চলতি বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস সেপ্টেম্বর পার করে অক্টোবর শুরু করেছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আবহাওয়ার পরিস্থিতি ডেঙ্গুর বিস্তার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াইরত হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
জ্বর এবং পেশি ও জয়েন্টে ব্যথার মতো উপসর্গসহ ডেঙ্গুর এই নতুন প্রাদুর্ভাব ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ঘটা ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকোপের ঠিক পরেই দেখা দিয়েছে। এটি এমন এক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, যেখানে এ বছর হামের কারণে ১ হাজার ১০০-এরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
হাসপাতাল থেকে চলতি সপ্তাহে ছাড়পত্র পাওয়া ৩০ বছর বয়সী পুলিশ সার্জেন্ট শফিকুর ইসলাম বলেন, “আমি একটি শয্যা পেয়ে ভাগ্যবান ছিলাম। কিন্তু অনেক ডেঙ্গু রোগী এখনো শয্যা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “আমার অনেক সহকর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন। আমরা দিনভর জনগণের সেবা করি, কিন্তু প্রায়ই নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা করি।”
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার ধরন অক্টোবরজুড়েও ডেঙ্গুর সংক্রমণ অব্যাহত রাখতে পারে। সাধারণত অক্টোবর ডেঙ্গুর প্রকোপের অন্যতম শীর্ষ মাস।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, “আমাদের পূর্বাভাস মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।” তিনি লক্ষ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়িতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
দেশজুড়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে রোগটি
প্রধান শহরগুলোর বাইরে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বিস্তার রোগটিকে এখন দেশব্যাপী চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে বলে জানান বাশার। তিনি সতর্ক করে বলেন, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে শুধু কীটনাশক দিয়ে ফগিং করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে হওয়া বৃষ্টিপাত অক্টোবরেও সংক্রমণ বাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ বৃষ্টিপাত ও ডেঙ্গু সংক্রমণের মধ্যে ৪৫ থেকে ৬০ দিনের ব্যবধান থাকে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪৫ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছে এবং ৭৯ হাজার ৬২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যু আগস্টের ৪৩ জন এবং জুলাইয়ের ৩৬ জনের তুলনায় অনেক বেশি।
বুধবারও ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ১,৯৪৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকেরা সাধারণত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্যারাসিটামলের মতো ব্যথানাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে গুরুতর রোগীদের জটিলতা এড়াতে হাসপাতালে রেখে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন হয়।
জলবায়ুর প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনও ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
২০২২ সাল পর্যন্ত ২২ বছর ধরে বাংলাদেশের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আগের কয়েক মাসের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষকেরা বলেছেন, পরিবর্তিত আবহাওয়ার ধরন মশার সংখ্যা এবং রোগ সংক্রমণ—দুটোকেই প্রভাবিত করতে পারে।
বাশার বলেন, ‘‘বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার ধরনে পরিবর্তনের ফলে এডিস মশার মৌসুমি আচরণও বদলে যাচ্ছে। এতে মশা দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকছে এবং প্রজননের সময়ও বাড়ছে।’’
এই গবেষণার ফলাফল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততার আহ্বান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি প্রচারণার পাশাপাশি জনগণকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। মশার প্রজনন ঠেকাতে জমে থাকা পানি অপসারণ অন্যতম কার্যকর উপায়। তবে অনেক এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ চললেও জমে থাকা পানি ও মশার উপদ্রব এখনো উদ্বেগের বিষয়।
৩২ বছর বয়সী জাহিদ হাসান বলেন, “আমাদের এলাকায় প্রচুর মশা রয়েছে। কিন্তু এগুলো নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করতে কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি।”
জাহিদের চার বছর বয়সী ছেলে সম্প্রতি ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়েছে। তবে এখন জাহিদ নিজেই জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।
একসঙ্গে একাধিক প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান।
তিনি বলেন, “একই সময়ে একাধিক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা সীমিত। মশার প্রজনন কমিয়ে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সরকারি হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ২১ হাজার ৫২০ জনের হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে ১ লাখ ৯০ হাজার জনের বেশি সন্দেহভাজন হাম বা একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।