পক্ষে এখনও নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই কেবলগুলো যে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সে বিষয়ে তাদের উদ্বেগ যথার্থ।
ছবি: স্ক্রিনশটএ কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, সেই অপেক্ষায় না থেকে বিশ্বের বেশিরভাগ সাবমেরিন কেবল নির্মাণ ও পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা ধীরে ধীরে এশিয়ার সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো এড়িয়ে সম্পূর্ণ নতুন রুট বেছে নিতে শুরু করেছে।
বর্তমানে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়া ফাইবার-অপটিক কেবলগুলো সাধারণত এশিয়ার উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের দিকে গেছে। কিন্তু এআইয়ের দ্রুত বিস্তার এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এখন ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে এই কেবলগুলোর নতুন রুট তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন রুটে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে অবস্থিত মালাক্কা প্রণালির মতো অত্যন্ত সংকীর্ণ সমুদ্রপথ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মতো চরম বিরোধপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই রুট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেও পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া, তারপর প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ হয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
২০২২ সালে ওমান থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত সমুদ্রের নিচে এমন নতুন রুটের প্রথম কেবল বসানো হয়। এই কেবলের শাখা সংযোগ দেওয়া হয়েছে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়াগো গার্সিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার ছোট দ্বীপ কোকোস আইল্যান্ডসে।
এই নতুন কেবল রুট তৈরির পেছনে প্রথম বড় পরিবর্তন হলো—এগুলোর অর্থায়নের উৎস। সমুদ্রের নিচে কেবল বসানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই গত কয়েক দশক ধরে বড় বড় জাতীয় টেলিকম কোম্পানিগুলো কনসোর্টিয়াম বা জোট গঠন করে যৌথ অর্থায়নে এসব কেবল নির্মাণ করত। ১৯৯৯ সালে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে নির্মিত প্রথম দিকের বড় ফাইবার-অপটিক কেবল ‘সি-মি-উই ৩’ নির্মাণে খরচ হয়েছিল ১.৩ বিলিয়ন ডলার, যাতে অংশ নিয়েছিল ৯২টি কোম্পানি। এত বেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় সময় বেশি লাগত এবং খরচও বেড়ে যেত। আর যেহেতু এর বেশিরভাগ গ্রাহক এশিয়ার ছিল, তাই কেবলের রুটও সেই অঞ্চলের উপকূল ঘেঁষেই রাখা হতো।

তবে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বলছে, এআইয়ের দ্রুত প্রসার সমুদ্রের নিচের কেবল ব্যবসার অর্থনীতি ও মানচিত্র—দুটোই বদলে দিচ্ছে। গত ১০ বছরে গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেরাই কেবল নির্মাণে এককভাবে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ শুরু করেছে। এতে অর্থ জোগাড় ও পরিকল্পনার কাজ সহজ হয়েছে এবং নতুন কেবল বসাতে আগের তুলনায় অনেক কম সময় লাগছে।
গুগল ২০০৮ সালে প্রথম সমুদ্রের নিচে বসানো একটি কেবলে বিনিয়োগ করে। এরপর থেকে তারা অন্তত ৩৪টি কেবলে অর্থায়ন করেছে, যার মধ্যে ১৮টির পূর্ণ মালিকানা শুধু গুগলের। এখন মেটা, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু সাধারণ মানুষকে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার জন্য নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা নিজেদের বিশাল ডেটা সেন্টারগুলোর মধ্যে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করার জন্য সমুদ্রের তলদেশে নতুন নতুন কেবল বসাচ্ছে।
গত বছর গুগল ঘোষণা দেয় যে, ভারত মহাসাগরে অস্ট্রেলিয়ার আরেকটি দ্বীপ ক্রিসমাস আইল্যান্ড অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে নতুন কেবল নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হবে। এই কেবল ওমান থেকে মালদ্বীপ হয়ে ক্রিসমাস আইল্যান্ডে যাবে এবং সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছাবে। অন্যদিকে, মেটার ১০ বিলিয়ন ডলারের নির্মাণাধীন বৈশ্বিক কেবল নেটওয়ার্ক প্রজেক্ট ‘ওয়াটারওয়ার্থ’-ও ভারত মহাসাগরে প্রায় একই পথ অনুসরণ করবে।
বর্তমানে সমুদ্রের তলদেশে নতুন ইন্টারনেট কেবল দ্রুতগতিতে বসানো হচ্ছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, আগামী চার বছরে নতুন কেবল নির্মাণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। এর সিংহভাগই করবে গুগল ও মেটার মতো টেক জায়ান্টরা, যারা এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চায়। যদিও স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা ধীরে ধীরে সস্তা হচ্ছে, তবুও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডেটা ট্রান্সমিশন সমুদ্রের নিচের ফাইবার অপটিক কেবলের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। তাই এখনও বিশ্বের এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া মোট ইন্টারনেট ডেটার ৯৯ শতাংশই সমুদ্রের নিচের কেবল দিয়ে আদান-প্রদান হয়।

সমুদ্রের নিচের কেবল নির্মাণের ধরন ও কৌশলেও বড় পরিবর্তন আসছে। আগে কেবলগুলো মূলত জনবসতির কাছাকাছি বা অগভীর সমুদ্র দিয়ে বসানো হতো। এখন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে খোলা ও গভীর সমুদ্র দিয়ে নতুন রুট তৈরি করছে। কেবল বসানোর জন্য এমন রুট বেছে নেওয়া হচ্ছে যেখানে চীনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কিংবা এমন কোনো দেশের জলসীমা নেই যারা কেবল বসানো বা মেরামতের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বা শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে। যেমন—ইন্দোনেশিয়ার প্রণালীগুলো এড়িয়ে এখন নতুন রুট তৈরি করা হচ্ছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর এখন একটি বড় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির জায়গা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে সমুদ্রের নিচের কেবল মেরামতে বাধা দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু চীন যে 'নাইন-ড্যাশ লাইন' নামে বিশাল সমুদ্র এলাকা নিজেদের বলে দাবি করে, সেই বিতর্কিত এলাকার ভেতরে কোনো কেবল মেরামত করতে হলে বেইজিংয়ের অনুমতি নিতে হয়।
এ ছাড়া মালাক্কা প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেও নানা আঞ্চলিক ঝুঁকি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির গবেষক স্যামুয়েল ব্যাশফিল্ড বলেন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো উপকূলীয় দেশগুলো প্রায়ই সাবমেরিন কেবল সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তন করে। যে কারণে কেবল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় জাহাজ ব্যবহারসহ বিভিন্ন জটিল শর্ত মানতে হয়, যা তাদের খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি অর্থসংকটে থাকা ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রী দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও প্রণালীগুলো থেকে কীভাবে আরও বেশি রাজস্ব আয় করা যায়, তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করেছেন। এতে ভবিষ্যতে আরও কঠোর নিয়ম আসতে পারে বলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আশঙ্কা করছে।
এসব আইনি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে এখন অনেক ইন্টারনেট ট্রাফিক নতুন পথ ব্যবহার করছে। গুগল ও মেটার নতুন কেবল নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্য থেকে অস্ট্রেলিয়া হয়ে সরাসরি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে সংযোগ দিচ্ছে। আবার প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে গুয়ামকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ বাড়ানো হচ্ছে।
এর ফলে, সমুদ্রের নিচের বৈশ্বিক ইন্টারনেট অবকাঠামো এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর একটি অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে, আর অন্য অংশটি আবর্তিত হচ্ছে চীনকে ঘিরে। এই ভূরাজনৈতিক বিভাজনের একটি বড় প্রমাণ হলো—বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি নতুন কোনো সাবমেরিন কেবল নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।