কয়েক মাস আগে ভারতের বিহারে শিঙাড়া নিয়ে বচসা থেকে ভয়ানক এক কাণ্ড ঘটেছিল। একজনের প্রাণ চলে গিয়েছিল। সে ঘটনার আদ্যোপান্ত নিয়ে বেশি কথায় যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু, ভাবুন একবার সামান্য শিঙাড়া নিয়ে এত বড় কাণ্ড! যাক সে কথা।
সকালের নাশতা পর বেলা একটু বাড়লে কিংবা সন্ধ্যাবেলা গরম শিঙাড়া খেতে অনেকেই খুব ভালোবাসেন। ডাক্তাররা যতই একে অস্বাস্থ্যকর বলুক না, তাকে থোড়াই কেয়ার না করেই অনেকে মজে থাকেন শিঙাড়ার মধ্যে। কিন্তু এই শিঙাড়া আমাদের কাছে এলো কীভাবে?
শিঙাড়া আদ্যন্ত বাঙালি নিরামিষ খাবার হলেও এরজন্ম কিন্তু মাংসের পুর ভরা সামোসা বা যাকে সমুচা বলি তার থেকে। এই সমুচা কিন্তু আবার আমাদের পরিচিত সমুচা নয়। তখন এর নাম ছিল সানবোসাগ। সেখান থেকে সামোসা।
সামোসার জন্ম পারস্যে। জন্মলগ্ন থেকেই খাবারটি জনপ্রিয়। বাগদাদের খ্যাতনামা ঐতিহাসিক আবুল ফজল বেহাকি ‘তারিখ-এ-বেহাকি’ বইতে এর কথা লিখেছেন। গজনবী সুলতানদের দরবারে বেশ কদর পেত সামোসা।
সামোসা এই উপমহাদেশে আসে হাজার বছর আগে আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। খিলজি সাম্রাজ্যের নানা কিছুর সাক্ষী আমীর খসরু থেকে শুরু করে তুঘলক আমলে এদেশে আসা ইব্ন বাতুতা– প্রত্যেকের লেখায় সামোসার কথা উল্লেখ আছে। ইব্ন বাতুতার ‘সফরনামা’-তে মুহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারের পরিবেশিত মাংসের কিমা দিয়ে বানানো ঘিয়ে ভাজা ‘সাম্বুসাক’-এর কথা লেখা আছে।
ইব্ন বাতুতার ‘সফরনামা’-তে মুহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারের পরিবেশিত মাংসের কিমা দিয়ে বানানো ঘিয়ে ভাজা ‘সাম্বুসাক’-এর কথা লেখা আছে। ছবি: এআই দিয়ে বানানোএরও দুশো বছর পর আবুল ফজলের লেখা ‘আইন-ই-আকবরি’-তে ‘সামবুসা’র কথা পাওয়া যায়। অর্থাৎ কয়েক শতাব্দী ধরে সুলতানি দরবারে সামোসা জনপ্রিয় ছিল। যে সমস্ত অঞ্চলে সুলতানি রাজত্ব কায়েম ছিল, প্রায় সব জায়গাতেই সাম্বুসা পৌঁছে গিয়েছিল।
এই যে এতক্ষণ যে বস্তুটির কথা বলা হচ্ছে তার পুর কিন্তু সব সময় মাংস। আলু বা শীতকালের ফুলকপি তখনও শিঙাড়ায় ঢোকেনি। ঢুকবেইবা কীভাবে তখন পর্যন্ত এ দুটো সবজি আমাদের উপমহাদেশে এসে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ শিঙাড়া অনেক দিন পর্যন্তই আমিষ ছিল। এখনও যে আমরা কলিজা শিঙাড়া, কিংবা হালের প্যাকেটজাত চিকেন সমুচা খাই সেটা সেই পারস্যের সামসোরই ধারাবাহিকতা।
বাঙালি শিঙাড়া কীভাবে হলো
সুলতানি আমলে বাংলায় পৌঁছানো সাম্বুসা/সামেসা হলো শিঙাড়া। আর এর জন্ম নিয়ে এমন এক গল্প আছে যা সামোসাকে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের ডায়াবেটিস ছিল, তখন এই রোগটি মধুমেহ নামে পরিচিত ছিল। রাজবাড়ির পাচক একদিন রাজার জন্য লুচি করে পাঠালেন। কিন্তু রাজার সামনে আসতে আসতে সেই লুচি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। এমন কয়েক দফা হওয়ার পর পাচক রাজসভায় মিষ্টি পাঠানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। মধুমেহ আক্রান্ত রাজা খুব রেগে গেলেন। রাজ কবিরাজের পরামর্শে পাচকের মৃত্যুদণ্ডের হুকুম দিয়েছিলেন। অনেক অনুরোধ করে নিজের প্রাণ রক্ষা করলেন হালুইকর।
কিন্তু রাজা আদেশ দিলেন, পাচককে তিন দিনের মধ্যে দেশ ছাড়তে হবে। দ্বিতীয় দিন হালুইকরের স্ত্রী ঠিক করলেন একটা শেষ চেষ্টা করবেন। রাজদরবারে গেলেন তিনি। রাজাকে জানালেন, তিনি এমনভাবে লুচি তরকারি করতে পারেন, যা আধঘণ্টা বাদে খেলেও গরম রাজা পাবেন। সন্দিহান রাজা একটু কিঞ্চিৎ কৌতূহলীও হলেন। পাচকের স্ত্রী চলে গেলেন রান্নাঘরে।
পাচক গিরিধারীর স্ত্রী ধরিত্রী বেহারা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়কে প্রথম শিঙাড়া খাইয়েছিলেন বলে কথিত আছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিপাচকের স্ত্রী বসলেন ময়দা নিয়ে। লেচি কেটে লুচি বেলে, কাঁচা ময়দার ভেতর লুচির জন্য তৈরি সাধারণ তরকারি ভরে দিয়ে, তিনে কোনা করে রেখে দিলেন। তারপর সময়মতো ফুটন্ত ঘি ভর্তি কড়াইয়ে ফেলে দিয়ে তৈরি করলেন শিঙাড়া।
প্রাণদণ্ড পাওয়া সেই পাচকের নাম ছিল গিরিধারী। আর তার স্ত্রীর নাম ছিল ধরিত্রী বেহারা। গল্প আছে কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারেই শিঙাড়ার সঙ্গে রবার্ট ক্লাইভের প্রথম সাক্ষাৎ হয়।
তবে এটা আসলে পারস্যের সামোসা উপমহাদেশে আসার অনেক পরে তৈরি গল্প। ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ প্রথম উপমহাদেশের উপকূলে পা রেখেছিল। আর রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাজস্ব করেছিলেন ১৭২৮ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ আলু রাজার রাজত্বের আগেই এসেছে। মাংসের বদলে শিঙাড়ার ভেতর আলু ভরা হয়তো তার আগেই শুরু হয়েছে।
নাম শিঙাড়া হলো কীভাবে
আবার ফিরে যাই ধরিত্রী বেহারার কাছে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তার বানানো খাবারটি দেখে অভিভূত হয়ে নাম জানতে চাইলে পাচক-স্ত্রী বললেন, এর নাম সমভুজা। তিনি সমবাহু ত্রিভুজের মতো করে বানিয়েছিলেন বলে এর নাম দিয়েছিলেন সমভুজা।
অনেকে বলেন, সাম্বোসাগ>সামবোসা>সম্ভোজা>সমভূজা।
মতান্তরে, সমভুজা>সম্ভোজা>সিভুসা>সিঙুরা (নদীয়ার কথ্যভাষার প্রভাবে)>সিঙ্গাড়া>শিঙাড়া।
অনেকে আবার বলেন পানিফলকে হিন্দিতে সিঙ্গারা বলে সেখান শিঙাড়া এসেছে।
শিঙাড়ার জন্ম, নাম নিয়ে মতান্তর থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশে আসার পর এর স্বাদ আর উপকরণে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর পুরো উপমহাদেশ এর স্বাদে মেতে আছে, বহু দিন ধরে।