গণতন্ত্র ‘পুনরুদ্ধারে’ বাংলাদেশের নতুন সরকারের কী করা উচিত
চরচা ডেস্ক
গণতন্ত্র ‘পুনরুদ্ধারে’ বাংলাদেশের নতুন সরকারের কী করা উচিত
চরচা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৯: ৫৬
তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
২০২৪ সালে বিক্ষোভের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
গত দেড় বছরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করে। এ সময় ১৯৭২ সালের সংবিধানের সংশোধনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ প্রণয়ণ করে। এতে নাগরিক অধিকারের স্পষ্ট উল্লেখ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন এবং আরও কঠোর নজরদারি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদকে দেশের নতুন সংবিধান হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি ব্যাপক আর্থিক সহায়তা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওপর জনমনে জমে থাকা বিক্ষোভও দলটির জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এখন ক্ষমতায় এসে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জুলাই সনদে উল্লেখ করা সংস্কারগুলোর বাস্তবায়ন।
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, নতুন সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে কতটা আগ্রহী ও সক্ষম হবে, তার ওপরই নির্ভর করতে পারে বাংলাদেশে উদার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি সূচকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। ১৯৯৫ সালের পর থেকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কোনো দেশেই রাজনৈতিক স্বাধীনতায় এত বড় পতন দেখা যায়নি, বিশেষ করে ২০০০-এর দশকের শেষ দিক থেকে রাজনৈতিক অধিকার ও আইনসভার ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অবনতি লক্ষ্য করা গেছে।
আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৯৫ সালের পর থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতায় বিশ্বে সপ্তম বৃহত্তম অবনমন ঘটেছে বাংলাদেশে। এর ফলে দুর্নীতি আরও বিস্তার করেছে।
নতুন সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে পারে–এটাই এখন বড় প্রশ্ন। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি সূচক অনুযায়ী, একটা দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জুলাই সনদে উল্লেখ করা বিচার, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত সংস্কার বাস্তবায়ন বিএনপির জাতীয় সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
নেপালের অভিজ্ঞতা: সংবিধান সংস্কারের কঠিন বাস্তবতা
বিশ্বের অনেক দেশ—যেমন ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও তিউনিসিয়া নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে। তবে কার্যকর বাস্তবায়ন কতটা কঠিন, তা দেখতে বাংলাদেশকে খুব দূরে তাকাতে হবে না, নেপালের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, নেপাল ২০১৫ সালে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নতুন সংবিধান গ্রহণ করলেও কিছু মৌলিক মিল রয়েছে। বাংলাদেশের জুলাই সনদের মতোই নেপালের সংবিধান দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা চালু করে। দুর্নীতি ও সীমিত রাজনৈতিক স্বাধীনতার অতীত থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই এটা করা হয়েছিল।
শুরুতে নেপালকে গণতন্ত্রের সফল উদাহরণ হিসেবেও দেখা হয়েছিল। ২০০৬ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধান এবং ২০১৫ সালের স্থায়ী সংবিধান দেশটিকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়।
তবে বেশি অধিকার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেন-জিদের গণআন্দোলনে সরকার পতন ঘটে। সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ছিল এই বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব নিয়ে অসন্তোষ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন নেতৃত্বকে, যার অগ্রভাগে রয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার বালেন শাহ।
এ অভিজ্ঞতা দেখায়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে জনসন্তুষ্টি মূলত অর্থনৈতিক সুযোগের ওপর নির্ভরশীল। দুর্নীতির ধারণা ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি একসঙ্গে থাকলে তা অস্থিরতার জন্ম দেয়।
নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, বাংলাদেশ ও নেপালের পরিস্থিতি এক নয়। তবে বিএনপির উচিত প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। শেখ হাসিনা সরকারের সময় গণতান্ত্রিক ঘাটতিগুলো যে বিষয়গুলো সামনে এনেছে, সেগুলোর সঙ্গে এই শিক্ষা মিলিয়ে দেখলে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা তৈরি হতে পারে।
জুলাই সনদের সব সংস্কারই বাস্তবায়ন করা জরুরি, তবে বিশেষভাবে দুটি বিষয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া। বর্তমানে আইনগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকা দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা এবং সনদের দুর্নীতিবিরোধী ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে ৭২, ৭৩ ও ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোম্পানি, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশনের মালিকানা প্রকাশ, রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধিদের নিজের ও পরিবারের আয়-সম্পদ নির্বাচন কমিশনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এতে সরকারের প্রতি জনআস্থা বাড়বে এবং জনঅসন্তোষ কমবে।
দ্বিতীয়ত, জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রক্রিয়া পরিবর্তন। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার অপব্যবহার অতীতে গণতন্ত্র ক্ষয়ের একটি বড় কারণ ছিল। তাই শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধী দলের নেতার তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের পরামর্শ, এই সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধির পদক্ষেপের সঙ্গে সমন্বয় করে বিএনপি জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে পারে।
তবে নেপালসহ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা আইনের শাসন যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করাও সমান জরুরি। একই সঙ্গে সূচকগুলো দেখায়, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর চালিকাশক্তি।
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, বিএনপির অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। তা সত্ত্বেও স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের অস্থিরতা এড়াতে এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হতে পারে বাংলাদেশ।
তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
২০২৪ সালে বিক্ষোভের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এই নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
গত দেড় বছরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করে। এ সময় ১৯৭২ সালের সংবিধানের সংশোধনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ প্রণয়ণ করে। এতে নাগরিক অধিকারের স্পষ্ট উল্লেখ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন এবং আরও কঠোর নজরদারি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদকে দেশের নতুন সংবিধান হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
মার্কিন থিংকট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি ব্যাপক আর্থিক সহায়তা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওপর জনমনে জমে থাকা বিক্ষোভও দলটির জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এখন ক্ষমতায় এসে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, জুলাই সনদে উল্লেখ করা সংস্কারগুলোর বাস্তবায়ন।
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, নতুন সরকার এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে কতটা আগ্রহী ও সক্ষম হবে, তার ওপরই নির্ভর করতে পারে বাংলাদেশে উদার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি সূচকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। ১৯৯৫ সালের পর থেকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কোনো দেশেই রাজনৈতিক স্বাধীনতায় এত বড় পতন দেখা যায়নি, বিশেষ করে ২০০০-এর দশকের শেষ দিক থেকে রাজনৈতিক অধিকার ও আইনসভার ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অবনতি লক্ষ্য করা গেছে।
আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৯৫ সালের পর থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতায় বিশ্বে সপ্তম বৃহত্তম অবনমন ঘটেছে বাংলাদেশে। এর ফলে দুর্নীতি আরও বিস্তার করেছে।
নতুন সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে পারে–এটাই এখন বড় প্রশ্ন। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফ্রিডম অ্যান্ড প্রসপারিটি সূচক অনুযায়ী, একটা দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জুলাই সনদে উল্লেখ করা বিচার, নির্বাচন ও নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত সংস্কার বাস্তবায়ন বিএনপির জাতীয় সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
নেপালের অভিজ্ঞতা: সংবিধান সংস্কারের কঠিন বাস্তবতা
বিশ্বের অনেক দেশ—যেমন ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও তিউনিসিয়া নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে। তবে কার্যকর বাস্তবায়ন কতটা কঠিন, তা দেখতে বাংলাদেশকে খুব দূরে তাকাতে হবে না, নেপালের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: ফেসবুক
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, নেপাল ২০১৫ সালে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নতুন সংবিধান গ্রহণ করলেও কিছু মৌলিক মিল রয়েছে। বাংলাদেশের জুলাই সনদের মতোই নেপালের সংবিধান দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা চালু করে। দুর্নীতি ও সীমিত রাজনৈতিক স্বাধীনতার অতীত থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্যই এটা করা হয়েছিল।
শুরুতে নেপালকে গণতন্ত্রের সফল উদাহরণ হিসেবেও দেখা হয়েছিল। ২০০৬ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধান এবং ২০১৫ সালের স্থায়ী সংবিধান দেশটিকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়।
তবে বেশি অধিকার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জেন-জিদের গণআন্দোলনে সরকার পতন ঘটে। সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ছিল এই বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব নিয়ে অসন্তোষ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে নতুন নেতৃত্বকে, যার অগ্রভাগে রয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার বালেন শাহ।
এ অভিজ্ঞতা দেখায়, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে জনসন্তুষ্টি মূলত অর্থনৈতিক সুযোগের ওপর নির্ভরশীল। দুর্নীতির ধারণা ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি একসঙ্গে থাকলে তা অস্থিরতার জন্ম দেয়।
নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, বাংলাদেশ ও নেপালের পরিস্থিতি এক নয়। তবে বিএনপির উচিত প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। শেখ হাসিনা সরকারের সময় গণতান্ত্রিক ঘাটতিগুলো যে বিষয়গুলো সামনে এনেছে, সেগুলোর সঙ্গে এই শিক্ষা মিলিয়ে দেখলে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা তৈরি হতে পারে।
জুলাই সনদের সব সংস্কারই বাস্তবায়ন করা জরুরি, তবে বিশেষভাবে দুটি বিষয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া। বর্তমানে আইনগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকা দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা এবং সনদের দুর্নীতিবিরোধী ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে ৭২, ৭৩ ও ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোম্পানি, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশনের মালিকানা প্রকাশ, রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধিদের নিজের ও পরিবারের আয়-সম্পদ নির্বাচন কমিশনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এতে সরকারের প্রতি জনআস্থা বাড়বে এবং জনঅসন্তোষ কমবে।
দ্বিতীয়ত, জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রক্রিয়া পরিবর্তন। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার অপব্যবহার অতীতে গণতন্ত্র ক্ষয়ের একটি বড় কারণ ছিল। তাই শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধী দলের নেতার তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের পরামর্শ, এই সংস্কারগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধির পদক্ষেপের সঙ্গে সমন্বয় করে বিএনপি জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে পারে।
তবে নেপালসহ অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা আইনের শাসন যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করাও সমান জরুরি। একই সঙ্গে সূচকগুলো দেখায়, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উদারীকরণ দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর চালিকাশক্তি।
আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, বিএনপির অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। তা সত্ত্বেও স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের অস্থিরতা এড়াতে এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হতে পারে বাংলাদেশ।