চরচা ডেস্ক

মাত্র পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ–কিন্তু তার আর্থিক অভিঘাত ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের অর্থনীতিকে গভীর চাপে ফেলেছে। ইসরায়েলি দৈনিক ক্যালকালিস্ট-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের মোট ব্যয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই অঙ্কটি শুধু সামরিক খরচ নয়, বরং বেসামরিক ক্ষতিপূরণ, ব্যবসা সহায়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টার সম্মিলিত প্রতিফলন। ফলে প্রশ্ন উঠছে–এই যুদ্ধ কি কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হচ্ছে?
প্রথমত, সামরিক ব্যয়ের দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই প্রায় ৩৯ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন ডলার) অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছে। এটি কেবল চলমান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য, ভবিষ্যৎ ব্যয়ের সম্ভাবনা এর বাইরে। অর্থাৎ, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, এই ব্যয় ততই বাড়বে। একটি আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি এমন যে, শুধু অস্ত্র বা সেনা মোতায়েন নয়–ড্রোন, মিসাইল প্রতিরক্ষা, সাইবার অপারেশন, গোয়েন্দা কার্যক্রম– সবকিছুই বিপুল অর্থের দাবি রাখে। ফলে, প্রাথমিকভাবে স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই অভিযান এখন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিশ্রুতিতে রূপ নিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বেসামরিক খরচের বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। প্রায় ২৬ হাজার ক্ষতিপূরণের দাবি জমা পড়েছে, যার পরিমাণ ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন শেকেলের মধ্যে। এই অর্থ মূলত ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত সম্পদের জন্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আরও বড় একটি খরচ হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তা। রাজস্ব কমে যাওয়ার কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাদের জন্য অনুদান ও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে–যা ইতিমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। সব মিলিয়ে বেসামরিক খাতে ব্যয় ৮ বিলিয়ন শেকেল ছাড়িয়ে গেছে।
এই দুই খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন শেকেল বা ১৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই সংখ্যা স্থির নয়–বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, বর্তমান ব্যয় কেবল একটি মধ্যবর্তী হিসাব, চূড়ান্ত নয়।
অর্থনীতির ওপর এই চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যবসায়িক আচরণের পরিবর্তন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে তারা সরকারি ক্ষতিপূরণের জন্য যোগ্য হয়। এই প্রবণতা অর্থনীতিতে একটি ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করছে, যেখানে সরকারি সহায়তা পাওয়ার জন্য বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা বাড়াতে পারে।
একইসঙ্গে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে। শিল্প উৎপাদন, পরিষেবা খাত, এমনকি প্রযুক্তি খাতেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়, বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদাও কমে যায়। ফলে, অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মন্তব্য এই পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়–বর্তমানে কিছু আর্থিক ‘সেফটি মার্জিন’ থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সালের বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে। অর্থাৎ, সরকারকে হয়ত অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে অথবা কর বাড়াতে হবে, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
এখানে একটি বৃহত্তর প্রশ্নও উঠে আসে–যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য কী ছিল এবং তা কতটা অর্জিত হয়েছে? যদি লক্ষ্য ছিল দ্রুত রাজনৈতিক বা সামরিক ফলাফল অর্জন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের এই ধারা সেই কৌশলের সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে। একটি যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়, তার অর্থনৈতিক খরচ ততই জ্যামিতিক হারে বাড়ে, এবং সেই খরচ শুধু অর্থনীতির ওপর নয়, সমাজ ও রাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই ব্যয় ইসরায়েলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব ফেলবে। ইসরায়েল একটি প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চ-উন্নত অর্থনীতি, যেখানে প্রতিরক্ষা খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বেসামরিক খাতের অবদানই মূল চালিকাশক্তি। যদি যুদ্ধের কারণে এই খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে, বেকারত্ব বাড়তে পারে এবং সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় কেবল একটি সংখ্যা নয়–এটি একটি সতর্ক সংকেত। এটি দেখায় যে আধুনিক যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং অর্থনৈতিক সহনশীলতারও পরীক্ষা। ইসরায়েল এই পরীক্ষায় কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের দৈর্ঘ্য, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট– যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার মূল্য ততই বাড়বে। এবং সেই মূল্য শুধু অর্থে নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতায়ও পরিমাপ করতে হবে।

মাত্র পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ–কিন্তু তার আর্থিক অভিঘাত ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের অর্থনীতিকে গভীর চাপে ফেলেছে। ইসরায়েলি দৈনিক ক্যালকালিস্ট-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের মোট ব্যয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই অঙ্কটি শুধু সামরিক খরচ নয়, বরং বেসামরিক ক্ষতিপূরণ, ব্যবসা সহায়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টার সম্মিলিত প্রতিফলন। ফলে প্রশ্ন উঠছে–এই যুদ্ধ কি কেবল সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হচ্ছে?
প্রথমত, সামরিক ব্যয়ের দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই প্রায় ৩৯ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন ডলার) অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছে। এটি কেবল চলমান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য, ভবিষ্যৎ ব্যয়ের সম্ভাবনা এর বাইরে। অর্থাৎ, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, এই ব্যয় ততই বাড়বে। একটি আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি এমন যে, শুধু অস্ত্র বা সেনা মোতায়েন নয়–ড্রোন, মিসাইল প্রতিরক্ষা, সাইবার অপারেশন, গোয়েন্দা কার্যক্রম– সবকিছুই বিপুল অর্থের দাবি রাখে। ফলে, প্রাথমিকভাবে স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই অভিযান এখন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিশ্রুতিতে রূপ নিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বেসামরিক খরচের বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। প্রায় ২৬ হাজার ক্ষতিপূরণের দাবি জমা পড়েছে, যার পরিমাণ ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন শেকেলের মধ্যে। এই অর্থ মূলত ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, অবকাঠামো এবং ব্যক্তিগত সম্পদের জন্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আরও বড় একটি খরচ হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তা। রাজস্ব কমে যাওয়ার কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাদের জন্য অনুদান ও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে–যা ইতিমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। সব মিলিয়ে বেসামরিক খাতে ব্যয় ৮ বিলিয়ন শেকেল ছাড়িয়ে গেছে।
এই দুই খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন শেকেল বা ১৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই সংখ্যা স্থির নয়–বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, বর্তমান ব্যয় কেবল একটি মধ্যবর্তী হিসাব, চূড়ান্ত নয়।
অর্থনীতির ওপর এই চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যবসায়িক আচরণের পরিবর্তন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে তারা সরকারি ক্ষতিপূরণের জন্য যোগ্য হয়। এই প্রবণতা অর্থনীতিতে একটি ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করছে, যেখানে সরকারি সহায়তা পাওয়ার জন্য বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা বাড়াতে পারে।
একইসঙ্গে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে। শিল্প উৎপাদন, পরিষেবা খাত, এমনকি প্রযুক্তি খাতেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়, বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদাও কমে যায়। ফলে, অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার মন্তব্য এই পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়–বর্তমানে কিছু আর্থিক ‘সেফটি মার্জিন’ থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সালের বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে। অর্থাৎ, সরকারকে হয়ত অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে অথবা কর বাড়াতে হবে, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
এখানে একটি বৃহত্তর প্রশ্নও উঠে আসে–যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য কী ছিল এবং তা কতটা অর্জিত হয়েছে? যদি লক্ষ্য ছিল দ্রুত রাজনৈতিক বা সামরিক ফলাফল অর্জন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের এই ধারা সেই কৌশলের সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে। একটি যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়, তার অর্থনৈতিক খরচ ততই জ্যামিতিক হারে বাড়ে, এবং সেই খরচ শুধু অর্থনীতির ওপর নয়, সমাজ ও রাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই ব্যয় ইসরায়েলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব ফেলবে। ইসরায়েল একটি প্রযুক্তিনির্ভর, উচ্চ-উন্নত অর্থনীতি, যেখানে প্রতিরক্ষা খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বেসামরিক খাতের অবদানই মূল চালিকাশক্তি। যদি যুদ্ধের কারণে এই খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে, বেকারত্ব বাড়তে পারে এবং সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় কেবল একটি সংখ্যা নয়–এটি একটি সতর্ক সংকেত। এটি দেখায় যে আধুনিক যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং অর্থনৈতিক সহনশীলতারও পরীক্ষা। ইসরায়েল এই পরীক্ষায় কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের দৈর্ঘ্য, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট– যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তার মূল্য ততই বাড়বে। এবং সেই মূল্য শুধু অর্থে নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতায়ও পরিমাপ করতে হবে।