তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল কীভাবে

তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল কীভাবে
১৯৯১ সালে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠন করা হয় দেশের প্রথম অন্তর্বর্তী সরকার

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারকের পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করে। এর ফলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো।

আওয়ামী লীগের আমলে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সর্বোচ্চ আদালত। পরে ওই বছরের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে নবম সংসদ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর এ নিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র বিরোধিতা করে। সেই সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনির্বাচিত কোনো সরকার ব্যবস্থা ‘গণতন্ত্রের পরিপন্থী’।

তিন দশকের বেশি আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের। তখনও ছিল আরেক সংকটময় সময়।

সেনা শাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছিল ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’।

দীর্ঘদিন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে প্রধান বিচারপতিকে ওই সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

এরশাদ সরকার ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা। ওই সময়ে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ (পরে বিএনপি নেতা) পদত্যাগ করলে সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতি হন। এরপর রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করলে ওই পদে বসেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন।

তার অধীনে ১৯৯১ সালে নির্বাচন হয়। ক্ষমতায় আসে বিএনপি। বিএনপির মেয়াদ শেষে দলগুলোর বর্জনের মধ্যে দলীয় সরকারের অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন হয়।

এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে ওই বছরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান এনে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে পাস করে বিএনপি।

সংবিধানের ওই বিধান অনুসারে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী দুইভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার সুযোগ ছিল। কোনো কারণে সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে তার ১৫ দিনের মধ্যে এবং সরকারের মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে।

ওই সংশোধনীতে বলা ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য হবেন ১১ জন। এর মধ্যে একজন প্রধান উপদেষ্টা এবং অনধিক ১০ জন উপদেষ্টা থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেবেন।

একজন উপদেষ্টার সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে; তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো সংগঠনের সদস্য হবেন না। পরের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবে না মর্মে লিখিত সম্মতি দেবেন এবং তার বয়স ৭২ বছরের বেশি হবে না।

সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি হবেন এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। যদি সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি যদি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে তার ঠিক আগে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করা হবে।

যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি যদি দায়িত্ব নিতে অসম্মতি জানান, তাহলে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসরে গেছেন, তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

আপিল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে না পাওয়া গেলে, বা তারা কেউ প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি না হলে রাষ্ট্রপতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে কোনো ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেবেন। সেভাবেও যদি কাউকে না পাওয়া যায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি তার স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বভার নেবেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় নির্বাচন হয়। তবে বিপত্তি বাঁধে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সে সময়ের সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে মেনে নিতে রাজি ছিল না আওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের অভিযোগ ছিল, কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টার করার জন্যই বিচারপতিদের অবসরের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ নিয়ে এক সংকট, নৈরাজ্যের মধ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।

পরে ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার শপথ নেয়। তবে এই সরকার ক্ষমতায় থাকে প্রায় দুই বছর। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জেলে থাকতে হয় এসময়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘সেনা নিয়ন্ত্রিত’ ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ২৬৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।

২০১১ সালে এক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক বলে রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট। ওই বছরের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে নবম সংসদ।

ওই সংশোধনীর প্রতিবাদে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও তার মিত্ররা। ২০১৮ সালে তারা ভোট এলেও নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে অভিযোগ তোলে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারে অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনও বর্জন করে বিরোধীরা।

টানা চতুর্থবার সরকার গঠনের পর সপ্তম মাসে এসে গত বছরের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন এক গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান তিনি। তিন দিন পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে আবারও একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ক্ষমতা নেয়।

সম্পর্কিত