এমনিতে ‘পশ্চিম’ বা ‘পশ্চিমা’ বললে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ গোটা ইউরোপকেই বোঝায়। ‘ওয়েস্টার্ন’ শব্দটির সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা এবং এই শব্দের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োগটি এমনভাবেই করা হয়েছে যে, ইউরোপের সাবেক আভিজাত্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একীভূত করে নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ কাজটি বেশ সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের ক্ষয়ে যাওয়া ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর দুর্বল অর্থনীতির বিপরীতে নিজেদের প্রবল অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন হিসাবটা অনেকটাই বদলে গেছে।
২০০৮ সালের মহামন্দার কথা বারবারই ঘুরে আসে এ সম্পর্কিত আলোচনায়। কারণ, ঠিক সে সময়টাতেই পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বকাঠামোর অসুখটি ধরা পড়ে, যা বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার ধারণা এবং এর পাহারাদার হিসেবে ময়দানে থাকা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে একচেটিয়া করেছিল মার্কিন আধিপত্যকে। ঠিক সেই সময়েই গোটা বিশ্বের সামনে তথাকথিত ‘আমেরিকান ড্রিম’ ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। ডলার নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। আর এই সুযোগটিই লুফে নেয় প্রতিযোগী রাষ্ট্রগুলো।
২০০৯ ও এর পরবর্তী সময় বিশ্বরাজনীতিতে চিহ্নিত হয়ে আছে ব্রিক থেকে ব্রিকস এবং দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলোর পুনঃপুনঃ বৈঠক এবং মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতের নিজেদের সংহত করার সময় হিসেবে। এই সময়েই আমরা ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজকে দেখি বিশ্বমঞ্চে হাজির হয়ে জোরদার আলোচনা চালাতে। তার সঙ্গে তখন সংগত করেছেন রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতারা।
মার্কিন আধিপত্যের আনুগত্য থেকে কিছু আরব দেশের এমন নড়াচড়া যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সইতে পারেনি। এর ফল হিসেবেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি আরব স্প্রিং। এই সময় বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে এই গণবিক্ষোভ এবং সেখানে পোশাক বদলের মতো করে একের পর এক শাসক বদলের ঘটনা ঘটে, যার সর্বশেষ নজির হচ্ছে সিরিয়া। বলে রাখা ভালো সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ফিলিস্তিন ও ইরানকে ভীষণভাবে দুর্বল করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে হওয়া কালার রেভ্যুলিউশন শুধু দেশগুলোর শাসক বদলের লক্ষ্যে বা তথাকথিত ‘অপশাসন’ রোখার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়নি। এর সঙ্গে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব।
এর সঙ্গে মুদ্রার রাজনীতি ভীষণভাবে জড়িত। একটু ব্যাখ্যা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ঋণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের মাথায় এখন ৩৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা। আর এর বিপরীতের রাজস্ব আয় সেভাবে নেই। প্রতিবছরই দেশটিকে দিতে হয় ঘাটতি বাজেট। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ ব্যয় কমানো থেকে শুরু করে নানা দিক থেকে আয় বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে দেশটি।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ঋণ এবং সেই কারণে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি বাড়তে শুরু করে সেই ২০০৮ সালের পর থেকেই। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০০০ সালে এ ঘাটতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট ছিল। এর পরের বছর এ ঘাটতি পুষিয়ে ওঠে মার্কিন অর্থনীতি। কিন্তু তার পর থেকে আর নয়। ২০০৭ সালে এ ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্টে। এর পরের বছর এ ঘাটতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্টে চলে যায়। এর পর ২০১৫ সাল ছাড়া আর কোনো বছরই এ ঘাটতি এর নিচে নামেনি। ওই বছর এ ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৫ সালে এ ঘাটতি ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, ২০১৫ সালে মার্কিন অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে একটু আগেই উল্লিখিত আরব বসন্তের কথা মনে পড়বার কথা। হ্যাঁ, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ওলটপালট হয়েছে। ২০১১ সালের মধ্যেই তিউনেশিয়ায় বেন আলী, লিবিয়াতে মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং মিশরে হোসনি মোবারকের পতন হয়। এ নেতারাই ছিলেন শাভেজের সেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বহুজাতিক প্রচেষ্টার অংশ। উত্তাল সেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বাণিজ্যের পাশাপাশি তেলসম্পদ কবজা করা–দুইই চলেছে তখন সমানতালে। ২০১৭ সালে কাতার অবরোধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার অস্ত্র বাণিজ্যের আওতা আরও বর্ধিত করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়া ওলটপালট করে শুধু নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্যই নয়, নিজের টিকে থাকার জন্যও করে। কালার রেভ্যুলিউশন ছিল এবং এখনো আছে, সেই টিকে থাকার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। এখনো দেশে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মোড়কে বর্ণিল বিপ্লব রপ্তানি করছে দেশটি, যা মূলত তাদের আধিপত্য বিস্তার কিংবা তা রক্ষার স্বার্থেই পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে অনেক বিরোধের পরও দেশগুলোর বৃহত্তর জোট হিসেবে ব্রিকস গঠিত হয়েছে। এআইআইবি, সিএফআর ও এনডিবি গঠন হয়েছে। এর মধ্যে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক–এআইআইবি) বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১১০, যার সদর দপ্তর বেইজিংয়ে। শুধু তাই নয়, নামে এশীয় হলেও এই উদ্যোগের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে এশিয়ার ৪২, আফ্রিকার ২২, ওশেনিয়ার ১০, দক্ষিণ আমেরিকার ৮ এবং এমনকি ইউরোপের ২৬ ও উত্তর আমেরিকার ২টি দেশও। এই ব্যাংকের প্রাথমিক প্রস্তাবটিও কিন্তু এসেছিল ২০০৯ সালে। যদিও এটি বাস্তবে রূপ নেয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। ফলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই উদ্যোগগুলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন অর্থনৈতিক অস্ত্রাগারগুলোকে আতঙ্কিত করতে এবং তার প্রতিস্থাপন করতেই নেওয়া হয়েছে। এর ফল হিসেবেও কিন্তু রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন, চীনে শি জিনপিংয়ের উত্থানকে পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বা ২০০৮ সালের মন্দায় সিঁদুরে মেঘ দেখে বিশ্বের সাবেক ও উদীয়মান শক্তিগুলো একটি অযুক্তরাষ্ট্রীয় জোট গঠনের যে উদৌগ নেয়, তা এখন পর্যন্ত পূর্ণ সফল না হলেও ব্যর্থ একেবারেই নয়।
ফেরা যাক ঋণের আলাপে। আগেই বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ঋণের অঙ্ক ৩৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই ঋণের বোঝা নামিয়ে অর্থনীতির সুশ্রুষা করতে হলে তাকে আবার সম্পদ আহরণে নামতে হবে, নামতে হবে নিজের আধিপত্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন বাজার খোঁজার দিকেও। এ জন্য যেমন নৌবাণিজ্যে একচ্ছত্র হওয়া জরুরি, তেমনি জরুরি বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পদ করায়ত্ত করা–সেটা এবার বিদ্যমান জ্বালানি তেল, কয়লা ইত্যাদি হোক, কিংবা ভবিষ্যতের চালিকা শক্তি বিরল খনিজ।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ ও অঞ্চলে হাত না দিয়ে কোনো উপায় নেই। মুশকিল হলো গ্রিনল্যান্ড ও এর সন্নিহিত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ মাত্রই তা আটলান্টিক বিধৌত অঞ্চলের সামরিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক–সব ধরনের চুক্তিকে লঙ্ঘন করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের ভাবগতিক অনেকটা সে রকমই। বিশেষত ইউক্রেন ইস্যুতেই ইউরোপ সে বিষয়টি অনুধাবন করতে শুরু করে। সে বুঝে যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর চুক্তিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে সরে যাচ্ছে। নিজের অর্থনীতি তো বটেই, নিজের পিঠও তাকেই বাঁচাতে হবে। এরই ফল হিসেবে সামনে আসে পোল্যান্ডের পুনঃসামরিকীকরণের বিষয়টি। জার্মানির প্রেসিডেন্ট স্টেইনমায়ার যে ‘নিজের গড়া বিশ্বব্যবস্থা’ ভেঙে ফেলার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তুলছেন, তা এমনি এমনি নয়।
মোটাদাগে যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই সময়ের ইউরোপের মতো পুনঃভাগ্যান্বেষণে বের হয়েছে বলা যায়। প্রায় সুনিশ্চিত লক্ষ্য ঠিক করে, হামলে পড়াটা এখন খুবই সহজ। সেই সহজ কাজটিই সে করছে। এ যেন সেই অষ্টাদশ শতকের মসলার যুদ্ধ। শুধু আজকের দিনে মসলার জায়গাটি নিয়েছে বিরল খনিজের মতো বিষয়গুলো।
এ খেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীন, রাশিয়া তো আছেই, খুব শিগগিরই ইউরোপও হয়তো হাজির হবে। কারণ, যে ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও রাশিয়ার মতো ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তি থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্র উনিশ শতকের শুরুতে মনরো ডকট্রিন ঘোষণা করেছিল, তা খোলস পাল্টে নিজেই দানব হয়ে এখন ইউরোপকে গিলতে চাইছে। ফলে ইউরোপের পক্ষেও আর তখন নিজের পুরোনো আভিজাত্যের বয়ান হাজির না করা ছাড়া উপায় থাকবে না। অর্থাৎ, সভ্যতাকেন্দ্রিক বয়ানটি তখন আবার তারা সামনে আনতে শুরু করবে, যেমনটি চীন করছে, যেমনটি করছে রাশিয়া, ভারত, তুরস্কও। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বহু বছরের চেষ্টায় নানা গবেষণা মারফত নিজের অতীত খুঁড়ে পুরোনো সভ্যতার নজির হাজির করার চেষ্টা করছে। এ কারণেই, মায়া সভ্যতার বিস্তার ও এটি কতটা উন্নত ছিল, সেই বয়ানটি হাজির করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভীষণভাবে জরুরি হয়ে পড়ে।
গ্রিক বা রোমান সভ্যতাকেন্দ্রিকতা আর যাই হোক যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সেটা তারা পেয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বদৌলতে। ফলে মায়া সভ্যতাকেন্দ্রিক বয়ানের জোরদার প্রচার চালানো হয় প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে। কিন্তু হায়, গবেষণায় গুয়াতেমালা হয়ে মেক্সিকো সীমান্তে এসে মায়া সভ্যতার যাত্রা আপাতত থেমেছে। এখনো সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রবেশাধিকার ঘটেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এই সভ্যতাকেন্দ্রিক আভিজাত্য পুনরুৎপাদনের পথ এড়িয়ে বর্তমানে মনোযোগী হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে উত্তর-দক্ষিণ নির্বিশেষে গোটা আমেরিকাকে নিজের বলে দাবি করা একটি সহজ উপায়, যা একইসঙ্গে স্থল ও জলের মালিকানা এনে দেবে, সাথে দেবে সমরসজ্জা, তার প্রতিরক্ষায় দেশে দেশে পাল্টা সমরসজ্জা থেকে সম্ভাব্য অর্থ, আর অতি অবশ্যই সঙ্গত হয়ে থাকছে ভূ-অভ্যন্তরস্থ নানা খনিজের হাতছানি। আর্কটিকের গলতে থাকা বরফ তো তার চোখে এক মায়াঞ্জন এঁকে দিয়েছে। এ যেন সেই জাদুর তেল, যা একচোখে ঢেলে দুনিয়াদারির সম্পদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। মুশকিল হলো–অতি উত্তেজনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প না আবার দুই চোখেই জাদুর তেল দিয়ে বসেন। রূপকথা বলছে, তাহলেই কিন্তু অন্ধত্ব নিশ্চিত। ডনরো ডকট্রিন হয়ে সভ্যতাকেন্দ্রিক বিশ্বকাঠামো গড়ার যে চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু এই শঙ্কাকেই উসকে দিচ্ছে।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
এমনিতে ‘পশ্চিম’ বা ‘পশ্চিমা’ বললে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ গোটা ইউরোপকেই বোঝায়। ‘ওয়েস্টার্ন’ শব্দটির সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা এবং এই শব্দের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োগটি এমনভাবেই করা হয়েছে যে, ইউরোপের সাবেক আভিজাত্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একীভূত করে নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ কাজটি বেশ সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের ক্ষয়ে যাওয়া ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর দুর্বল অর্থনীতির বিপরীতে নিজেদের প্রবল অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন হিসাবটা অনেকটাই বদলে গেছে।
২০০৮ সালের মহামন্দার কথা বারবারই ঘুরে আসে এ সম্পর্কিত আলোচনায়। কারণ, ঠিক সে সময়টাতেই পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বকাঠামোর অসুখটি ধরা পড়ে, যা বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার ধারণা এবং এর পাহারাদার হিসেবে ময়দানে থাকা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে একচেটিয়া করেছিল মার্কিন আধিপত্যকে। ঠিক সেই সময়েই গোটা বিশ্বের সামনে তথাকথিত ‘আমেরিকান ড্রিম’ ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। ডলার নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। আর এই সুযোগটিই লুফে নেয় প্রতিযোগী রাষ্ট্রগুলো।
২০০৯ ও এর পরবর্তী সময় বিশ্বরাজনীতিতে চিহ্নিত হয়ে আছে ব্রিক থেকে ব্রিকস এবং দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলোর পুনঃপুনঃ বৈঠক এবং মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতের নিজেদের সংহত করার সময় হিসেবে। এই সময়েই আমরা ভেনেজুয়েলার হুগো শাভেজকে দেখি বিশ্বমঞ্চে হাজির হয়ে জোরদার আলোচনা চালাতে। তার সঙ্গে তখন সংগত করেছেন রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতারা।
মার্কিন আধিপত্যের আনুগত্য থেকে কিছু আরব দেশের এমন নড়াচড়া যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সইতে পারেনি। এর ফল হিসেবেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি আরব স্প্রিং। এই সময় বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে এই গণবিক্ষোভ এবং সেখানে পোশাক বদলের মতো করে একের পর এক শাসক বদলের ঘটনা ঘটে, যার সর্বশেষ নজির হচ্ছে সিরিয়া। বলে রাখা ভালো সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ফিলিস্তিন ও ইরানকে ভীষণভাবে দুর্বল করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে হওয়া কালার রেভ্যুলিউশন শুধু দেশগুলোর শাসক বদলের লক্ষ্যে বা তথাকথিত ‘অপশাসন’ রোখার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়নি। এর সঙ্গে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব।
এর সঙ্গে মুদ্রার রাজনীতি ভীষণভাবে জড়িত। একটু ব্যাখ্যা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ঋণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের মাথায় এখন ৩৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা। আর এর বিপরীতের রাজস্ব আয় সেভাবে নেই। প্রতিবছরই দেশটিকে দিতে হয় ঘাটতি বাজেট। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ ব্যয় কমানো থেকে শুরু করে নানা দিক থেকে আয় বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে দেশটি।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ঋণ এবং সেই কারণে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি বাড়তে শুরু করে সেই ২০০৮ সালের পর থেকেই। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০০০ সালে এ ঘাটতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট ছিল। এর পরের বছর এ ঘাটতি পুষিয়ে ওঠে মার্কিন অর্থনীতি। কিন্তু তার পর থেকে আর নয়। ২০০৭ সালে এ ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্টে। এর পরের বছর এ ঘাটতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্টে চলে যায়। এর পর ২০১৫ সাল ছাড়া আর কোনো বছরই এ ঘাটতি এর নিচে নামেনি। ওই বছর এ ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৫ সালে এ ঘাটতি ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, ২০১৫ সালে মার্কিন অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে একটু আগেই উল্লিখিত আরব বসন্তের কথা মনে পড়বার কথা। হ্যাঁ, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ওলটপালট হয়েছে। ২০১১ সালের মধ্যেই তিউনেশিয়ায় বেন আলী, লিবিয়াতে মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং মিশরে হোসনি মোবারকের পতন হয়। এ নেতারাই ছিলেন শাভেজের সেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বহুজাতিক প্রচেষ্টার অংশ। উত্তাল সেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বাণিজ্যের পাশাপাশি তেলসম্পদ কবজা করা–দুইই চলেছে তখন সমানতালে। ২০১৭ সালে কাতার অবরোধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার অস্ত্র বাণিজ্যের আওতা আরও বর্ধিত করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়া ওলটপালট করে শুধু নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্যই নয়, নিজের টিকে থাকার জন্যও করে। কালার রেভ্যুলিউশন ছিল এবং এখনো আছে, সেই টিকে থাকার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। এখনো দেশে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মোড়কে বর্ণিল বিপ্লব রপ্তানি করছে দেশটি, যা মূলত তাদের আধিপত্য বিস্তার কিংবা তা রক্ষার স্বার্থেই পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে অনেক বিরোধের পরও দেশগুলোর বৃহত্তর জোট হিসেবে ব্রিকস গঠিত হয়েছে। এআইআইবি, সিএফআর ও এনডিবি গঠন হয়েছে। এর মধ্যে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক–এআইআইবি) বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১১০, যার সদর দপ্তর বেইজিংয়ে। শুধু তাই নয়, নামে এশীয় হলেও এই উদ্যোগের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে এশিয়ার ৪২, আফ্রিকার ২২, ওশেনিয়ার ১০, দক্ষিণ আমেরিকার ৮ এবং এমনকি ইউরোপের ২৬ ও উত্তর আমেরিকার ২টি দেশও। এই ব্যাংকের প্রাথমিক প্রস্তাবটিও কিন্তু এসেছিল ২০০৯ সালে। যদিও এটি বাস্তবে রূপ নেয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। ফলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই উদ্যোগগুলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন অর্থনৈতিক অস্ত্রাগারগুলোকে আতঙ্কিত করতে এবং তার প্রতিস্থাপন করতেই নেওয়া হয়েছে। এর ফল হিসেবেও কিন্তু রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন, চীনে শি জিনপিংয়ের উত্থানকে পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক ঝুঁকি, বা ২০০৮ সালের মন্দায় সিঁদুরে মেঘ দেখে বিশ্বের সাবেক ও উদীয়মান শক্তিগুলো একটি অযুক্তরাষ্ট্রীয় জোট গঠনের যে উদৌগ নেয়, তা এখন পর্যন্ত পূর্ণ সফল না হলেও ব্যর্থ একেবারেই নয়।
ফেরা যাক ঋণের আলাপে। আগেই বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ঋণের অঙ্ক ৩৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই ঋণের বোঝা নামিয়ে অর্থনীতির সুশ্রুষা করতে হলে তাকে আবার সম্পদ আহরণে নামতে হবে, নামতে হবে নিজের আধিপত্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন বাজার খোঁজার দিকেও। এ জন্য যেমন নৌবাণিজ্যে একচ্ছত্র হওয়া জরুরি, তেমনি জরুরি বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পদ করায়ত্ত করা–সেটা এবার বিদ্যমান জ্বালানি তেল, কয়লা ইত্যাদি হোক, কিংবা ভবিষ্যতের চালিকা শক্তি বিরল খনিজ।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ ও অঞ্চলে হাত না দিয়ে কোনো উপায় নেই। মুশকিল হলো গ্রিনল্যান্ড ও এর সন্নিহিত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ মাত্রই তা আটলান্টিক বিধৌত অঞ্চলের সামরিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক–সব ধরনের চুক্তিকে লঙ্ঘন করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের ভাবগতিক অনেকটা সে রকমই। বিশেষত ইউক্রেন ইস্যুতেই ইউরোপ সে বিষয়টি অনুধাবন করতে শুরু করে। সে বুঝে যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর চুক্তিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমে সরে যাচ্ছে। নিজের অর্থনীতি তো বটেই, নিজের পিঠও তাকেই বাঁচাতে হবে। এরই ফল হিসেবে সামনে আসে পোল্যান্ডের পুনঃসামরিকীকরণের বিষয়টি। জার্মানির প্রেসিডেন্ট স্টেইনমায়ার যে ‘নিজের গড়া বিশ্বব্যবস্থা’ ভেঙে ফেলার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তুলছেন, তা এমনি এমনি নয়।
মোটাদাগে যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই সময়ের ইউরোপের মতো পুনঃভাগ্যান্বেষণে বের হয়েছে বলা যায়। প্রায় সুনিশ্চিত লক্ষ্য ঠিক করে, হামলে পড়াটা এখন খুবই সহজ। সেই সহজ কাজটিই সে করছে। এ যেন সেই অষ্টাদশ শতকের মসলার যুদ্ধ। শুধু আজকের দিনে মসলার জায়গাটি নিয়েছে বিরল খনিজের মতো বিষয়গুলো।
এ খেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীন, রাশিয়া তো আছেই, খুব শিগগিরই ইউরোপও হয়তো হাজির হবে। কারণ, যে ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও রাশিয়ার মতো ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তি থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্র উনিশ শতকের শুরুতে মনরো ডকট্রিন ঘোষণা করেছিল, তা খোলস পাল্টে নিজেই দানব হয়ে এখন ইউরোপকে গিলতে চাইছে। ফলে ইউরোপের পক্ষেও আর তখন নিজের পুরোনো আভিজাত্যের বয়ান হাজির না করা ছাড়া উপায় থাকবে না। অর্থাৎ, সভ্যতাকেন্দ্রিক বয়ানটি তখন আবার তারা সামনে আনতে শুরু করবে, যেমনটি চীন করছে, যেমনটি করছে রাশিয়া, ভারত, তুরস্কও। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বহু বছরের চেষ্টায় নানা গবেষণা মারফত নিজের অতীত খুঁড়ে পুরোনো সভ্যতার নজির হাজির করার চেষ্টা করছে। এ কারণেই, মায়া সভ্যতার বিস্তার ও এটি কতটা উন্নত ছিল, সেই বয়ানটি হাজির করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভীষণভাবে জরুরি হয়ে পড়ে।
গ্রিক বা রোমান সভ্যতাকেন্দ্রিকতা আর যাই হোক যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সেটা তারা পেয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বদৌলতে। ফলে মায়া সভ্যতাকেন্দ্রিক বয়ানের জোরদার প্রচার চালানো হয় প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে। কিন্তু হায়, গবেষণায় গুয়াতেমালা হয়ে মেক্সিকো সীমান্তে এসে মায়া সভ্যতার যাত্রা আপাতত থেমেছে। এখনো সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রবেশাধিকার ঘটেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এই সভ্যতাকেন্দ্রিক আভিজাত্য পুনরুৎপাদনের পথ এড়িয়ে বর্তমানে মনোযোগী হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে উত্তর-দক্ষিণ নির্বিশেষে গোটা আমেরিকাকে নিজের বলে দাবি করা একটি সহজ উপায়, যা একইসঙ্গে স্থল ও জলের মালিকানা এনে দেবে, সাথে দেবে সমরসজ্জা, তার প্রতিরক্ষায় দেশে দেশে পাল্টা সমরসজ্জা থেকে সম্ভাব্য অর্থ, আর অতি অবশ্যই সঙ্গত হয়ে থাকছে ভূ-অভ্যন্তরস্থ নানা খনিজের হাতছানি। আর্কটিকের গলতে থাকা বরফ তো তার চোখে এক মায়াঞ্জন এঁকে দিয়েছে। এ যেন সেই জাদুর তেল, যা একচোখে ঢেলে দুনিয়াদারির সম্পদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। মুশকিল হলো–অতি উত্তেজনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প না আবার দুই চোখেই জাদুর তেল দিয়ে বসেন। রূপকথা বলছে, তাহলেই কিন্তু অন্ধত্ব নিশ্চিত। ডনরো ডকট্রিন হয়ে সভ্যতাকেন্দ্রিক বিশ্বকাঠামো গড়ার যে চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু এই শঙ্কাকেই উসকে দিচ্ছে।