ব্রিটিশ এমপি ও লেবার পার্টির নেতা স্টিভ ইয়েম চলতি বছরের জুনে তার সহকর্মী এমপিদের সামনে ‘একটি মৌলিক প্রশ্ন’ তুলেছিলেন। ইয়েম বলেছিলেন, “কে আসলে কাকে প্রভাবিত করছে? প্রযুক্তি কি সমাজের সেবা করছে, নাকি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বার্থে সমাজকেই নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে?”
তবে সেদিনের বক্তব্যে প্রযুক্তির প্রভাব যে এতটা গভীর ছিল, তা উপস্থিত অনেকেই হয়তো বুঝতে পারেননি। মজার বিষয় হলো - এআই ব্যবহার করে লেখা শনাক্ত করার একটি প্রযুক্তি যার নাম প্যাংগ্রাম সেদিনের ইয়েমের বক্তব্যটিকে সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত বলে শনাক্ত করেছে। বলছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।
তবে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো ইয়েম কিন্তু তার এই যান্ত্রিক সহ-লেখকের কথা খোলাখুলিভাবেই স্বীকার করেন। তিনি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “আমার কার্যালয়ে সংসদের নিয়ম মেনে বিভিন্ন কাজের জন্য সাধারণ এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।” এর মধ্যে বক্তৃতা তৈরি করাও রয়েছে। অবশ্য এমন ঘটনা শুধু তার ক্ষেত্রেই প্রথম নয়।
দ্য ইকোনমিস্ট প্যানগ্রাম এআই ডিটেক্টর ব্যবহার করে দেখেছে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্কে বলা প্রতি ১০টি শব্দের মধ্যে একটি এআইয়ের সাহায্যে লেখা। ২০২৪ সালে এই হার প্রায় শূন্য ছিল। এখন তা বাড়ছে। তবে অধিকাংশ এমপি এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করতে চান না। পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি এআই ব্যবহার করা এমপিদের অনেকেই এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং তা অস্বীকার করেছেন।
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ব্রিটেনেই নয়, অন্য দেশগুলোর আইনসভাতেও এআই ব্যবহার বাড়ছে। ইংরেজিভাষী দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার এমপিরা সবচেয়ে বেশি এআই ব্যবহার করছেন। তাদের বক্তব্যে ব্রিটিশ এমপিদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি এআইয়ের ব্যবহার পাওয়া গেছে । যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের হার খুব বেশি।
পুরোনো ধাঁচের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসেও হাউস অব কমন্সের চেয়ে বেশি এআই ব্যবহার হচ্ছে। নমুনায় থাকা আইনসভাগুলোর মধ্যে এআই ব্যবহারের হার সবচেয়ে কম ছিল নিউজিল্যান্ডের হাউস ও যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। দেশটির দৈনিক পত্রিকা ভল্কস্ক্রান্ট জানায়, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক পোস্ট এআই দিয়ে লেখা হয়েছিল। এর মধ্যে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে দেওয়া একটি পোস্ট এবং ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য ক্ষমা চেয়ে দেওয়া একটি পোস্টও ছিল। তবে ইয়েটেন এ নিয়ে ক্ষমা চাননি। তিনি বরং এআই ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান।
সম্প্রতি আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নরওয়ের পার্লামেন্টে প্রস্তাব করা আইনগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশে এআই দিয়ে তৈরি লেখা ছিল।
এখন এআই দিয়ে লেখা বক্তব্য সহজেই বোঝা যায়। চ্যাটবটগুলো একই ধরনের কিছু বাক্য বারবার ব্যবহার করে। যেমন, হিলসবোরো স্টেডিয়াম দুর্ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এক ব্রিটিশ এমপি বলেন, “এটি শুধু একটি ট্যাটু ছিল না, এটি ছিল একটি প্রতিশ্রুতি।”
এআই ডিটেক্টর শুধু অস্বাভাবিক বাক্য খুঁজে দেখে না। এগুলো বিপুল পরিমাণ লেখা বিশ্লেষণ করে কাজ করে। প্যানগ্রামের দাবি, এখন মানুষের লেখা ভুল করে এআই লেখা হিসেবে শনাক্ত করার ঘটনা ২৪ হাজারে মাত্র একটি।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও দীর্ঘ লেখার ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য ভুলের হার পেয়েছেন। পার্লামেন্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি চালুর আগে দেওয়া বক্তব্যগুলোর মধ্যে খুব কম সংখ্যককেই প্যানগ্রাম এআই লেখা হিসেবে শনাক্ত করেছে।
ব্রিটিশ এমপিদের অর্ধেকেরও বেশি তাদের বক্তব্য তৈরিতে খুব কমই এআই ব্যবহার করেন। তবে যারা ব্যবহার করেন, তারা সাধারণত নিয়মিতভাবে এটি ব্যবহার করেন । তাদের অনেকেই ২০২৪ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হওয়া নতুন এমপি।
দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি এআই ব্যবহার করেন ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির এমপি নীল শাস্ত্রী-হার্স্ট। গত এক বছরে তার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ এআই দিয়ে লেখা বলে শনাক্ত হয়েছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বতন্ত্র এমপি অ্যালেক্স ইস্টনও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। লেবার পার্টির স্টিভ ইয়েম ও সারা হলের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের হার বেশি।
সারা হল বলেন, “এআইকে একজন সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতেই পারে। তিনি বলেন, বক্তব্য লেখায় এআই ব্যবহার করে আধা ঘণ্টা সময় বাঁচাতে পারলে, সেই ৩০ মিনিট আমরা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে দিতে পারি।”
সাধারণ এমপিদের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্যে এআই ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। তবে মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে এআই ব্যবহারের ঘটনা খুব কম। কারণ তাদের বক্তব্য তৈরির জন্য বেশি কর্মী থাকে এবং এসব বক্তব্য আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। কেমি ব্যাডেনক, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, স্যার এড ডেভি, নাইজেল ফারাজ, জন হিলি বা এড মিলিব্যান্ডের কোনো বক্তব্যেই উল্লেখযোগ্য এআই ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই সতর্কতা সম্ভবত ভালোই। দ্য ইকোনমিস্টের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পাবলিক ফার্স্টের করা এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ ভোটাররা রাজনীতিবিদদের লেখা তৈরিতে এআই ব্যবহার একেবারেই পছন্দ করে না। তবে বিপণনকর্মী, সহকারী এমনকি শিক্ষকরা এআই ব্যবহার করলে তাতে তাদের আপত্তি তুলনামূলক কম।
ভোটাররা রাজনৈতিক লেখার অন্য যেকোনো ধরনের লেখার চেয়ে বক্তব্য তৈরিতে এআই ব্যবহার বেশি অপছন্দ করেন। এমনকি নিজ এলাকার মানুষের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের চেয়ে বক্তব্যে এআই ব্যবহার তাঁদের বেশি অপছন্দ।
এর পরেই রয়েছে এআই দিয়ে নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন লেখা। ওয়েস্টমিনস্টারেও এ ধরনের লেখা বেড়েছে। তবে কোন দলের নেতা এআই বেশি ব্যবহার করেন, তা নিয়ে বিভিন্ন দলের সমর্থকদের ধারণা আলাদা। লেবার, গ্রিন ও কনজারভেটিভ দলের সমর্থকদের ধারণা, বক্তব্যে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজের। অন্যদিকে রিফর্ম ইউকের সমর্থকদের ধারণা, সবচেয়ে বেশি এআই ব্যবহার করেন গ্রিন পার্টির জ্যাক পোলানস্কি।
রাজনীতিবিদ বা এআই, কোনোটিই যুক্তরাজ্যে খুব জনপ্রিয় নয়। তাই এই দুটিকে একসঙ্গে নিয়ে তৈরি এআই বক্তব্য নিয়ে মানুষের বিরক্তি খুব একটা আশ্চর্যের নয়। তবে ভোটারদের ক্ষোভও বোঝা যায়। ভোটাররা তাঁদের হয়ে পার্লামেন্টে কথা বলার জন্য প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেন। ‘পার্লামেন্ট’ শব্দটির উৎস ফরাসি শব্দ, যার অর্থ কথা বলার জায়গা।
পার্লামেন্টের বিতর্কগুলো খুব একটা জোরালো বক্তৃতার উদাহরণ নয়। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন ছোট ভিডিও তৈরির দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়। আর বক্তব্য লেখার কাজ সাধারণত কর্মীদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপরও যুক্তি তৈরি করে বক্তব্য লেখার কাজ এড়িয়ে গেলে এমপিদের যে কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, সেটিই ধীরে ধীরে এআইয়ের হাতে চলে যেতে পারে। আর এআই দিয়ে লেখা নিয়ে এই উদ্বেগ শুধু রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের স্পিচ রাইটার হিসেবে কাজ করা অ্যালান লকি বলেন, “অগোছালো বক্তব্য লেখা থেকে অগোছালো রাজনীতি তৈরি হবে।” তার মতে, “আমরা লেখার মাধ্যমে ধারণা মানুষের কাছে পৌঁছে দিই। এটি গুগল ম্যাপ বা অর্ডন্যান্স সার্ভের মতো বিষয় নয়। এখন এটি বড় বিষয়। আমাদের ঐতিহাসিক সংস্কৃতির জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করা অনেকে মনে করেন, রাজনীতি হয়তো এমন একটি বিরল পেশা, যেটিকে পুরোপুরি এআই দিয়ে করা সম্ভব নয়।