নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যার পর সীমান্তের দুই পাশেই উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই দুর্যোগটি কীভাবে সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ নিয়ে দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিবিসির চায়না করেসপন্ডেন্ট লরা বিকারের একটি প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন বন্যার ভিডিওগুলোতে সেন্সরশিপ আরোপ করছে। ওই প্রতিবেদনকে ঘিরেই বিভিন্ন দাবি ও পাল্টা দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক আরও জোরাল হয়েছে।
বিকার বলেন, সীমান্তের গিরং বন্দরের ওপর দিয়ে ভূমিধস ও বন্যার পানির ঢল নেমে আসার ভিডিওগুলো ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর একটি কারণ ছিল, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল তিব্বত অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বেইজিংয়ের রয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী বিবিসির প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ভিডিওটির স্ক্রিনশট পোস্ট করে দাবি করেন, ওই ফুটেজ আসলে চীনের গণমাধ্যমেও প্রচার করা হয়েছিল। এক চীনা সাংবাদিক বিষয়টি নিয়ে সরাসরি বলেন, “বিবিসিকে এত স্পষ্টভাবে গুজব ছড়াতে আগে কখনো দেখিনি।”
অন্যদিকে, এক্স-এর আরেক ব্যবহারকারী বলেন, চীনের সেন্সরশিপ নিয়ে এ ধরনের উত্তপ্ত বিতর্কে “মধ্যম অবস্থান বা ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই হারিয়ে যায়।”চীনা সরকার দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তিব্বত নিয়ে প্রতিবেদনের সময় ‘পক্ষপাতে’র অভিযোগ করে আসছে। চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমর্থকেরাও এই বক্তব্য আরও জোরালভাবে তুলে ধরেছেন। তাদের সমালোচনার মূল লক্ষ্য ছিল বিবিসি।
তবে চীনের ভেতরে ও বাইরে থাকা চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই তথ্যের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ দেখে আসছেন। এবারের বন্যার পরও অভিজ্ঞতাটা নিশ্চিতভাবেই একই ছিল। বিকার তার প্রতিবেদনে যে বিষয়টির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন, তা হলো গিরং বন্দরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশাল কাদা ও পানির ঢলের ভিডিওগুলো মুছে ফেলা। ভিডিওগুলো প্রথমে উইশিন ও রেডনোট প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরে ব্যবহারকারীরা আর সেগুলো দেখতে পারেননি।
তথ্য নিয়ন্ত্রণের আরেকটি দিক হলো স্বাধীন ও বিদেশি সাংবাদিকদের তিব্বতে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের সাংবাদিক অ্যালিসন হর্ন বলেন, তিব্বতে যাওয়ার জন্য তিনি বারবার আবেদন করলেও অনুমতি পাননি। অন্য বিদেশি সাংবাদিকদেরও একইভাবে সেখানে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ফলে তিব্বতে আসলে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে চীনা সরকারের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিদেশি গণমাধ্যমের জন্য কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্বাধীন প্রতিবেদন না থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার ফলে ঘটনাটি নিয়ে বয়ান নির্ধারণে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এটি চীনা গণমাধ্যমের দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতাও তুলে ধরে। তা হলো- সামাজিক অস্থিরতা বা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, এমন বিষয় এড়িয়ে চলা।
তিব্বতের বন্যা নিয়ে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মির উদ্ধার অভিযান, সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্ব এবং দুর্যোগকবলিত এলাকা পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সফর। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু করা এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিষয়েও কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় গ্রামবাসী, তাদের ঘরবাড়ি ও জনপদের ওপর এই দুর্যোগের কী প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে অনেক কম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, সীমান্তের নেপাল অংশে বিদেশি সাংবাদিকরা কোনো বাধা ছাড়াই বেঁচে যাওয়া মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে পেরেছেন।
সমালোচকদের আরেকটা অভিযোগ হলো, চীনা সরকার হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাও গোপন করছে। তবে এসব দাবি নিয়ে বিতর্কের একটি বড় সমস্যা হলো- দুর্যোগস্থলে প্রবেশের সুযোগ সীমিত থাকায় সমালোচকসহ বাইরের কেউই এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি।
চীনের গণমাধ্যমের পরিবেশ অতীতে সবসময় এতটা নিয়ন্ত্রিত ছিল না।
চীনে সরকারের বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ খুব সীমিত। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
২০০৮ সালের ১২ মে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প চীনের সিচুয়ান প্রদেশে আঘাত হানে। এতে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন এবং লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। ভূমিকম্পের পরপরই চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ব্যাপকভাবে সরাসরি সংবাদ প্রচার শুরু করে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এই কভারেজ চলতে থাকে। চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন নিয়মিত মৃতের সংখ্যা হালনাগাদ করে এবং উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তবে বিদেশি গণমাধ্যম প্রশ্ন তোলে, দুর্বল নির্মাণের কারণে স্কুল ভবন ধসে অনেক মানুষের প্রাণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঝরে পড়েছিল কি না। নিহতদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে কি না, তা নিয়েও বিদেশি সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তোলেন। চীনা গণমাধ্যমও এসব বিতর্কের কিছু বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল। এর মধ্যে স্কুল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করেছিল কি না, সেই প্রশ্নও ছিল।
শুরুতে এই ভূমিকম্পের সংবাদ যেভাবে প্রচার করছিল চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মাধ্যম, সেটা চীনা গণমাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যমও ‘নজিরবিহীন খোলাখুলি ভাবে’র কথা তুলে ধরেছিল ব্যাপকভাবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সরকার স্কুল ভবন নিয়ে তথ্য প্রকাশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শুরু করে। কারণ, এই বিষয়টি সরকারবিরোধী মনোভাব উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
সাধারণভাবে যা দেখা যায় তা হলো, কোনো সংকটের সময় চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোকে ইতিবাচক সংবাদকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সময়ে অনলাইনে সরকারের পদক্ষেপ বা দায় নিয়ে সমালোচনা থাকলে সেগুলো সেন্সর করে সরিয়ে দেওয়া হয়। ২০১১ সালে ওয়েনঝৌ শহরে একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার সংবাদ প্রচার ছিল এর একটি ভালো উদাহরণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, সিচুয়ান ভূমিকম্পের তুলনায় ওই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সরকার গণমাধ্যমে কী প্রকাশ করা যাবে, তার ওপর অনেক বেশি কঠোর নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল। কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে ঘটনাস্থলে সাংবাদিক পাঠাতে নিষেধ করে, প্রতিবেদন প্রকাশের সংখ্যাও সীমিত করে এবং উচ্চগতির রেলব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে দুর্ঘটনাটিকে যুক্ত না করার নির্দেশ দেয়। সাংবাদিকদের দুর্ঘটনার কারণ বা এর প্রভাব নিয়ে অনুসন্ধান করতেও নিষেধ করা হয়। এমনকি ঘটনা নিয়ে ব্যক্তিগত মাইক্রোব্লগে পোস্ট না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এর পরিবর্তে সাংবাদিকদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের ‘অনুপ্রেরণামূলক’ গল্প খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করা হয়, যেমন স্থানীয় মানুষের রক্তদান। এর উদ্দেশ্য ছিল দুর্যোগের পর মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সহমর্মিতার অনুভূতি তৈরি করা।
২০১২ সালে সি চিনপিং ক্ষমতায় আসার পর তার সরকারের শাসনের জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে। এর ফলে চীনের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়। তিব্বতের বন্যা নিয়ে গণমাধ্যমের বর্তমান ভূমিকা সেই একই ধারা অনুসরণ করছে—সীমিত সংবাদ প্রকাশ এবং ইতিবাচক খবরের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
তাছাড়া নেপাল ও তিব্বতে এই দুর্যোগ হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে অবিশ্বাস দিন দিন বাড়ছে। ফলে সংবাদ প্রতিবেদন পক্ষপাতদুষ্ট- এমন ধারণাও আরও জোরাল হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্যোগের স্থল কিংবা প্রত্যক্ষ তথ্য দেওয়ার মতো উৎসগুলোর কাছে পৌঁছানোর পথে লজিস্টিক্যাল সমস্যা, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
চীনের বিধিনিষেধের কারণে পশ্চিমা সাংবাদিকদের পক্ষে সেখানে কী ঘটছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে তথ্যের যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, সেটা পশ্চিমে সন্দেহ আরও বাড়াচ্ছে এবং চীনা গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন নিয়ে সমালোচনাকে আরও জোরাল করছে।
আবার সেই সমালোচনাই উল্টোদিকে বেইজিংয়ের এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে যে, তিব্বত নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন সব সময়ই পক্ষপাতদুষ্ট। আর চীনা কর্তৃপক্ষের এই ধারণা যত পোক্ত হতে থাকবে, ততই তথ্যের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণ খুঁজে পাবে তারা।