মঙ্গলে একসময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ইতিমধ্যে নাসার একটি রোভারের সংগ্রহ করা পাথরের নমুনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। ৩০০ কোটি বছরেরও বেশি সময় আগে মঙ্গলের যে অঞ্চলে নদী প্রবাহিত হয়ে প্রাচীন হ্রদে গিয়ে মিশত, সেখান থেকে সংগ্রহ করা একটি বিশেষ পাথরে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা পৃথিবীতে অণুজীবের কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত চিহ্নের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় আবিষ্কারকে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণে রূপান্তর করার জন্য যে নমুনাগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, সেই কর্মসূচিই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ফলে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর জানার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মানবজাতিকে হয়তো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সিএনএনের বিজ্ঞান ও মহাকাশবিষয়ক প্রতিবেদক অ্যাশলি স্ট্রিকল্যান্ড তার প্রতিবেদনে এই সংকটের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তার বর্ণনায়, নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভারের সংগ্রহ করা ‘স্যাফায়ার ক্যানিয়ন’ নামের নমুনাটি মঙ্গলে প্রাচীন জীবনের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। নমুনাটি বর্তমানে রোভারের ভেতরে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এটিকে সম্ভাব্য জৈবিক স্বাক্ষর বা পটেনশিয়াল বায়োসিগনেচার হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে সম্ভাব্য প্রমাণ এবং নিশ্চিত প্রমাণের মধ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, সেটিই এই আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য ও অনিশ্চয়তা দুটোকে সামনে নিয়ে এসেছে।
এই ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে হলে মঙ্গলের অতীত পরিবেশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা বিবেচনায় নিতে হবে। পারসিভিয়ারেন্স ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মঙ্গলের জেজেরো গহ্বরে অবতরণ করে। গবেষণার জন্য এই অঞ্চল বেছে নেওয়ার কারণ ছিল এর প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস। তিনশ কোটি বছরেরও বেশি আগে এখানে নদী প্রবাহিত হতো এবং সেই নদীগুলো একটি প্রাচীন হ্রদে গিয়ে মিশত। নদীর প্রবাহ, হ্রদের উপস্থিতি এবং পানির কারণে সৃষ্ট পললভূমি—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি অতীতের পরিবেশগত পরিস্থিতি অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে পানির সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিজ্ঞানীরা মঙ্গলেও অতীতে পানি ছিল এমন অঞ্চলগুলোতে জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন খুঁজছেন।
পারসিভিয়ারেন্সের অভিযানও সেই বৈজ্ঞানিক ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। রোভারটির কাজ শুধু মঙ্গলের ভূপ্রকৃতির ছবি তোলা বা পাথরের গঠন পর্যবেক্ষণ করা নয়; বরং এমন নমুনা সংগ্রহ করা, যেগুলো ভবিষ্যতে পৃথিবীর উন্নত পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে গ্রহটির অতীত সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেরেতভা ভ্যালিস নামের প্রাচীন নদী উপত্যকার প্রান্তবর্তী পাথুরে অঞ্চল থেকে স্যাফায়ার ক্যানিয়ন নমুনাটি সংগ্রহ করা হয়। নমুনাটি আকারে প্রায় একটি চকখণ্ডের মতো। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তার আকারের তুলনায় অনেক বড়।
এই পাথরটির বিশেষত্ব হলো এর গায়ে থাকা চিতাবাঘের গায়ের ছোপের মতো দাগ। নাসার বিজ্ঞানীরা যে পাথরটি থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন, সেটির নাম ‘চেয়াভা ফলস’। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পারসিভিয়ারেন্স এই পাথর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। পাথরের আশপাশের কাদাপাথরেও বিপুলসংখ্যক ছোট ছোট দাগ দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা এসব দাগকে সম্ভাব্য ‘রিডাকশন স্পট’ বা রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করছেন। পৃথিবীতে মাটি ও পলির মধ্যে জৈব পদার্থের উপস্থিতি এবং অণুজীবের কার্যকলাপের কারণে এ ধরনের দাগ তৈরি হতে পারে।
পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং পারসিভিয়ারেন্স বিজ্ঞান দলের সদস্য অ্যাড্রিয়ান ব্রোজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পৃথিবীতে পলি বা মাটির নিচে চাপা পড়া জৈব পদার্থ অণুজীবের মাধ্যমে ভাঙতে শুরু করলে তার আশপাশে বিবর্ণ বলয় কিংবা ছোট ছোট দাগ তৈরি হতে পারে।
মঙ্গলের ওই পাথরে পাওয়া দাগগুলোর সঙ্গে পৃথিবীতে দেখা এমন বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। ব্রোজের মতে, মঙ্গলে সম্ভাব্য জৈবিক স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করার কারণ রয়েছে। এই পাথর নিয়ে গবেষণার ফল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে এই সাদৃশ্যকে সরাসরি জীবনের প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না। কোনো পাথরে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা গেলেই সেখানে অণুজীবের অস্তিত্ব ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। রাসায়নিক বিক্রিয়া কিংবা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের চিহ্ন সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ, জীবনের উপস্থিতি এবং প্রাণহীন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া—দুই ধরনের ব্যাখ্যাই এখনো বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। তাই বিজ্ঞানীদের সামনে প্রধান কাজ হলো সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক, তা নির্ণয় করা।
এই অনিশ্চয়তার কারণেই নমুনাটি পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা এত গুরুত্বপূর্ণ। পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রিওনি হর্গান, যিনি পারসিভিয়ারেন্স অভিযানের সহগবেষক ও পরিকল্পনাকারী, সিএনএনকে বলেছেন, মঙ্গলে নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নানা ইঙ্গিত পেতে পারেন, কিন্তু সেগুলো পৃথিবীতে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তার বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, এই গবেষণার লক্ষ্য কেবল মঙ্গলে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়া নয়; বরং মহাবিশ্বে জীবন কতটা সাধারণ, নাকি পৃথিবীই জীবনের একমাত্র আবাস—সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা।
মঙ্গলগ্রহে নাসার রোবট। ছবি: রয়টার্স
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অতীতের একটি অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কতাও শিখেছেন। ১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকায় আবিষ্কৃত অ্যালান হিলস ৮৪০০১ নামের একটি মঙ্গলীয় উল্কাপিণ্ড একসময় প্রাচীন জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন বহন করছে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, উল্কাপিণ্ডটিতে পাওয়া কিছু বৈশিষ্ট্য প্রাণহীন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও সৃষ্টি হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণাগারে একাধিক দল উল্কাপিণ্ডটি পরীক্ষা করেও প্রাথমিক ধারণাকে চূড়ান্ত প্রমাণে রূপান্তর করতে পারেনি।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কিউরিওসিটি রোভারের প্রকল্পবিজ্ঞানী অ্যাশউইন ভাসাভাদা এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, কোনো পাথরে প্রাচীন জীবনের সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেলেও সেটি যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সে কারণে যত বেশি সম্ভব পরীক্ষাপদ্ধতি প্রয়োগ করা এবং বিশ্বের সেরা গবেষণাগারগুলোতে নমুনা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, স্যাফায়ার ক্যানিয়নের নমুনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কতার কারণ কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনও।
পারসিভিয়ারেন্স রোভারের নিজস্ব যন্ত্রপাতি দিয়ে নমুনার কিছু বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু সেগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়নি, যাতে মঙ্গলে বসেই জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়। ওয়েস্টার্ন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী মেলিসা রাইসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রোভারের যন্ত্রগুলো মূলত নমুনা বাছাই, পাথরের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নির্বাচন করা হয়েছিল। নমুনাগুলো একসময় পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে বিশ্লেষণ করা হবে—এই প্রত্যাশা শুরু থেকেই অভিযানের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এদিকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চীন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ২০২৮ সালে তিয়ানওয়েন-৩ অভিযান উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে এবং ২০৩১ সালে মঙ্গল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ ক্ষেত্রে চীন এমন একটি অভিযানের নকশা তৈরি করছে, যা তার আগে সফলভাবে সম্পন্ন করা একটি মহাকাশ অভিযানের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করবে। তবে চীনের সংগৃহীত নমুনা পারসিভিয়ারেন্সের নমুনার মতো হবে কি না, তা নির্ভর করবে অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা এবং নমুনা সংগ্রহের স্থানের ওপর। দুই দেশের নমুনা ভিন্ন হলে সেগুলো মঙ্গলের অতীত সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের তথ্যও দিতে পারে।
অ্যাশলি স্ট্রিকল্যান্ডের প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য তাই একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সম্ভাবনার পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশ্নও সামনে আনে। বিপুল ব্যয়, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবের কারণে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কর্মসূচি থমকে গেলে তার ক্ষতি শুধু একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হারিয়ে যেতে পারে এমন একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে মানবজাতি জানতে পারত, পৃথিবীর বাইরে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না। মঙ্গলের পাথরটি এখনো সেই সম্ভাব্য উত্তর বহন করছে। কিন্তু সেটি থেকে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কবে আবার পূর্ণ গতি পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।