Advertisement Banner

যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান ট্রাম্পের, কী করবে জাপান

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান ট্রাম্পের, কী করবে জাপান
ছবি: এইআই দিয়ে তৈরি

হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে সুরক্ষা দিতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান, একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি হলো—কোনো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেদের নিকটতম মিত্রকে সমর্থন জানাতে ‘শান্তিবাদী’ জাপান আইনত কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবে?

এর আগে দেশটির শান্তিবাদী নীতি নিয়ে একটু ধারণা দিয়ে নিই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান তখনকরার সম্রাট হিরোহিতোর নেতৃত্বে অক্ষশক্তির অন্যতম প্রতিনিধি ছিল। ১৯৪০ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে জার্মান, ইতালি ও জাপান মিলে অক্ষ-জোট গঠন করে। যুদ্ধে অক্ষশক্তি পরাজিত হয় এবং জাপানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিশেষ করে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার ঘটনা দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে দেয়। বোমা হামলার ভয়াবহতা জাপানিদের মনে যুদ্ধ এবং সামরিক শক্তির প্রতি এক গভীর বিতৃষ্ণা তৈরি করে। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণেই ১৯৪৭ সালে জাপানের সংবিধানে ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়, যেখানে তারা চিরকালের জন্য যুদ্ধ এবং সামরিক শক্তি ত্যাগের অঙ্গীকার করে।

এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় হিসেবে জাপান কোনোদিন যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না। এমনকি যুদ্ধের হুমকি দেওয়া বা শক্তি প্রয়োগ করাও তাদের জন্য নিষিদ্ধ। সংবিধান অনুযায়ী, জাপানের কোনো স্থল, নৌ বা বিমান বাহিনী এবং অন্য কোনো যুদ্ধ-সক্ষমতা থাকবে না। তাদের কাছে থাকবে না কোন আক্রমণাত্মক অস্ত্র যেমন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, বিমানবাহী রণতরী বা বোমারু বিমান। জাপানের সামরিক বাহিনীকে সাধারণ অর্থে সেনাবাহিনী না বলে ‘আত্মরক্ষা বাহিনী’ বলা হয় কারণ এর মূল উদ্দেশ্য হলো দেশ রক্ষা, আক্রমণ নয়।

বর্তমানে জাপানের মিত্র দেশ আমেরিকা এখন ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে বাধিয়েছে। আমেরিকা এমন একটি রাষ্ট্র যাকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। শত্রু দেশ তো পারেই না, মিত্র দেশ হলে বিষয়টি আরও কঠিন। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত আমেরিকার মিত্র দেশ সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত না চাইতেই যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে এবং ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি যখন এই, তখন জাপান কী করতে পারে তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন।

ট্রাম্পকে ‘হ্যাঁ’ বলা মানে, এক অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। ‘না’ বলা মানে জাপান ও আমেরিকার কয়েক দশকের পুরনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা।

প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সামনে বর্তমানে যে সীমিত আইনি পথগুলো খোলা রয়েছে এবং অতীতে নেওয়া যেসব সিদ্ধান্ত তার এই পদক্ষেপকে প্রভাবিত করতে পারে, তা নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

পুলিশি ভূমিকা

এখানে সবার আগে জাপানের পুলিশি ভূমিকা বিবেচনা করা যেতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী দেশটি কোন আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির পথ হিসেবে যুদ্ধকে বেছে নিতে পারবে না। তবে সেই সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সামুদ্রিক আত্মরক্ষা বাহিনীর জাহাজগুলোকে বিদেশে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী কার্যক্রম অভিযানে মোতায়েন করতে পারেন। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো সোমালিয়া উপকূল এবং এডেন উপসাগরে জলদস্যু বিরোধী অভিযান। ২০০৯ সালে আইন সংশোধনের পর জাপান এই অভিযানে যোগ দেয়, যা জাপানি যুদ্ধজাহাজগুলোকে যেকোনো দেশের জাহাজকে সুরক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি পার্লামেন্টে বলেন, “যদি আত্মরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে আরও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়, তবে এই ধরণের পুলিশি অভিযানের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।”

কিন্তু এই আইনি কাঠামোটি মূলত পুলিশি কার্যক্রমের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যুদ্ধের জন্য নয়। ফলে এমন কোনো অভিযানে এই আইন প্রয়োগ করা, যেখানে জাপানি বাহিনীকে ইরানের মতো কোনো রাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হতে পারে, তা আইনিভাবে বেশ জটিল ও বিতর্কিত হবে।

উচ্চতর আইনি মানদণ্ড

জাপান তার শান্তিবাদী নীতি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে সরে এসে ২০১৫ সালে একটি নিরাপত্তা আইন পাস করে, যা সীমিত পরিস্থিতিতে বিদেশে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেয়। তবে এটি কেবল তখনই সম্ভব, যদি জাপানের কোনো ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগীর ওপর আক্রমণ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যা জাপানের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্য কোনো পথ খোলা না থাকে।

এই আইনটি জলদস্যু বিরোধী অভিযানের তুলনায় ব্যাপকতর শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দিলেও, এটি কার্যকর করার আইনি শর্ত বা মানদণ্ড অনেক বেশি কঠিন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচিকে যুক্তি দেখাতে হবে যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে জ্বালানি সরবরাহে যে বিঘ্ন ঘটবে, তা জাপানের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট। তবে এমন একটি যুক্তি দেখাতে গেলে তাকে প্রবল রাজনৈতিক এবং জনরোষের মুখে পড়তে হবে।

এই বিতর্কিত আইনটি এখন পর্যন্ত কখনো ব্যবহৃত হয়নি। চলতি সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে জাপান আপাতত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।

অতীতের যা করেছে জাপান

মধ্যপ্রাচ্য এবং এর আশেপাশে জাপানের অতীতের সামরিক অভিযানগুলো প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির জন্য একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে টোকিও কীভাবে সবসময় তার আইনি সীমানার মধ্যে থেকেছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় জাপান সরাসরি সৈন্য না পাঠিয়ে কেবল অর্থ সহায়তা দিয়েছিল, যা আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশগুলোর কাছে চেকবুক ডিপ্লোম্যাসি (বা কেবল অর্থ দিয়ে দায় সারার কূটনীতি) হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাপান পারস্য উপসাগরে মাইন-সুইপার (মাইন অপসারণকারী জাহাজ) পাঠিয়েছিল, যা ছিল জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনীর প্রথম বিদেশ অভিযান।

ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির ইউনাইটেড স্টেটস স্টাডিজ সেন্টারের প্রধান নির্বাহী এবং অধ্যাপক মাইকেল গ্রিন বলেন, “উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় জাপানের সেই দুর্বল সাড়া এখনো দেশটির জাতীয় চেতনায় একটি ক্ষত বা গ্লানি হিসেবে রয়ে গেছে। তাই আমার ধারণা, তাকাইচি সরকার তাদের উপস্থিতি জাহির করার কোনো না কোনো পথ খুঁজছে।”

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর, জাপান ভারত মহাসাগরে তাদের নৌ-বাহিনীর জাহাজ পাঠিয়েছিল আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে জ্বালানি সরবরাহ এবং অন্যান্য সহায়তা দিতে। এই মিশনটি আট বছর ধরে চললেও এতে কোনো যুদ্ধ বা পাহারা দেওয়ার কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

এরপর ২০০৪ সালে জাপান ইরাকে পুনর্গঠন কাজের জন্য প্রায় ৬০০ পদাতিক সৈন্য পাঠায় এবং সেই সাথে রসদ ও কর্মী পরিবহনে সহায়তার জন্য বিমান পাঠায়। সেই সৈন্যদের কেবল আত্মরক্ষার খাতিরে শেষ উপায় হিসেবে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি ছিল এবং তাদের দুই বছরের অবস্থানকালে ডাচ ও অস্ট্রেলীয় সৈন্যরা তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছিল।

২০১৯ সালে ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটন যখন ইরানকে দায়ী করেছিল, তখন জাপান সোমালিয়া উপকূলের জলদস্যু বিরোধী অভিযান থেকে একটি যুদ্ধজাহাজ এবং একটি টহল বিমান সরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর ও এডেন উপসাগরে তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিল। তবে, সেই সময় জাপানি জাহাজ ও বিমানগুলো হরমুজ প্রণালী এবং পারস্য উপসাগরের সীমানার বাইরে অবস্থান করেছিল।

আন্তর্জাতিক আইনের সমস্যা

জাপান একটি পৃথক আইনি প্রশ্নেরও সম্মুখীন- আমেরিকার এই সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ কি না।

জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া অথবা সশস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার যুক্তি ছাড়া সাধারণত শক্তি প্রয়োগ বা যুদ্ধ নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক আইনের দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত একটি দেশের জন্য এই অনিশ্চয়তা টোকিওকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে।

ইরানের ওপর আমেরিকার হামলাগুলো সেই আইনি মানদণ্ড পূরণ করে কি না, সে বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বিভক্ত। আর প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে জাপানের অবস্থান কী হবে, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

সম্পর্কিত