ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ: ওয়াশিংটনের পথে হাঁটবে, না নীতিতে অটল থাকবে ইউরোপ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধ: ওয়াশিংটনের পথে হাঁটবে, না নীতিতে অটল থাকবে ইউরোপ?
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের মিসাইল হামলা ইচ্ছাকৃত কি না তা জানা যায়নি। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে উল্লাস দেখা গেছে। ব্রাসেলসে রাস্তায় নেমে উদযাপনের সময় এক ব্যক্তি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “স্বৈরশাসকের মৃত্যু হয়েছে। এটি আমার জীবনের সেরা দিন।”

ইরান সরকারের দীর্ঘদিনের কঠোর সমালোচক ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তারাও। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তেহরানের ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইইউ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তারা। তবে সাম্প্রতিক এই হামলার পর ইইউ এখন এক পরিচিত কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান ইইউ মুখপাত্ররা।

সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা নিচ্ছে যাতে ‘বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাস পৃষ্ঠপোষক দেশ’ কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা যায়। তবে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক কোনো আইনি কাঠামোর আওতায় হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেনি।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তথাকথিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামত বিবেচনা না করেই যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এতে ‘অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধসংক্রান্ত বিধিনিষেধ’ মানা হয়নি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্র দেশের সমালোচনা করে বলেন, তারা শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে অতিরিক্ত দ্বিধা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ইতোমধ্যেই বিভক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে আরও ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

জার্মানি বনাম স্পেন: ইউরোপে ভিন্ন অবস্থান

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস ওয়াশিংটনের সরাসরি সমালোচনা থেকে সতর্কভাবে বিরত থাকেন। রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক খুব বেশি কার্যকর হবে না।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস। ছবি: রয়টার্স
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস। ছবি: রয়টার্স

তিনি আরও বলেন, “এখন আমাদের অংশীদার ও মিত্রদের উপদেশ দেওয়ার সময় নয়। কয়েকটি বিষয় ছাড়া তাদের অনেক লক্ষ্যই আমাদের সঙ্গে মিল রয়েছে।”

অন্যদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে কথা বলেন। শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত ও বৈরী করে তুলছে। স্পেন এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে?

হামলার বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চ্যাথাম হাউসের আন্তর্জাতিক আইন কর্মসূচির পরিচালক মার্ক ওয়েলার বলেন, ইরানের ওপর চলমান হামলার কোনো বৈধ আইনি ভিত্তি নেই। তার মতে, সরাসরি সশস্ত্র হামলা না হলে কেবল কোনো রাষ্ট্রের বৈরী অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক আইন শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেয় না।

তিনি বলেন, অতীতের উসকানির জবাব হিসেবেও সামরিক শক্তি ব্যবহার বৈধ নয়। কেবলমাত্র সশস্ত্র হামলা থেকে রক্ষার শেষ উপায় হিসেবে বলপ্রয়োগ অনুমোদিত হতে পারে। যদিও নিজ সরকারের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ কিছু ক্ষেত্রে বৈধ হতে পারে, তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকারের পদক্ষেপ সেই সীমা অতিক্রম করেনি বলে মন্তব্য করেন ওয়েলার।

‘আইন শূন্যে কাজ করে না’

তবে ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের আইন, সংঘাত ও বৈশ্বিক উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক রোজা ফ্রিডম্যান এই মতের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হয়। “আইন শূন্যে কাজ করে না।”

তার মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরে শুধু ইসরায়েল নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, কেবল আইনের পাঠ বিশ্লেষণ করলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলাকে বৈধ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। ছবি: রয়টার্স
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। ছবি: রয়টার্স

বিপজ্জনক নজির?

বিশ্লেষকদের মতে, হামলার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক মূলত তাত্ত্বিক আইনি আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কারণ বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা খুবই কম।

সংঘাত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা বা নো-ফ্লাই জোন আরোপ করতে পারে। তবে রোজা ফ্রিডম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে নিজের বা মিত্রদের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ ভেটো দিতে পারে যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ আটকে দিয়েছে মস্কো।

সহজভাবে বলতে গেলে, “শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বেশি রাখে।”

মার্ক ওয়েলারের মতে, ঠিক এই কারণেই ইউরোপীয় সরকারগুলোর আরও স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়া জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, অবৈধ কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্যে চিহ্নিত করতে অনীহা দেখালে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থে শক্তি প্রয়োগ আবার গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

তার মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ইউরোপের জন্য গুরুতর হতে পারে। স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান না থাকলে ভবিষ্যতে রাশিয়ার আগ্রাসন বা সম্ভাব্য চীনা সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং তখন দ্বৈত মানদণ্ড ও ভণ্ডামির অভিযোগ উঠতে পারে।

সম্পর্কিত