Advertisement Banner

মানুষের আয়ু ২০০ বছরে নিতে পারে তিমির প্রোটিন, কীভাবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মানুষের আয়ু ২০০ বছরে নিতে পারে তিমির প্রোটিন, কীভাবে?
বো-হেড তিমির শরীরে সিআইআরবিপি প্রোটিন অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি থাকে। ছবি: ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের ওয়েবসাইট

মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রকৃতিতে এমন অনেক প্রাণী আছে যারা শতাব্দী পার করে অনায়াসেই বেঁচে থাকে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো ‘বো-হেড’ তিমি। সমুদ্রের এই বিশালকায় বাসিন্দা ২০০ বছরেরও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে। শুধু দীর্ঘায়ু নয়, বার্ধক্যজনিত রোগ এবং ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির বিরুদ্ধেও এই তিমির রয়েছে অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ ক্ষমতা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের একদল বিজ্ঞানী এই রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছেন।

বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, বো-হেড তিমির দীর্ঘ জীবনের মূলে রয়েছে একটি বিশেষ প্রোটিন, যার নাম ‘সিআইআরবিপি’। এই প্রোটিনটি মূলত ডিএনএ মেরামতের কাজ করে। আমাদের শরীরের ডিএনএ যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শরীরে রোগ বাসা বাঁধে এবং আয়ু কমে যায়। বো-হেড তিমির শরীরে এই সিআইআরবিপি প্রোটিন অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি থাকে। আর এই উচ্চমাত্রার প্রোটিনই তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিএনএ মেরামত করতে সাহায্য করে।

আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের গবেষকরা যখন পরীক্ষাগারে মানুষের কোষ ও মাছির কোষে এই বো-হেড তিমির প্রোটিন যুক্ত করেন, তখন ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। দেখা গেছে, উভয় ক্ষেত্রেই ডিএনএ মেরামতের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই প্রোটিনের প্রভাবে মাছিদের জীবনকাল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বো-হেড তিমিরা উত্তর মেরুর হিমাঙ্কের নিচে থাকা শীতল জলে বাস করে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, নিম্ন তাপমাত্রা এই সিআইআরবিপি প্রোটিনের উৎপাদন ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, তিমির বসবাসের পরিবেশই তাকে প্রাকৃতিকভাবে দীর্ঘজীবী হতে সাহায্য করছে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের বিজ্ঞানীদের মতে, তারা এখন ভাবছেন কীভাবে মানুষের শরীরে এই প্রোটিনের মাত্রা বাড়ানো যায়। লাইফস্টাইলে পরিবর্তন বা ঠান্ডা পানিতে গোসল করার মতো পদ্ধতিগুলো এই প্রোটিন বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে কি না, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে।

বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার কেবল তিমির রহস্য উন্মোচন নয়, বরং এটি মানবদেহের কোষীয় পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ধাপ। গবেষকরা মনে করছেন, বো-হেড তিমির এই বিশেষ প্রোটিনটি মানুষের বার্ধক্যজনিত জটিলতা যেমন—আলঝেইমার বা পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় নতুন আশার আলো দেখাতে পারে। কারণ, এই রোগগুলোর প্রধান কারণ হলো মস্তিষ্কের কোষের ডিএনএ ক্ষয় হওয়া, যা সিআইআরবিপি প্রোটিন কার্যকরভাবে রোধ করতে সক্ষম।

তাছাড়া, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই তিমির বিশাল আকারও একটি গবেষণার বিষয়। সাধারণত বড় প্রাণীদের কোষে বিভাজন বেশি হয় বলে তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকার কথা, যা ‘পেটোস প্যারাডক্স’ নামে পরিচিত। কিন্তু বো-হেড তিমি তাদের দেহে থাকা উচ্চমাত্রার সিআইআরবিপি প্রোটিনের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে এনেছে।

মানুষের ২০০ বছর বেঁচে থাকা হয়তো এখনই বাস্তব নয়। গবেষকদের আশা, তিমির এই জৈবিক কৌশলকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুস্থভাবে বেশিদিন বেঁচে থাকার ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত