তিনি স্বপ্ন দেখান এক নাগরিক বিপ্লবের। তিনি চান ক্ষমতা থাকবে সাধারণ মানুষের হাতে, ধনীদের দিতে হবে বেশি কর, আর রক্ষা পাবে প্রকৃতি। মানুষ তো বটেই, এমনকি পশুপাখির শান্তির জন্যও তিনি কথা বলেন। তাকে আবার বলা হচ্ছে ফ্রান্সের মামদানি।
তিনি ৭৪ বছরের এক প্রবীণ ফরাসি নেতা, নাম তার জন-লুক মেলেনশঁ। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই বয়সেও তিনি সোশ্যাল মিডিয়া টিকটকে ব্যাপক জনপ্রিয়, সেখানে তার লাখ লাখ তরুণ ফলোয়ার রয়েছে। জয় কড়ে নিয়েছেন তরুণ প্রজন্ম জেন জি’র মন। এর আগে তিনি তিনবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে এবার তিনি বেশ আশাবাদী।
ফ্রান্সের মূলধারার মধ্যপন্থী দলগুলো যখন সংকটে, তখন তার ফায়দা তুলছে উগ্র ডানপন্থীরা। কিন্তু পাশাপাশি মেলেনশঁর দল ‘আনসাবমিসিভ ফ্রান্স’ (এলএফআই)-এর হাত ধরে দেশটিতে একধরনের কট্টর সমাজতন্ত্রও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই রাজনীতিতে যেমন আছে পুরোনো দিনের ধনী-দরিদ্রের লড়াই, তেমনি আছে আধুনিক যুগের বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন।
সম্প্রতি ফ্রান্সের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরের মেয়র নির্বাচনে তার দল বড় জয় পেয়েছে। এর মধ্যে প্যারিসের শহরতলি সাঁ-দেনি এবং উত্তরের বড় শিল্পশহর রুবে অন্যতম।
মেলেনশঁর দল ফ্রান্সের অন্যান্য সাধারণ বামপন্থী দলগুলোর চেয়ে অনেক বেশি কট্টর। তার মূল লক্ষ্য হলো দেশে একটি নতুন সংবিধান তৈরি করা। তিনি প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার বাড়াতে চান। তার সহজ কথা- দেশের সম্পদ ধনী-গরিব সবার মাঝে সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তিনি বেশ বড়সড় পরিবর্তনের পক্ষে। তিনি চান ফ্রান্স ‘ন্যাটো’ সামরিক জোট থেকে বেরিয়ে আসুক এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভালো করুক। প্রয়োজনে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম ভাঙতেও রাজি। সম্প্রতি এক টিভি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “সব জায়গায় পুঁজিবাদের চেয়ে পুরোনো দিনের স্নায়ু যুদ্ধাবস্থাই বেশি নিরাপদ ছিল।”
আগামী বছর ফ্রান্সে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো আর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। ভোটের জরিপগুলো থেকে এটা নিশ্চিত নয় যে মেলেনশঁই জিতবেন। কিন্তু তিনি যদি নির্বাচনের শেষ ধাপে পৌঁছাতে পারেন, তবে উগ্র ডানপন্থী প্রার্থীদের সাথে তার বড় লড়াই হবে এটুকু নিশ্চিত।
মেলেনশঁকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় দারুণ পটু এবং প্রায়ই ভোটের আগের সব হিসেব-নিকেশ উল্টে দেন। গত ২০২২ সালের নির্বাচনেও শেষ মুহূর্তে সবাইকে চমকে দিয়ে জয়ের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি।
ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকছে উগ্র বামপন্থার দিকে। ছবি: রয়টার্স
ফ্রান্সের এই উগ্র বামপন্থী রাজনীতির এত জনপ্রিয়তার পেছনে আসলে কারণ কী? এর পেছনে বড় একটা কারণ হলো মার্ক্সবাদী বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার পুরোনো প্রভাব। ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টির বিশাল দাপট ছিল, যার রেশ এখনো রয়ে গেছে। আরেকটি কারণ হলো ফ্রান্সের প্রতিবাদের ইতিহাস। তাই মেলেনশঁর দলের এই বিপ্লবী কথাবার্তা অনেকেই বেশ পছন্দ করেন।
বিশেষ করে তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তিনি দারুণ জনপ্রিয়। প্যারিসের এক শিক্ষার্থী যেমন বলছিলেন, মেলেনশঁর বৈষম্যহীন ও বর্ণবাদবিরোধী পৃথিবীর স্বপ্ন তাদের খুব টানে। অন্য একজন জানান, মেলেনশঁ একজন ‘বুদ্ধিজীবী’ নেতা, আর ফ্রান্সে শিক্ষিত তরুণদের কাছে বুদ্ধিজীবীদের আলাদা একটা কদর আছে। এছাড়া গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে মেলেনশঁর কড়া অবস্থানও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত মাসের একটি জরিপ অনুযায়ী, ফ্রান্সে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৫৮ শতাংশই মেলেনশঁকে পছন্দ করেন। অথচ ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার মাত্র ১৪ শতাংশ। ৭৪ বছর বয়সী এই প্রবীণ নেতা তরুণদের মনের দুশ্চিন্তাগুলো খুব ভালো বোঝেন। তিনি তাঁদের এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান, যেখানে কোনো বর্ণবাদ থাকবে না এবং সবার প্রতি ইনসাফ করা হবে। সম্প্রতি একটি টিভি অনুষ্ঠানে অন্য দলগুলোকে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা তরুণ প্রজন্মকে কী শেখাচ্ছি? টাকা জমাও আর সরকারি সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দাও! এটা কোনো কথা হলো?”
আসলে মেলেনশঁ কেবল একজন নেতাই নন, তিনি একজন চতুর রাজনৈতিক কৌশলীও বটে। একটা সময় ফ্রান্সের সাধারণ শ্রমিকেরা কমিউনিস্ট দলকে ভোট দিতেন, কিন্তু এখন তারা চলে গেছেন উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেনের দিকে। আর সমাজতান্ত্রিক দলগুলোকে এখন মূলত ভোট দেন সরকারি চাকরিজীবী আর বইপ্রেমী শিক্ষিত সমাজ।
এই অবস্থায় মেলেনশঁ লাতিন আমেরিকার সফল পপুলিস্ট নেতাদের কৌশল গভীরভাবে মন দিয়ে পড়েছেন। তিনি খুব হিসেব-নিকেশ করে নিজের এক নতুন ভোটার ব্যাংক তৈরি করেছেন। সেখানে তিনি একদিকে যেমন শহরের শিক্ষিত তরুণদের টেনেছেন, তেমনি পাশে পেয়েছেন সংখ্যালঘু মানুষ এবং সরকারি কম ভাড়ার আবাসন বা কলোনিতে থাকা নিম্নবিত্তদের। ফ্রান্সের বিখ্যাত জরিপ সংস্থা ‘ইফপ’ এর গবেষকেরা মেলেনশঁর এই কৌশলকে তার রাজনীতির ‘ম্যাজিক মিক্স’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
উদাহরণ হিসেবে প্যারিসের শহরতলি সাঁ-দেনির কথাই ধরা যাক। সেখানকার ৪৩ শতাংশ মানুষ সরকারি কম ভাড়ার আবাসন বা কলোনিতে থাকেন এবং মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশই অভিবাসী। আরেকটি জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপে ফ্রান্সের প্রায় ৬৯ শতাংশ মুসলিম ভোটার মেলেনশঁকে ভোট দিয়েছিলেন। উগ্র ডানপন্থীরা যেসব বিষয় নিয়ে ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করে, মেলেনশঁ সেগুলোকে নিজের পক্ষে স্লোগান বানিয়ে নিয়েছেন। মরক্কোতে জন্ম নেওয়া এই নেতা আফসোস করে বলেন যে তিনি আরবি বলতে পারেন না এবং ফরাসি সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের এই মিশে যাওয়াকে তিনি মন থেকে স্বাগত জানান।
ভেতরে ভেতরে মেলেনশঁ তার পুরোনো জোটের সমাজতান্ত্রিক দলগুলোকে তীব্র সমালোচনা করেন। ছবি: রয়টার্সতবে মেলেনশঁর এই জনপ্রিয়তার একটা বড় সীমাবদ্ধতাও আছে। বিশেষ করে তার একগুঁয়ে স্বভাব এবং কিছু গণতান্ত্রিক নিয়মকানুনের প্রতি অবহেলা অনেকেই পছন্দ করেন না। জরিপগুলোতে দেখা যায়, তার প্রতি মানুষের অসন্তুষ্টির হার বেশ চড়া। তার দলের বিরুদ্ধে উগ্র ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের নামে সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে ইহুদি-বিদ্বেষের অভিযোগও উঠেছে বহুবার।
সম্প্রতি ফ্রান্সের মধ্য-বামপন্থী এক নেতা রাফায়েল গ্লুকসম্যান অভিযোগ করেন, মেলেনশঁ উগ্র ডানপন্থীদের মতোই নোংরা আচরণ করছেন। কারণ একটি নির্বাচনী সভায় মেলেনশঁ গ্লুকসম্যানের নামের উচ্চারণ নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন। অন্য বামপন্থী দলগুলোর সাথে ২০২৪ সালে তার যে রাজনৈতিক জোট হয়েছিল, তাও ভেঙে গেছে। ভেতরে ভেতরে মেলেনশঁ তার পুরোনো জোটের সমাজতান্ত্রিক দলগুলোকে তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাদের সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন এক অভিজাত শ্রেণী বলে মনে করেন।
মেলেনশঁর এই বামপন্থী লোকরঞ্জনবাদী (পপুলিস্ট) রাজনীতির ধরনটি মূলত ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর এবং স্পেনের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে ধার করা, কারণ এসব দেশের সাথে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। তার এই চিন্তাধারার মিল পাওয়া যায় ফ্রান্সের বাইরের কিছু রাজনৈতিক নেতার সাথেও- যেমন নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট নেতা জোহরান মামদানি কিংবা ব্রিটেনের গ্রিন পার্টির জ্যাক পোলানস্কি।
তবে বামপন্থী রাজনীতিতে মেলেনশঁর মতো এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার ক্ষমতা খুব কম নেতারই আছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফিলিপ মার্লিয়ার মেলেনশঁকে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সাথে তুলনা করে বলেন, “তিনি আসলে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ট্রাম্পিয়ান চরিত্র। তিনি এত এত কেলেঙ্কারি আর রাজনৈতিক ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছেন, তাও এখনো শক্তভাবে টিকে আছেন।”
দ্য ইকোনোমিস্টে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত