আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বমুখিতার প্রভাব, ভর্তুকির বাড়তি চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে এপ্রিল মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে কি না—তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
আজ মঙ্গলবার মার্চ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত সরকার চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। এই স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কার্যত সরকারের ভর্তুকির চাপ কমানোর একটি নীতি কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। তবে মার্চ মাসে এই নীতির ব্যতিক্রম দেখা যায়। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশে খুচরা পর্যায়ে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্চে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হলেও এর ফলে ভর্তুকির চাপ দ্রুত বেড়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে-এপ্রিল মাসে মূল্য সমন্বয় না করলে প্রতি মাসে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
বিপিসির হিসাবে, বর্তমানে ডিজেল আমদানিতে প্রতি লিটার খরচ পড়ছে প্রায় ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, যা বিদ্যমান খুচরা মূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে অকটেন ও পেট্রোলের কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দামও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি তেল বিক্রিতে লোকসান বাড়ছে।
মঙ্গলবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লোগ-সিপিডি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় বা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিপিসির পক্ষ থেকে মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব এসেছে এবং তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবে মূল্য অপরিবর্তিত রাখা, আংশিক বৃদ্ধি কিংবা ভর্তুকি সমন্বয়সহ একাধিক বিকল্প তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবণতা, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে প্রায় সারা বিশ্বে জ্বালানি নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা বাড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালীর মাধ্যমে সরবরাহ হয়। ফলে এ রুটে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। রাজধানীসহ সারা দেশেও পাম্পগুলোয় জ্বালানি তেল পেতে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে তেল মজুতের খবর পাওয় যাচ্ছে। মজুতদারি বন্ধ করতে সরকার অভিযান চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্য উৎস থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টাও করছে সরকার।
জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। তেল পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ছবি: চরচানির্ধারিত সময়ে কয়েকটি জ্বালানি কার্গো দেশে না পৌঁছানোয় মার্চ মাসে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। সরকারি হিসাবে, অকেটেনের দুটি বড় চালান এবং একাধিক ডিজেল কার্গো বিলম্বিত হয়েছে, যা বাজারে অস্থিরতা বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
তবে সরকার দাবি করছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। বরং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ মজুতদারির কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, এবং এই খাতে এখনো কোনো ঘাটতি নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে।
মার্চ মাসে সরবরাহ পরিস্থিতির পরিসংখ্যানও এই দাবির পক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে দৈনিক গড়ে ১২ হাজার ৭৭৭ টন ডিজেল সরবরাহ করা হলেও ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৫৭৭ টনে। একইভাবে অকটেন সরবরাহও বেড়েছে। যদিও পেট্রোলের ক্ষেত্রে সামান্য ওঠানামা রয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে সরবরাহ কমানো হয়নি বলে দাবি সরকারের।
গত রোজার ঈদকে সামনে রেখে জ্বালানি সরবরাহ আরও বাড়ানো হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক থাকে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক পাম্পে আগের তুলনায় অর্ধেক তেল দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মিত ট্যাংকার সরবরাহও পাওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিকে সরকার ‘চাহিদা সমন্বয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ভোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার করেছে। মার্চ মাসজুড়ে দেশব্যাপী তিন হাজারের বেশি অভিযানে প্রায় দুই লাখ আট হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ মজুত ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানাও করা হয়েছে। তথ্যদাতাদের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
চাহিদা নিয়ন্ত্রণে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের চিন্তা করা হচ্ছে, যাতে অপচয় কমে এবং সরবরাহে স্বচ্ছতা আসে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলসহ নির্দিষ্ট যানবাহনকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্য আনতেও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমদানি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ভারত থেকেও কিছু পরিমাণ ডিজেল ইতোমধ্যে আমদানি করা হয়েছে।
সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এপ্রিল মাসে বড় আকারের আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। ৩০ মার্চ ও ৩ এপ্রিল দুই দফায় প্রায় ৫৪ হাজার টনের বেশি জ্বালানি দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া পুরো এপ্রিলজুড়ে আরও প্রায় দেড় লাখ টনের বেশি জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মে ও জুন মাসের সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি একটি জটিল সমীকরণের দিকে ইঙ্গিত করছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বমুখী দাম ও সরবরাহ ঝুঁকি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে সরকারকে।
এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে কি না—এর সরাসরি উত্তর এখনো মেলেনি। তবে ভর্তুকির বাড়তি চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট জোরাল। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার—জনস্বার্থে দাম স্থিতিশীল রাখা, নাকি অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সমন্বয় করা—এই ভারসাম্যের ওপর।