কেউ পড়ে গেলে আমরা কেন হাসি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কেউ পড়ে গেলে আমরা কেন হাসি?
প্রতীকী ছবি/ফ্রিপিক

কাউকে পড়ে যেতে দেখে হেসেছেন, এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই হয়েছে। এতে পড়ে যাওয়া ব্যক্তি যেমন লজ্জাবোধ করেন, তেমনি হেসে ফেলা ব্যক্তিও অস্বস্তিতে পড়ে যান।

কখনো ভেবেছেন এমন কেন হয়? কাউকে পড়ে যেতে দেখলে কেন আমরা সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন জেনেভিয়েভ বোলিউ-পেলতিয়ে নামে এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলছেন, একজন মানুষ পড়ে গেলে আমাদের তার প্রতি সহানুভূতি দেখানো উচিত। কারণ তিনি পড়ে যাওয়ার কারণে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। তা না করে উল্টো হাসি। তবে আমাদের হাসি সহানুভূতির অভাব বা নিষ্ঠুরতার কারণে নয়।

কী কারণে এমন হয়

জেনেভিয়েভ বলেছেন, বিভিন্ন কারণে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত হাসির উদ্রেক হতে পারে।

প্রথমত, এই পরিস্থিতির প্রথম উপাদান হলো আশ্চর্য হওয়া। বিশেষভাবে বলতে গেলে, দৈনন্দিন জীবনে কাউকে এমন অবস্থায় দেখা, যখন তিনি কয়েক সেকেন্ড আগেও সব কিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, হঠাৎই কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হন। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি আমাদেরকে বিস্মিত করে।

আরও স্পষ্ট করে বললে, ধরুন আপনি ভেবেছিলেন, X এর পর Y আসবে, কিন্তু চলে এলো B। মানে যা ঘটবে তা অনুমান করতে ভুল হয়েছে। তার মানে বিষয়টি সঙ্গতিপূর্ণ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অসঙ্গতি সমাধান করতে আমরা হেসে ফেলি বলে উল্লেখ করেছেন জেনেভিয়েভ।

জেনেভিয়েভ আরও বলেন, কোনো অপ্রত্যাশিত ও অসমঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে আমাদের মস্তিষ্ক এমন তথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যা আমাদের ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে এবং সেক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সাহায্য করবে।

যে ব্যক্তি হোঁচট খাচ্ছেন তার মুখ আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে? আমরা যা ডিকোড করি তা আমাদের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করবে। নিউরোসাইকোলজিয়া নামে একটি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে ২১০ টি ছবি দেখানো হয়েছিল, যা তিন ধরনের মুখ প্রকাশ করেছে।

সেখানে বিব্রত বা বিভ্রান্ত মুখ, ব্যথা বা রাগ প্রকাশ করা মুখ এবং মুখ দেখা ছাড়া অনেকের শরীর অদ্ভুত অবস্থানে ছিল।

ফটো সেটে ২০টি ল্যান্ডস্কেপ ছবি যোগ করা হয়েছিল যাতে অংশগ্রহণকারীরা গবেষণার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত হন। অংশগ্রহণকারীদের প্রতি বার একটি ল্যান্ডস্কেপ ছবি দেখার সময় একটি বাটন চাপতে বলা হয়েছিল এবং সেই সময় তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়েছিল। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদেরকে প্রতিটি ছবির কতটা মজাদার মনে হলো তা প্রকাশ করতে বলা হয়েছিল।

প্রতীকী ছবি/ফ্রিপিক
প্রতীকী ছবি/ফ্রিপিক

গবেষণার শেষে, অংশগ্রহণকারীরা বিব্রত মুখের ছবিকে ব্যথা বা রাগ প্রকাশকারী মুখের ছবি এবং অদ্ভুত শরীরের অবস্থার ছবি যেখানে মুখ দেখা যায়নি, এমন ছবির তুলনায় অনেক বেশি মজাদার হিসেবে রেট করেছেন। মস্তিষ্কের তথ্যও দেখিয়েছে, মুখের অভিব্যক্তিই সেই উপাদান যা আমাদের হাস্যরস উদ্রেক করতে সাহায্য করে।

তাই যখন আমরা কোনো ব্যক্তির বিব্রত, বিস্মিত বা আশ্চর্য মুখের অভিব্যক্তি দেখি, তখন এটি আমাদের মনে হাসি উদ্রেক করে।

অন্যদিকে, যদি আমরা মুখে ব্যথা বা রাগ দেখি, তাহলে আমরা হোঁচট খাওয়ার ব্যক্তির কষ্ট অনুভব করি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হই, যা আমাদের হাসতে বাধা দেয়।

জেনেভিয়েভ বলেন, “আমরা অন্যকে বিপদে বা খারাপ পরিস্থিতিতে দেখলে অনেক সময় কল্পনা করি, যদি আমাদের সঙ্গে এমন কিছু হতো?”

ফরাসি এই মনোবিদ আরও বলেন, এ সময় আমরা তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে দেখি এবং ভাবি, তারা কী অনুভব করছেন। এই সহমর্মিতার প্রক্রিয়া আমাদের ভেতর অস্বস্তি, অসহায়ত্ব, অপমান আর লজ্জার অনুভূতিকে উসকে দিতে পারে। এরপর যখন দেখি যে আমরা ওই পরিস্থিতিতে নেই, তখন স্বস্তি থেকে মাঝেমধ্যে হাসি পায়।

তাই অন্যের হালকা ধরনের হোঁচট খাওয়া বা অপ্রত্যাশিত কৌতুকপূর্ণ ঘটনার সময় হেসে ফেললে নিজেকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। আসলে তাদের কষ্ট বা দুর্দশায় মানুষ হাসে না। হাসি আসে মূলত পরিস্থিতির অপ্রত্যাশিততা, আচরণের অমিল এবং তাদের বিস্মিত প্রতিক্রিয়া দেখে।

সম্পর্কিত