Advertisement Banner

ঈদে থানায় মূল্যবান জিনিস রাখেননি নাগরিকরা, কেন?

ঈদে থানায় মূল্যবান জিনিস রাখেননি নাগরিকরা, কেন?
ছবি: চরচা

প্রতি বছর ঈদের সময় এক কোটির বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়ে। ফলে রাজধানী ফাঁকা হয়ে যায়। আর এই সুযোগে রাজধানীতে বাড়ে চুরি-ডাকাতির সংখ্যা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ঈদের ছুটি রাজধানীতে শতাধিকেরও বেশি চুরি ও ডাকাতি হয়। এ বছর বাড়ি ফাঁকা রেখে গেলে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার বা গুরুত্বপূর্ণ দলিল থানায় জমা রেখে যাওয়ায় জন্য নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। কিন্তু এতে তেমন সাড়া মেলেনি। প্রশ্ন উঠেছে–কেন?

গত ১৫ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার বলেছেন, মূল্যবান সামগ্রী অরক্ষিত অবস্থায় না রেখে সম্ভব হলে আত্মীয়স্বজনের বাসায় রাখুন। কারো ঢাকায় আত্মীয়স্বজন না থাকলে থানার সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে থানায় জমা রাখা যাবে বলেও জানান।

কিন্তু পুলিশের এই আহ্বানের সাড়া দেয়নি ঢাকার নাগরিকরা। ডিএমপির তথ্য বলছে, এবার ঈদের দিন পর্যন্ত রাজধানীর ৫০টি থানার মধ্যে মাত্র দুটি থানায় দুটি ল্যাপটপ জমা পড়েছে। একটি মুগদা থানায়, অন্যটি সবুজবাগ থানায়। নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার বা অন্য কোনো মূল্যবান সামগ্রী জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন উঠেছে–কেন নাগরিকরা থানাকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করলেন না? পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ, নাকি অন্য কোনো কারণ?

নাগরিকদের দ্বিধা, শঙ্কা

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা সোলাইমান সজিব চরচাকে বলেন, উদ্যোগটি ভালো হলেও নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমার কাছে কী ধরনের সম্পত্তি আছে, কীভাবে অর্জন করেছি–এসব যদি পুলিশ জানতে চায়? থানায় জমা দিলে তো রেকর্ডভুক্ত হবে। ভবিষ্যতে তা নিয়ে যদি কোনো ঝামেলা তৈরি হয়?”

মিরপুরের বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম ইমন বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, বাড়িতে অতিরিক্ত সম্পত্তি থাকলে পুলিশ হয়রানি করেছে। পুলিশ নানাভাবে নাগরিকদের টাকা-পয়সা ও স্বর্ণলংঙ্কার আত্মসাতের চেষ্টা করেছে–এমন অভিযোগ শোনা গেছে। তিনি বলেন, “থানায় রাখলে চুরি-ডাকাতির ভয় নেই ঠিকই, কিন্তু শতভাগ আস্থা করার জায়গাটা তৈরি হয়নি। আমি যদি থানায় রেখে আসি, পরে কোনো অসৎ সদস্য ঝামেলা করলে দায় নেবে কে?”

ঢাকার এই বাসিন্দার মতে, পুলিশের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি আস্থার জায়গায় পৌঁছায়নি। ফলে মানুষ থানায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি জমা রাখাটাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। আর এই জন্য বাসায় চুরি-ডাকাতির শঙ্কা থাকলেও থানায় জমা দিচ্ছে না।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন চরচাকে বলেন, “সাড়া কম পাওয়ার কারণ জনগণই ভালো বলতে পারবে। অনেকেই হয়তো নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন না, তাই থানায় জমা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।”

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, “থানার ওপর আস্থাহীনতার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মূল্যবান সামগ্রী জিডি করে থানায় জমা রাখা হয়, জমা দেওয়ার সময় কপি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেই কপির ভিত্তিতেই মালিক তা ফেরত পান। থানা কি কারও জিনিস আত্মসাৎ করবে? এমন চিন্তার কোনো ভিত্তি নেই।”

ফারুক হোসেন জানান, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিও থানার ভল্টে সংরক্ষিত থাকে। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি নতুন উদ্যোগ–মানুষ হয়তো এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। একটু সময় লাগবে।

প্রচারণা ও ‘কালচার’ ইস্যু বলছে পুলিশ

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, “সাড়া কম পাওয়ার পেছনে প্রচারণা ও অভ্যাস–এই দুটি বিষয় কাজ করেছে। বিষয়টি গণমাধ্যমে এলেও সাধারণ জনগণ সেই মাত্রায় অবগত নন। সমাজে এটি এখনো একটি প্রচলিত ‘কালচার’ হয়ে ওঠেনি।”

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তার বিভাগে দুটি থানায় দুটি ল্যাপটপ জমা পড়েছে। অর্থাৎ, একেবারে সাড়া মেলেনি–এমন নয়। তবে সময়ের সঙ্গে সচেতনতা বাড়লে অংশগ্রহণও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন। পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতার অভিযোগ তিনি নাকচ করে বলেন, “চুরি-ডাকাতি হলে মানুষ শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছেই আসে। পুলিশই শেষ ভরসা।”

গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভির আহমেদ মনে করেন, ঈদযাত্রার ব্যস্ততায় অনেকেই সময় বের করতে পারেননি। যদি শুরু থেকেই স্পষ্টভাবে প্রচার করা হতো বা বাসা থেকে সংগ্রহের মতো কোনো ব্যবস্থা থাকত, তাহলে সাড়া বাড়তে পারত। নতুন উদ্যোগে মানুষ সাড়া দিতে সময় নেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তানভির আহমেদ বলেন, “নাগরিকরা কোনো সমস্যায় পড়লে তারা সরাসরি পুলিশ কিংবা ৯৯৯-এ ফোন করে সহযোগিতা চান। ফলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা না থাকলে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চাইত না।”

তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, “যাদের বাসায় বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল–আত্মীয়স্বজন বা বিশ্বস্ত পরিচিতজন–তারা সেটিই বেছে নিয়েছেন। সাড়া না দেওয়ার অর্থ আস্থাহীনতা নয়।”

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঈদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পেট্রোল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। টহল জোরদার করা হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় চুরি, ডাকাতি এবং সড়কে ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশ কাজ করছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স (অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, “বিষয়টি মানসিক প্রস্তুতি, অভ্যাস ও আস্থার সূক্ষ্ম সংকটের সঙ্গে জড়িত।”

তার ভাষ্য, “ঘোষণা এসেছে হঠাৎ করে। মানুষ বাড়ি যাওয়ার আগে কোথায় কী রাখবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন। অন্তত এক মাস আগে পরিকল্পিত প্রচারণা, উদ্বোধনী কর্মসূচি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলে সাড়া বেশি মিলত।”

ওমর ফারুক বলেন, “থানায় জমা দিলে সম্পদ রেকর্ডভুক্ত হবে–এই ধারণা অনেকের মনে সংশয় তৈরি করে। সম্পদের উৎস, ভবিষ্যৎ জটিলতা বা হয়রানির আশঙ্কা–এসব চিন্তা মানুষকে নিরুৎসাহিত করে। তাই শুধু ভালো উদ্যোগ নিলেই হয় না; জনসম্পৃক্ততা, স্বচ্ছতা ও আস্থা তৈরির প্রক্রিয়াও সমান জরুরি।”

আস্থার প্রশ্ন নাকি অভ্যাসের ঘাটতি?

ঘটনাটি একদিকে যেমন নাগরিক আস্থার প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে এটি সামাজিক অভ্যাস ও সচেতনতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। পুলিশ বলছে, এটি ছিল অতিরিক্ত একটি নিরাপত্তা বিকল্প। নাগরিকরা বলছেন, আস্থা ও নিশ্চয়তার জায়গাটি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

বাস্তবতা হলো–ফাঁকা রাজধানীতে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি প্রতি বছরই থাকে। পুলিশের এই উদ্যোগ ছিল প্রতিরোধমূলক। কিন্তু মাত্র দুটি ল্যাপটপ জমা পড়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, নীতিগত আহ্বান আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে এখনো দূরত্ব রয়েছে।

ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের উদ্যোগ আরও পরিকল্পিতভাবে, দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো চিত্র বদলাতে পারে। আপাতত প্রশ্ন রয়ে গেছে–পুলিশের নিরাপত্তা আশ্বাসের চেয়ে নাগরিকদের সংশয়ই কি বেশি শক্তিশালী? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠবে নতুন এক নিরাপত্তা সংস্কৃতি?

সম্পর্কিত