Advertisement Banner

রাজস্বে ‘মেগা জাম্পের’ লক্ষ্য

প্রস্তাবিত বাজেটে অতিরিক্ত প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা আসবে কোথা থেকে?

প্রস্তাবিত বাজেটে অতিরিক্ত প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা আসবে কোথা থেকে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি— রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছে। সংখ্যাটি শুধু বড় বলেই নয়, বরং দেশের সাম্প্রতিক রাজস্ব আদায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন রাজস্ব লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একইসঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তারেক রহমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সরকার বলছে, করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং কর ফাঁকি কমানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের বড় অংশ মনে করছেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এমন লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

মোট রাজস্ব লক্ষ্য কত?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে—

  • এনবিআর সংগ্রহ করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা
  • এনবিআর-বহির্ভূত কর রাজস্ব আসবে ২৫ হাজার কোটি টাকা
  • কর-বহির্ভূত রাজস্ব আসবে ৬৬ হাজার কোটি টাকা

অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আয়ের মূল দায়িত্বই পড়ছে এনবিআরের ওপর।

কোন খাত থেকে কত টাকা আসবে?
খাতলক্ষ্যমাত্রা
ভ্যাট৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা
আয়কর২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা
শুল্ক ও কাস্টমস৬৭ হাজার কোটি টাকা
মোট৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা

এক্ষেত্রে সরকার সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে ভ্যাটের ওপর। মোট লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের বেশি রাজস্ব আসার কথা এই খাত থেকে।

লক্ষ্য পূরণে প্রবৃদ্ধি কেন আলোচনায়?

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই হিসেবে আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করতে হবে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৪৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরে এত বড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধির নজির নেই। সে কারণেই বারবার এ নিয়ে আলোচনা করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গত কয়েক বছর ধরেই এনবিআর ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেও ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এনবিআরের পরিকল্পনা কী?

করজাল সম্প্রসারণ

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন যে, ‘‘নতুন কর আরোপের চেয়ে করজাল বিস্তৃত করার যে পরিকল্পনার কথা আমরা বলে আসছি, সেটাই হবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা অর্জনের কৌশল।’’ এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী এই কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত কিন্তু কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, তাদের করজালের আওতায় আনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নানামূখী কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে।”

এনবিআরের হিসেবে, দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ হলেও নিয়মিত করদাতার সংখ্যা তার তুলনায় অনেক কম।

ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি

ভ্যাটকে সরকার আগামী বছরের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে দেখছে। ভ্যাট নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “বাংলাদেশে আয়করের তুলনায় ভ্যাটের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনও সীমিত। তাই ভ্যাট-ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করা হবে।”

এই লক্ষ্য সামনে রেখে ভ্যাট নিবন্ধনের টার্নওভার সীমা ৫০ লাখ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাজেটে সরাসরি উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর নতুন কোনো বাড়তি আয়কর আরোপ করা হয়নি। উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নতুন ব্যক্তিগত আয়কর বৃদ্ধির মুখে পড়ছেন না। তবে, প্রথম করযোগ্য স্ল্যাবে করহার ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে করে মধ্যম আয়ের করদাতারাই বেশি চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তবে, কে চাপে পড়বে সেটি বিবেচনা না করলে কর আদায়ের মাধ্যমে আয় বাড়াতে এটিও একটি কৌশল হিসেবে ধরা দিয়েছে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে।

কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর

রাজস্ব আদায়ের বড় অংশ নির্ভর করছে প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থার ওপর। বাজেট প্রস্তাবনায় দেওয়া লক্ষ্য পূরণে আত্মবিশ্বাসী এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন , “আমরা কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর—তিনটি ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের দিকে এগোচ্ছি। মানবিক হস্তক্ষেপ কমানো গেলে কর ফাঁকি কমবে এবং রাজস্ব বাড়বে।” এনবিআর এরইমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক ডিজিটাল অডিট ব্যবস্থা চালুর কাজ শুরু করেছে। ভ্যাট রিফান্ডও ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিটা প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশীদের কাজ দেওয়া ও তথ্যসুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এনবিআর চেয়ারম্যান চরচাকে জানান, “এখনো কাওকে কাজ দেওয়া হয়নি।” তবে, বিভিন্ন মহলেরও উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। সবশেষে ‘চরচা’ আয়োজিত বাজেট আলোচনায় প্রতিযোগী দেশের আইটি কোম্পানিকে এ অটোমেশনের কাজ দেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি।

তামাক খাতে কড়াকড়ি

তামাক খাতে কর ফাঁকি রোধে ট্র্যাক-অ্যান্ড-ট্রেস প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআর মনে করে, উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় আনা হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি কমানো সম্ভব। এতে করে রাজস্বও বাড়বে বলে মনে করেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

অর্থমন্ত্রী কী বলছেন?

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, রাজস্ব বাড়ানোর একমাত্র টেকসই পথ হলো করজাল সম্প্রসারণ। বাজেট বক্তব্যে তিনি বলেন, “অর্থনীতির বৃহৎ একটি অংশ এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। করের হার বাড়ানো নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণই হবে সরকারের অগ্রাধিকার।” তার মতে, ব্যাংকিং সেবা, ট্রেড লাইসেন্স, ঋণ সুবিধা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার সঙ্গে কর-সম্মতি আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ কাটছে না

অর্থনীতিবিদদের বড় অংশের মতে, লক্ষ্যটি কাম্য হলেও বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন। এছাড়া, লক্ষ্য অর্জন না করতে পারলে জটিলতা আরও বাড়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে। সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সাবধান করে বলেন, “এক বছরে এত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হলে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হবে, যার সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”

কেউ কেউ এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে সরাসরি ‘অবাস্তব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের অনেকে বলছেন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা সহজ, কিন্তু রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা না বাড়ালে এত বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। কোন কোন বিশ্লেষক বাজেট প্রস্তাবনায় রাজস্ব আদায়ের এতো বড় লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে সরকারের কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেন। বাজেট পরবর্তী এক আলোচনায় এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া বলেন, “আগামী অর্থবছরে রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে—এমন বড় করনীতি পরিবর্তন খুব বেশি নেই। ফলে অতিরিক্ত রাজস্ব কোথা থেকে আসবে, সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।”

বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কমগুলোর একটি। রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা, কর সম্মতি এবং প্রয়োগ সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন ছাড়া এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন কঠিন।” আরও একটি পর্যবেক্ষণে তিনি উল্লেখ করেন, “বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।”

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর টার্গেট

কর-জিডিপি অনুপাত দিয়ে বোঝা যায় অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকার কত কর সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ কারণেই সরকার দীর্ঘদিন ধরে করজাল সম্প্রসারণকে অন্যতম প্রধান নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে বাজেট প্রস্তাবনায়।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নতুন করদাতা নিবন্ধন করলেই হবে না; তাদের নিয়মিত কর প্রদান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষ্য পূরণ না হলে কী হতে পারে?

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে সরকারের ব্যয় নির্বাহে চাপ তৈরি হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, রাজস্ব ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে—

  • সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়তে পারে
  • সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে
  • উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন সংকুচিত হতে পারে
  • বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমতে পারে
  • বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর ঝুঁকিও রয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা শুধু এনবিআরের জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যই একটি বড় পরীক্ষা। সরকার করজাল সম্প্রসারণ, সম্পদ কর, ডিজিটালাইজেশন এবং কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন—প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া কি এক বছরে ৪৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত এবং সরকারের রাজস্ব কৌশল কতটা কার্যকর।

সম্পর্কিত