ads

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যেও দুশ্চিন্তা, যুক্তরাষ্ট্রেও– কারণ কী?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যেও দুশ্চিন্তা, যুক্তরাষ্ট্রেও– কারণ কী?
যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি প্রিন্স সালমানের ঘনিষ্ঠতা পুরোনো। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই চুক্তি কার্যকর হলে সৌদি আরব বেসামরিকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বেশ কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতা এবং আশেপাশের দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এখন পর্যন্ত কী ঘটেছে?

Advertisement

বেসরকারিভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সৌদি আরব যাতে মার্কিন প্রযুক্তি পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো যাতে সৌদি পারমাণবিক প্রকল্পে কাজ করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ বহু বছর ধরে একটি চুক্তির কথা বলে আসছে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মতো অশান্ত এলাকায় পারমাণবিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে– এমন শঙ্কা সবসময়ই ছিল।

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করা অন্য দেশগুলোর মতোই সৌদি আরবও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা পরমাণু বোমা বানাবে না এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের কাজ করতে দেবে। তবুও যুক্তরাষ্ট্র সবসময় অতিরিক্ত নিরাপত্তার শর্ত জুড়ে দিতে চায়।

ট্রাম্প প্রশাসন বুধবার জানায়, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে। আইনপ্রণেতারা চাইলে ৯০ দিনের মধ্যে এটি আটকে দিতে পারেন, তবে সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন লাগবে।

পারমাণবিক বোমা বানাতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং নিউক্লিয়ার চুল্লিতে ব্যবহৃত জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সৌদি আরবের সাথে হওয়া এই চুক্তিতে রিয়াদকে এ দুটি কাজ থেকে থামানোর কোনো কড়া শর্ত রাখা হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের বাড়তি নজরদারির শর্তও নেই চুক্তিতে।

এই ছাড়ের ফলে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশগুলো শঙ্কায় পড়তে পারে। এর পাশাপাশি মার্কিন নীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজি না হওয়ার অজুহাত দেখিয়েই এ বছর তাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন কংগ্রেসেও এ চুক্তি নিয়ে আপত্তি উঠেছে। অনেক আইনপ্রণেতাই আগে থেকে দাবি তুলেছিলেন যে, সৌদি আরবকে এই প্রযুক্তি দিতে হলে চুক্তিতে অবশ্যই কঠোর বিধিনিষেধ থাকতে হবে।

সৌদি আরব কেন পারমাণবিক শক্তি চায়?

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানি করা দেশ হিসেবে সৌদি আরবের পারমাণবিক শক্তির দরকার পড়াটা অবাক করার মতো মনে হতে পারে। তবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা ক্ষতিকর গ্যাস কমানোর পাশাপাশি আরও বেশি তেল বাইরে রপ্তানি করতে চায়।

বর্তমানে সৌদিতে মূলত তেল ও গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য তেল খরচ কমবে, যা দিয়ে পানি থেকে লবণ আলাদা করা এবং এসি চালানোর মতো কাজে খরচ বাঁচানো যাবে। এতে করে উদ্বৃত্ত তেল বিক্রি করে দেশটির আয় আরও বাড়বে।

তবে সৌদি আরব এ কথাও বলেছে যে, তাদের পুরোনো শত্রু দেশ ইরান যদি পারমাণবিক বোমা বানায়, তবে তারাও বানাবে। এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, তবে এতে সৌদির নিজেদের পারমাণবিক উদ্দেশ্য নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “এই চুক্তির ফলে এ অঞ্চলে পারমাণবিক বোমা বানানোর প্রতিযোগিতা শুরু হবে, যার কারণে ইরানেরও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ছোট করে আনার কোনো তাড়ণা আর থাকবে না।”

পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে– এমন অনেক দেশই কিন্তু নিজের দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে না; তারা অন্য দেশ থেকে জ্বালানি কিনে এনে পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহার করে।

কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরব জানায়, তারা নিজেদের দেশেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে। এই প্রক্রিয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুতের জ্বালানি ‘ইয়েলোকেক’ তৈরি করা যায়, যা পরে বিক্রিও সম্ভব। যদিও একই প্রযুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও কাজে লাগানো যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের এখানে লাভ কী?

চুক্তিটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের সুবিধাই হতে পারে।

ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সেই চুক্তিতে সৌদি আরবকে রাজি করাতে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তির প্রলোভনও দেওয়া হয়েছিল।

তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ইসরায়েল-সৌদির সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এখন আর যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির এই বেসামরিক পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তবে এই পারমাণবিক চুক্তিটি সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সাহায্য করতে পারে। অবশ্য ফিলিস্তিনকে পৃথক রাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক না গড়ার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়ে দিয়েছে রিয়াদ।

একটি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সৌদিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানোর বড় বড় কাজ বা চুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। পাশাপাশি, রিয়াদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজর রাখার সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র, যার ফলে সৌদি আরব পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলল কি না– এই শঙ্কা অনেকটা কমে যাবে।

১৯৫৪ সালের মার্কিন পরমাণু শক্তি আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, অন্য যেকোনো দেশের সাথে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত বড় চুক্তি করার সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। যেসব দেশ এই প্রযুক্তি পাচ্ছে, তারা যেন এটি দিয়ে অস্ত্র বানাতে না পারে বা স্পর্শকাতর উপাদান অন্য কোথাও সরাতে না পারে, সে জন্য এই আইনে ৯টি শর্ত দেওয়া আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের যেকোনো চুক্তি শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে খতিয়ে দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সৌদি আরবের সামনে অন্য পথও খোলা আছে

শেষ মুহূর্তে এসেও যদি যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি চুক্তিটি ভেস্তে যায়, তাহলেও সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার মতো বিকল্প রয়েছে। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শিল্পে এগিয়ে থাকা বেশ কয়েকটি দেশ এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে অথবা তাদের সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার কর্পোরেশন’ (সিএনএনসি) সৌদিতে একটি পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রস্তাব জমা দিয়েছিল।

মিশরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাতমও রিয়াদের সাথে প্রাথমিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছে সাউথ কোরিয়া (যারা পার্শ্ববর্তী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে রিয়্যাক্টর তৈরি করেছে) এবং ফ্রান্স।

সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত কোন দেশকে তাদের পারমাণবিক অংশীদার হিসেবে বেছে নেবে, তা নির্ভর করবে ওই দেশ প্রযুক্তিগত দক্ষতা, অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের শর্তাবলীসহ অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর।

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ

এই আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ওয়াশিংটন সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করতে রাজি হবে কি না, হলে কখন করবে এবং এতে সৌদি কর্মচারীদের প্রবেশের অনুমতি থাকবে নাকি কেন্দ্রটি ‘ব্ল্যাক বক্স’ ব্যবস্থার অধীনে সম্পূর্ণভাবে মার্কিন কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

সৌদি আরবের নিজস্ব মাটিতে পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম আকরিকের মজুত আছে। সে কারণে তাত্ত্বিকভাবে এই শঙ্কাটা থেকে যায় যে, চুক্তিতে কঠোর সুরক্ষাকবচ না থাকলে, সৌদি আরব এই সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ব্যবহার করে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করতে পারে। এটি পর্যাপ্ত পরিমাণে শোধন করা গেলে তা দিয়ে পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি সম্ভব।

একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি পারমাণবিক জ্বালানি চক্র (যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অন্তর্ভুক্ত) সংক্রান্ত সহযোগিতার আইনি পথ খুলে দেয়। তবে এটি ওয়াশিংটনকে এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি বা সক্ষমতা সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তরে বাধ্য করে না।

এর পেছনে কূটনৈতিক জটিলতাও রয়েছে! মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র দেশ ইসরায়েল বারবারই সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির এই ধারণার বিরুদ্ধে তাদের আপত্তির কথা জানিয়ে আসছে।

সম্পর্কিত