কেন ডুরান্ড রেখাকে স্বীকৃতি দেয় না আফগানিস্তান

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কেন ডুরান্ড রেখাকে স্বীকৃতি দেয় না আফগানিস্তান
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সম্প্রতি দোহায় কাতারের মধ্যস্থতায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে এক শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে আশা করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সীমান্ত সমস্যার অবসান ঘটবে। এখানে ‘সীমান্ত’ বলতে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মধ্যে থাকা ডুরান্ড লাইন বা ডুরান্ড রেখাকে বোঝানো হয়।

তবে আফগানিস্তান কখনোই ডুরান্ড লাইনকে আনুষ্ঠানিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং তারা একে নিজেদের মূল ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।

শান্তি আলোচনার পর আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ অভিযোগ করেন, পাকিস্তান ডুরান্ড লাইন নিয়ে ভুয়া ব্যাখ্যা ছড়াচ্ছে, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।

তিনি আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যম টোলো নিউজকে বলেন, “সীমান্ত নিয়ে কাতারের বক্তব্য মোটেও আমাদের চুক্তিতে নেই। ডুরান্ড লাইন আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ও আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল দেশের জনগণের।”

আফগানিস্তানের তীব্র আপত্তির পর কাতার তার সরকারি বিবৃতি সংশোধন করে ‘দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সীমান্তে’ শব্দগুচ্ছের পরিবর্তে ‘দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে’ বাক্যাংশ ব্যবহার করেছে।

কী এই ডুরান্ড লাইন

ডুরান্ড লাইন ১৮৯৩ সালে হিন্দুকুশ পর্বতমালায় তৈরি হয়। এটি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যকার প্রশাসনিক সীমারেখা হিসেবে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এটি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিভাজনরেখা।

ডুরান্ড লাইন ১৮৯৩ সালে হিন্দুকুশ পর্বতমালায় তৈরি হয়। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ডুরান্ড লাইন ১৮৯৩ সালে হিন্দুকুশ পর্বতমালায় তৈরি হয়। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

এই রেখা প্রতিষ্ঠিত হয় উনিশ শতকের তথাকথিত ‘গ্রেট গেম’-এর সময়, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও রুশ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। রুশ সম্প্রসারণ ঠেকাতে ব্রিটিশরা আফগানিস্তানকে একটি ‘বাফার রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার হেনরি মর্টিমার ডুরান্ড ও আফগান আমির আবদুর রহমান খান এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল আফগান রাজ্য ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে প্রভাবক্ষেত্র নির্ধারণ ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করা।

আবদুর রহমান ১৮৮০ সালে রাজা হন। দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধে ব্রিটিশরা কিছু আফগান এলাকা দখল করেছিল। ডুরান্ডের সঙ্গে তার চুক্তি আফগান সীমান্তে উভয় পক্ষের এখতিয়ার নির্ধারণ করে।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৬৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেখা চিহ্নিত করা হয়, যা চীন সীমান্ত থেকে ইরান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রেখা পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলকে দুইভাগে ভাগ করে দেয়। এটি এখন জাতিগত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চুক্তির মাধ্যমে বেলুচিস্তান ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ওয়াখান করিডরকে (চীনের সীমান্ত পর্যন্ত সরু এলাকা) বাফার জোন হিসেবে রাখা হয়। ১৯১৯ সালের অ্যাংলো-আফগান চুক্তি অনুসারে এই রেখায় সামান্য পরিবর্তন আনা হয়। চুক্তিটি ১০০ বছরের জন্য কার্যকর ছিল, কিন্তু ১৯৯৯ সালে তা নবায়ন করা হয়নি।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ডুরান্ড রেখার আইনি উত্তরাধিকারী হয়। তবে আফগানিস্তান এই সীমারেখাকে আজও স্বীকৃতি দেয়নি। কাবুলের দাবি, সিন্ধু নদীর পশ্চিমের সমস্ত ভূখণ্ড আফগানিস্তানের অংশ। অনিয়ন্ত্রিত চলাচল রোধের জন্য পাকিস্তান এরই মধ্যে ডুরান্ড লাইনে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের পটভূমি

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ডুরান্ড রেখা দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান-আফগানিস্তান বিরোধের কারণ। তবে এবার দুই দেশের যুদ্ধপরিস্থিতির জন্য এই রেখা দায়ী নয়। আসল সংকটের সূত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ (টিটিপি) বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, এই গোষ্ঠীগুলো আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তবে কাবুল নিয়মিতই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।

সংঘাতের উত্তেজনা বেড়ে যায় ১১ অক্টোবর, যখন আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারত সফরে থাকাকালীন কাবুলে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। আফগান সরকার এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে। পরবর্তীতে তালেবান দক্ষিণ সীমান্তে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কয়েকটি তীব্র আক্রমণ চালায়, যার জবাবে ইসলামাবাদও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়।

ডুরান্ড লাইন কেবল একটি সীমান্ত রেখা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, রাজনীতি ও জাতিগত পরিচয়ের এক জটিল প্রতীক। বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস সফল হতে হলে, এই বিতর্কিত রেখার নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট আগে সমাধান করতে হবে।

সম্পর্কিত