দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

কেন আমেরিকার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে না তেহরান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কেন আমেরিকার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে না তেহরান?
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইরানের নেতারা মনে করছেন, তারা যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন। এ সময় ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ পাঠানো যুদ্ধবিরতির দুটি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ জিতেছে—ট্রাম্পের এমন একতরফা ঘোষণা সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারবে না। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধের ইঙ্গিত দিলেও ইরান সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে কিংবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ বজায় রাখতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরানের ধারণা—ট্রাম্প প্রশাসনকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে বড় মূল্য দিতে বাধ্য না করা গেলে এই সংঘাতের শেষ হবে না। তেহরান এমন একটি স্থায়ী চুক্তি চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আর ইরানের ওপর হামলা করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেবে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, “যদি যুদ্ধবিরতি হয় বা সংঘাত থামে, তবে অবশ্যই এমন নিশ্চয়তা থাকতে হবে যে ইরানের বিরুদ্ধে আর কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। কয়েক মাস পর আবার হামলা হলে সেই যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থ থাকবে না।”

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, যুদ্ধ শুরুর মাত্র ১১ দিন আগেও যে সরকার মূলত নিজেদের টিকে থাকার চিন্তায় ছিল, তাদের কাছ থেকে এমন দৃঢ় অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে আলোচনা হচ্ছে—গত বছরের জুনের মতো হঠাৎ করেই যুদ্ধ থামানো সম্ভব কি না, নাকি এমন একটি চুক্তি করতে হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শর্তসাপেক্ষে শিথিল করার বিষয় থাকবে।

তবে সামগ্রিকভাবে ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের মনোভাব হলো, সরকার টিকে থাকবে এবং এই মুহূর্তে কোনো সমঝোতায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে ইরান। বাহরাইনের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের পক্ষে ৮০টির বেশি দেশ সমর্থন দিতে পারে বলে জানা গেছে।

প্রস্তাবটিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমালোচনা করা হয়নি। অন্যদিকে রাশিয়া যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আলাদা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আমরা যুদ্ধবিরতি চাইছি না। কারণ আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা না ভাবতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে যুদ্ধ, আলোচনা, যুদ্ধবিরতি এবং আবার যুদ্ধ—এই চক্র চালু রাখতে চায়। আমরা এই চক্র ভেঙে দেব।”

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করবে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।

আইআরজিসি বলেছে, “যুদ্ধের শুরুতেই আমরা ঘোষণা করেছি এবং আবারও বলছি—ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়িত কোনো দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার অধিকার নেই। সন্দেহ থাকলে কাছে এসে দেখুন।”

তারা আরও জানিয়েছে, যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের বহিষ্কার করবে, তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, “এখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো শক্তিগুলো এসেছে এবং চলে গেছে। কিন্তু ইরান টিকে আছে।”

ইরানি কূটনীতিকদের মতে, আগের দুই দফা কূটনৈতিক আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার কারণে ভেঙে যাওয়ায় এখন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর ভিত্তিই নেই।

অন্যদিকে গত সোমবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় ঘোষণা করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইতোমধ্যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে যে হামলা চালিয়ে যাওয়ার আর প্রয়োজন নেই। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ বিজয়ের দাবি করেননি।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “ইরান সরকার মনে করছে তারা এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে এবং এতে তাদের বৈধতাও বাড়তে পারে। অন্যথায় তারা দেশের জন্য পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যাবে।”

তার মতে, ইসরায়েলের কিছু হামলা বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত—ইরানি জনমতকে ক্ষুব্ধ করেছে। অ্যালেক্স বলেন, “মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বোঝা গেছে জনমত বদলাচ্ছে। আগে এটা ছিল সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এখন অনেকেই এটাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে দেখছে।”

তবে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এমিল হোকায়েম মনে করেন, ইরান বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। তিনি বলেন, “সরকার এখনো টিকে আছে, কিন্তু বড় সম্পদ সংকটে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চাইছে না, এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সম্পদ জব্দ করার কথাও ভাবছে। তখন অর্থনৈতিক সম্পদ আসবে কোথা থেকে—সেটাই বড় প্রশ্ন।”

সম্পর্কিত