বেশ কিছুদিন ধরেই পাকিস্তানে চলছে উত্তেজনা। কখনো পাকিস্তান অধ্যুষিত কাশ্মীরে নির্বাচন, কখনো বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা, কখনো আবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রাজপথ অচল। এভাবে গত কয়েক বছর ধরেই পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকছেন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এবার সম্প্রতি নতুন করে পাকিস্তানে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। এই বেলাতেও তা হচ্ছে ইমরান খানকে কেন্দ্র করেই।
কী হচ্ছে পাকিস্তানে?
পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদের দিকে লং মার্চ করছে তার হাজারো সমর্থক। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়, যা আজ সোমবার আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তার পরিবারের দাবি, কারা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে।
কারাগারে থাকলেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান এখনো গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে রয়েছেন। অতীতেও তার সমর্থনে হওয়া বিক্ষোভে প্রাণঘাতী সহিংসতা এবং দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটেছে।
রোববারের এই মিছিল শুরু হয় ইসলামাবাদ থেকে ২৭৫ কিলোমিটার দূরের শহর লাক্কি মারওয়াত থেকে। রাতে মিছিলটি থামানো হয়। স্থানীয় সময় সোমবার দুপুরের দিকে এটি আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মিছিলটি মূলত গত সপ্তাহেই হওয়ার কথা ছিল। তবে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এবং সরকারের মধ্যে আলোচনার সুযোগ দিতে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিতে আসা ইমরানের বিরুদ্ধে ১০০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। ইমরানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রির মতো বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের আগস্টে তাকে প্রথম কারাগারে পাঠানো হয়। গত বছর তার স্ত্রী বুশরা বিবিকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গেল বছর দুর্নীতির মামলায় তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ইমরানের দাবি, তার বিরুদ্ধে করা সব মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
পিটিআই-শাসিত খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি আশা করছেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যে মিছিলটি ইসলামাবাদের প্রায় ৮০ কিলোমিটার পশ্চিমের একটি শহরে পৌঁছাবে। রোববার তিনি বলেছেন, “তত দিনে এই আন্দোলন দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যাবে এবং প্রতিটি চত্বর কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হবে।” একই সঙ্গে জনগণকে “রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার” আহ্বান জানিয়েছেন সোহেল।
রাজধানীর পথে ব্যারিকেড
ইসলামাবাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলো বন্ধ করতে সড়কে কনটেইনার স্তূপ করে রেখেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ফলে রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
পিটিআই বলেছে, সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার একটি কারণ হলো দলটির নেতাদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি না দেওয়া। জাতীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য এই সুযোগ চেয়েছিল দলটি। দলটি আরও জানিয়েছে, ইমরানের দ্রুত নানা ধরনের পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি পিটিআইয়ের নেতা ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির বিরুদ্ধে আলোচনা ‘ভেস্তে দেওয়ার’ অভিযোগ করেছেন। পাকিস্তানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, নাকভির দাবি হলো, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়ে আগে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকার সরে গেছে।
কেন এই বিক্ষোভ?
গত আগস্টে শারীরিক অবস্থার অবনতির অভিযোগ ওঠার পর ইমরানকে কারাগার থেকে অল্প সময়ের জন্য সরকারি একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে তার শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয় এবং চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাকে ‘সুস্থ’ বলে ঘোষণা করে। ২০২৩ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে ইমরান যেসব সুবিধা পেয়েছেন, তার মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইমরানের পরিবার ও পিটিআই অবশ্য কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে ইমরানের পরীক্ষা করানোর আদালতের নির্দেশ মানেনি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর ইমরানের বোন আলিমা খানমকে পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাহোর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে বলা হয়, আলিমা খানম মানুষকে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে’ সংগঠিত করছিলেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়া ও তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগও আনা হয় তার বিরুদ্ধে।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতাতেই এবার ফের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। এই বিক্ষোভের আগুন কতটা তীব্র হয়ে ওঠে, তাই এখন দেখার!