ফাহমিদা শিকদার

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে প্রথমেই আপনার যা জানা দরকার তা হলো—তিনি অতীতে পার্ট-টাইম ডিজে হিসেবে কাজ করেছেন।
আচ্ছা মানছি এটি হয়তো আপনার প্রথমেই জানার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আর হ্যাঁ, সেই ডিজে-র কাজটাও তিনি করেছিলেন একটা দাতব্য সংস্থার তহবিল সংগ্রহের জন্য।
গত ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তাকে অনেকেই একজন বাস্তববাদী, বন্ধুবৎসল এবং অমায়িক মানুষ হিসেবে দেখেন—যার সাথে কিয়ার স্টারমারের চেয়ে জোহরান মামদানির মিলটাই বেশি।
যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ম্যানচেস্টারে দীর্ঘদিন মেয়রের দায়িত্বে থাকা বার্নহ্যাম গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের ওপর জোর দিয়ে সর্বসাধারণের ভালোবাসা কুড়িয়েছিলেন। এমনকি ইংল্যান্ডের শিল্প-পরবর্তী নগরীগুলোর পক্ষে তার জোরালো কণ্ঠস্বর তাকে ‘দ্য কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরের রাজা) উপাধিও এনে দিয়েছিল।
গত সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম সেইসব জনকল্যাণমুখী ভাবধারাকেই আবারও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল ব্রিটেনের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং গৃহহীনতার সমস্যা সমাধানের প্রতি প্রতিশ্রুতি।

প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ক্ষমতায় বসে বার্নহ্যাম বিদ্যুতের বিলের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, এর ফলে আগামী অক্টোবর থেকে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল বছরে গড়ে ৪৫ পাউন্ড পর্যন্ত কমে আসবে।
তবে মার্কিন গণমাধ্যম ভক্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন না যে, বার্নহ্যামের নীতিমালা তার পূর্বসূরি স্টারমারের চেয়ে খুব একটা আলাদা হবে। তারা দুজনেই ব্রিটেনের মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির সদস্য। এছাড়া যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার মধ্যকার মূল কূটনৈতিক সম্পর্কেও বিশেষ কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গুরুত্ব বহন করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে বার্নহ্যাম বলেন, “আমার মনে হয় ব্যক্তিত্বের দিক থেকে আমি নিজেও কম নই।”
তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এখন বার্নহ্যামকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তা হলো—- ‘তিনি কী পারবেন নিজের দলের এমপিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে?’ এটিই এখন যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সময়ে-অসময়ে সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত এমপিদের ওপর চাপিয়ে দিতেন। দলের সদস্যদের মতপার্থক্যের প্রতি তিনি কখনোই সহনশীলতা দেখাননি। এমনকি স্টারমারের নীতিমালার বিরোধিতা করায় ১৩ জন ব্যাকবেঞ্চার এমপিকে সংসদীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে কৌশলটি কাজে আসেনি।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্টারমারের পাওয়া বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা তিনি বলতে গেলে হেলায় হারিয়েছেন। বুঝিয়ে রাজি করানোর বদলে চাপের মুখে ভাতা কাটার মতো বিতর্কিত নীতি পাস করানোর চেষ্টা করায় শেষ পর্যন্ত তাকে চরম বিব্রতকর পিছুটান নিতে হয়েছে।

নীতিগত নানা ব্যর্থতা আর জনমনে অজনপ্রিয়তা তো ছিলই, তবে আগামী ২০ জুলাই স্যার স্টারমারের পদত্যাগের মূল কারণ হলো— নিজ দলীয় এমপিদের আস্থা হারানো।
বার্নহ্যাম অবশ্য ভিন্ন এক পথের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, তিনি নিজের নীতিগত পরিকল্পনার বিষয়ে কিছুটা মুখচোরা থাকলেও, এমপিরা যাতে দলে নিজেদের গুরুত্ব অনুভব করতে পারেন, সেই প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি খোলামেলাই ব্যক্ত করেছেন।
অবশ্য বার্নহ্যাম তার সবচেয়ে চরমপন্থী অবস্থান থেকে পিছিয়ে এসেছেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত চাপানোর ‘হুইপিং’ প্রথা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। তার মতে, এটি ‘ভালো মানুষদের ভণ্ড বানিয়ে দেয়।’ কিন্তু তা ছিল নির্ভেজাল এক বিপর্যয়ের প্রেসক্রিপশন।
ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ‘হুইপিং’ ব্যবস্থা হলো মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার এবং এমপিদের দলীয় নীতি অনুযায়ী ভোট দেওয়া নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি। সহজ কথায়, পার্লামেন্টে কোনো প্রস্তাব বা বিলের ওপর যখন ভোটগ্রহণ হয়, তখন দলের এমপিরা যেন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বা বিপক্ষে ভোট না দেন, তা নিশ্চিত করার নামই হুইপিং।
হুইপিং ব্যবস্থার ওপর একটি বইয়ের লেখক সেবাস্টিয়ান হোয়েল দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “হুইপ প্রথা তুলে দিলে হাউস অব কমন্স খুব দ্রুতই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।” জটিল আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অধিকাংশ এমপি নিজ দলের অবস্থান স্পষ্ট জানার বিষয়টি কেবল পছন্দই করেন না, বরং মন্ত্রী, ব্যাকবেঞ্চার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে হুইপরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করেন।
এমপিদের উদ্দেশে বার্নহ্যামের বর্তমান বার্তাটি তুলনামূলক অস্পষ্ট হলেও অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। তিনি ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা মুক্ত আলোচনা বন্ধের কাজে হুইপ ব্যবস্থা ব্যবহার না করার অঙ্গীকার করেছেন। এর বদলে হুইপ অফিস কাজ করবে লেবার পার্টির ‘এইচআর বিভাগ’ হিসেবে। বার্নহ্যাম আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি এবং তার মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা কমন্সে আয়োজিত ভোটাভুটিতে নিয়মিত অংশ নেবেন, যাতে সহকর্মীরা সরাসরি এসে তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। স্টারমারের সময় এমনটা কখনোই দেখা যায়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাজের জায়গায় নিয়মিত যাওয়া আর কেবল অমায়িক আচরণ করাই কিন্তু সব নয়। নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে যে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে তাকে পড়তে হবে, বার্নহ্যাম তা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছেন কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো গত এক দশকে ওয়েস্টমিনস্টারে জেঁকে বসা বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার সংস্কৃতি। লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির ফিলিপ কাউলির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নতুন নির্বাচিত সরকারগুলোর মধ্যে বর্তমান সরকারকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটাভুটিতে দলীয় এমপিদের বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একের পর এক পরিবর্তন এবং নীতিমালার ঘনঘন রদবদল এমপিদের শিখিয়েছে যে, জেদ ধরে রাখতে পারলে শেষ পর্যন্ত নিজেদের দাবি আদায় করা সম্ভব।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে পদোন্নতির প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় হতাশ এমপিদের সামলানো। আপাতত লেবার পার্টির এমপিরা বার্নহ্যাম প্রশংসায় পঞ্চমুখ—এমনকি যারা অতীতে তার ভক্ত ছিলেন না, তারাও। শতকরা ৯০ ভাগের বেশি এমপি তার মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছেন এবং প্রকাশ্য সমালোচনার একটি শব্দও কারও মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে না।
কিন্তু একবার তিনি তার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে ফেললেই এই দৃশ্যে নিশ্চিত পরিবর্তন আসবে; কারণ বাদ পড়া স্টারমার-ভক্তদের পাশাপাশি পদ না পাওয়া এমপিরাও ব্যাকবেঞ্চে যোগ দেবেন। সর্বশেষ কনজারভেটিভ সরকারের চিফ হুইপ সাইমন হার্ট এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ভবিষ্যতে পদোন্নতির অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।
একটি বিরূপ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নীতিগত জটিল সমস্যা সংসদে এমন এক লেবার পার্টি তৈরি করেছে যা আপস বা সমঝোতার প্রতি চরম বিমুখ। স্টারমার চেয়েছিলেন ব্যাকবেঞ্চে একদল অনুগত বাহিনী গড়ে তুলতে, যারা তার প্রতিটি পদক্ষেপকে চোখ বন্ধ করে সমর্থন দেবে। কিন্তু তার বদলে এমন বহু এমপি এসে জুটেছেন যারা অত্যন্ত কম ভোটের ব্যবধানে জিতে এসেছেন। তারা আগামী নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ এবং কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের দায়ভার নিতে একদমই নারাজ। এক দায়িত্বরত মন্ত্রীর মতে, “কেয়ারের জন্য যেসব টানা-পোড়েন সামলানো কঠিন ছিল, সেগুলো আবারও নতুন করে সামনে আসবে।”
তবে বার্নহ্যাম স্টারমারের চেয়ে বেশি সফল হতে পারেন—এমনটা ভাবার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। স্টারমারের মধ্যে যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের দক্ষতার ঘাটতি ছিল, বার্নহ্যামের মধ্যে তা রয়েছে ভরপুর। কয়েকজন মন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে স্টারমার তাদের সাথে কখনো কোনো অর্থপূর্ণ বা গঠনমূলক আলোচনাতেই যাননি। অন্যদিকে বার্নহ্যাম গত কয়েক সপ্তাহ কাটিয়েছেন এমপিদের মন জোগানোর কাজে। রাজনীতিতে কেবল কৌশলগত বার্তা দেওয়ার মূল্য যে কতখানি, তা তিনি ভালোভাবেই বোঝেন। নীতিমালায় কোনো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি না দিয়েও তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন যে, ফিলিস্তিনের পক্ষে দলের যে অবস্থান ছিল, তা পর্যাপ্ত ছিল না। ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালীন তিনি যেভাবে বিরোধী দল ও ব্যবসায়ীদের সাথে মিলেমিশে কাজ করেছেন। স্টারমারকে তা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
অনুগত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার সেরা উপায় হলো একজন দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা। বার্নহ্যামের মধ্যে তার কিছু লক্ষণও ফুটে উঠছে। তার টিমের সদস্যরা জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি এমপিদের কথা শুনবেন এবং নীতিগত পরিকল্পনায় তাদের যুক্ত করবেন ঠিকই, তবে এমপিদের প্রতিটা বিদ্রোহের সুরেই তিনি নতিস্বীকার করবেন না। ব্যাকবেঞ্চের বহু এমপির বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি অভিবাসন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া চালু রাখবেন। তবে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বা অজনপ্রিয় হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার খুব একটা অভিজ্ঞতা তার নেই। ফলে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিলে তিনি খুব দ্রুত ভেঙে পড়তে পারেন—এমন একটি ঝুঁকি থেকেই যায়।

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে প্রথমেই আপনার যা জানা দরকার তা হলো—তিনি অতীতে পার্ট-টাইম ডিজে হিসেবে কাজ করেছেন।
আচ্ছা মানছি এটি হয়তো আপনার প্রথমেই জানার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আর হ্যাঁ, সেই ডিজে-র কাজটাও তিনি করেছিলেন একটা দাতব্য সংস্থার তহবিল সংগ্রহের জন্য।
গত ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তাকে অনেকেই একজন বাস্তববাদী, বন্ধুবৎসল এবং অমায়িক মানুষ হিসেবে দেখেন—যার সাথে কিয়ার স্টারমারের চেয়ে জোহরান মামদানির মিলটাই বেশি।
যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ম্যানচেস্টারে দীর্ঘদিন মেয়রের দায়িত্বে থাকা বার্নহ্যাম গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের ওপর জোর দিয়ে সর্বসাধারণের ভালোবাসা কুড়িয়েছিলেন। এমনকি ইংল্যান্ডের শিল্প-পরবর্তী নগরীগুলোর পক্ষে তার জোরালো কণ্ঠস্বর তাকে ‘দ্য কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরের রাজা) উপাধিও এনে দিয়েছিল।
গত সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে বার্নহ্যাম সেইসব জনকল্যাণমুখী ভাবধারাকেই আবারও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল ব্রিটেনের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং গৃহহীনতার সমস্যা সমাধানের প্রতি প্রতিশ্রুতি।

প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ক্ষমতায় বসে বার্নহ্যাম বিদ্যুতের বিলের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, এর ফলে আগামী অক্টোবর থেকে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল বছরে গড়ে ৪৫ পাউন্ড পর্যন্ত কমে আসবে।
তবে মার্কিন গণমাধ্যম ভক্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন না যে, বার্নহ্যামের নীতিমালা তার পূর্বসূরি স্টারমারের চেয়ে খুব একটা আলাদা হবে। তারা দুজনেই ব্রিটেনের মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির সদস্য। এছাড়া যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার মধ্যকার মূল কূটনৈতিক সম্পর্কেও বিশেষ কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ গুরুত্ব বহন করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে বার্নহ্যাম বলেন, “আমার মনে হয় ব্যক্তিত্বের দিক থেকে আমি নিজেও কম নই।”
তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এখন বার্নহ্যামকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তা হলো—- ‘তিনি কী পারবেন নিজের দলের এমপিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে?’ এটিই এখন যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টারমার সময়ে-অসময়ে সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত এমপিদের ওপর চাপিয়ে দিতেন। দলের সদস্যদের মতপার্থক্যের প্রতি তিনি কখনোই সহনশীলতা দেখাননি। এমনকি স্টারমারের নীতিমালার বিরোধিতা করায় ১৩ জন ব্যাকবেঞ্চার এমপিকে সংসদীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে কৌশলটি কাজে আসেনি।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্টারমারের পাওয়া বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা তিনি বলতে গেলে হেলায় হারিয়েছেন। বুঝিয়ে রাজি করানোর বদলে চাপের মুখে ভাতা কাটার মতো বিতর্কিত নীতি পাস করানোর চেষ্টা করায় শেষ পর্যন্ত তাকে চরম বিব্রতকর পিছুটান নিতে হয়েছে।

নীতিগত নানা ব্যর্থতা আর জনমনে অজনপ্রিয়তা তো ছিলই, তবে আগামী ২০ জুলাই স্যার স্টারমারের পদত্যাগের মূল কারণ হলো— নিজ দলীয় এমপিদের আস্থা হারানো।
বার্নহ্যাম অবশ্য ভিন্ন এক পথের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, তিনি নিজের নীতিগত পরিকল্পনার বিষয়ে কিছুটা মুখচোরা থাকলেও, এমপিরা যাতে দলে নিজেদের গুরুত্ব অনুভব করতে পারেন, সেই প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি খোলামেলাই ব্যক্ত করেছেন।
অবশ্য বার্নহ্যাম তার সবচেয়ে চরমপন্থী অবস্থান থেকে পিছিয়ে এসেছেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত চাপানোর ‘হুইপিং’ প্রথা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। তার মতে, এটি ‘ভালো মানুষদের ভণ্ড বানিয়ে দেয়।’ কিন্তু তা ছিল নির্ভেজাল এক বিপর্যয়ের প্রেসক্রিপশন।
ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ‘হুইপিং’ ব্যবস্থা হলো মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার এবং এমপিদের দলীয় নীতি অনুযায়ী ভোট দেওয়া নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি। সহজ কথায়, পার্লামেন্টে কোনো প্রস্তাব বা বিলের ওপর যখন ভোটগ্রহণ হয়, তখন দলের এমপিরা যেন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বা বিপক্ষে ভোট না দেন, তা নিশ্চিত করার নামই হুইপিং।
হুইপিং ব্যবস্থার ওপর একটি বইয়ের লেখক সেবাস্টিয়ান হোয়েল দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “হুইপ প্রথা তুলে দিলে হাউস অব কমন্স খুব দ্রুতই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।” জটিল আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অধিকাংশ এমপি নিজ দলের অবস্থান স্পষ্ট জানার বিষয়টি কেবল পছন্দই করেন না, বরং মন্ত্রী, ব্যাকবেঞ্চার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে হুইপরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করেন।
এমপিদের উদ্দেশে বার্নহ্যামের বর্তমান বার্তাটি তুলনামূলক অস্পষ্ট হলেও অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। তিনি ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা মুক্ত আলোচনা বন্ধের কাজে হুইপ ব্যবস্থা ব্যবহার না করার অঙ্গীকার করেছেন। এর বদলে হুইপ অফিস কাজ করবে লেবার পার্টির ‘এইচআর বিভাগ’ হিসেবে। বার্নহ্যাম আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি এবং তার মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা কমন্সে আয়োজিত ভোটাভুটিতে নিয়মিত অংশ নেবেন, যাতে সহকর্মীরা সরাসরি এসে তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। স্টারমারের সময় এমনটা কখনোই দেখা যায়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাজের জায়গায় নিয়মিত যাওয়া আর কেবল অমায়িক আচরণ করাই কিন্তু সব নয়। নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে গিয়ে যে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে তাকে পড়তে হবে, বার্নহ্যাম তা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পেরেছেন কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো গত এক দশকে ওয়েস্টমিনস্টারে জেঁকে বসা বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার সংস্কৃতি। লন্ডনের কুইন মেরী ইউনিভার্সিটির ফিলিপ কাউলির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নতুন নির্বাচিত সরকারগুলোর মধ্যে বর্তমান সরকারকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটাভুটিতে দলীয় এমপিদের বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একের পর এক পরিবর্তন এবং নীতিমালার ঘনঘন রদবদল এমপিদের শিখিয়েছে যে, জেদ ধরে রাখতে পারলে শেষ পর্যন্ত নিজেদের দাবি আদায় করা সম্ভব।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে পদোন্নতির প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় হতাশ এমপিদের সামলানো। আপাতত লেবার পার্টির এমপিরা বার্নহ্যাম প্রশংসায় পঞ্চমুখ—এমনকি যারা অতীতে তার ভক্ত ছিলেন না, তারাও। শতকরা ৯০ ভাগের বেশি এমপি তার মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছেন এবং প্রকাশ্য সমালোচনার একটি শব্দও কারও মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে না।
কিন্তু একবার তিনি তার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে ফেললেই এই দৃশ্যে নিশ্চিত পরিবর্তন আসবে; কারণ বাদ পড়া স্টারমার-ভক্তদের পাশাপাশি পদ না পাওয়া এমপিরাও ব্যাকবেঞ্চে যোগ দেবেন। সর্বশেষ কনজারভেটিভ সরকারের চিফ হুইপ সাইমন হার্ট এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ভবিষ্যতে পদোন্নতির অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা ততটাই কঠিন হয়ে পড়বে।
একটি বিরূপ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নীতিগত জটিল সমস্যা সংসদে এমন এক লেবার পার্টি তৈরি করেছে যা আপস বা সমঝোতার প্রতি চরম বিমুখ। স্টারমার চেয়েছিলেন ব্যাকবেঞ্চে একদল অনুগত বাহিনী গড়ে তুলতে, যারা তার প্রতিটি পদক্ষেপকে চোখ বন্ধ করে সমর্থন দেবে। কিন্তু তার বদলে এমন বহু এমপি এসে জুটেছেন যারা অত্যন্ত কম ভোটের ব্যবধানে জিতে এসেছেন। তারা আগামী নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ এবং কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের দায়ভার নিতে একদমই নারাজ। এক দায়িত্বরত মন্ত্রীর মতে, “কেয়ারের জন্য যেসব টানা-পোড়েন সামলানো কঠিন ছিল, সেগুলো আবারও নতুন করে সামনে আসবে।”
তবে বার্নহ্যাম স্টারমারের চেয়ে বেশি সফল হতে পারেন—এমনটা ভাবার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। স্টারমারের মধ্যে যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের দক্ষতার ঘাটতি ছিল, বার্নহ্যামের মধ্যে তা রয়েছে ভরপুর। কয়েকজন মন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে স্টারমার তাদের সাথে কখনো কোনো অর্থপূর্ণ বা গঠনমূলক আলোচনাতেই যাননি। অন্যদিকে বার্নহ্যাম গত কয়েক সপ্তাহ কাটিয়েছেন এমপিদের মন জোগানোর কাজে। রাজনীতিতে কেবল কৌশলগত বার্তা দেওয়ার মূল্য যে কতখানি, তা তিনি ভালোভাবেই বোঝেন। নীতিমালায় কোনো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি না দিয়েও তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন যে, ফিলিস্তিনের পক্ষে দলের যে অবস্থান ছিল, তা পর্যাপ্ত ছিল না। ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালীন তিনি যেভাবে বিরোধী দল ও ব্যবসায়ীদের সাথে মিলেমিশে কাজ করেছেন। স্টারমারকে তা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
অনুগত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার সেরা উপায় হলো একজন দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা। বার্নহ্যামের মধ্যে তার কিছু লক্ষণও ফুটে উঠছে। তার টিমের সদস্যরা জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি এমপিদের কথা শুনবেন এবং নীতিগত পরিকল্পনায় তাদের যুক্ত করবেন ঠিকই, তবে এমপিদের প্রতিটা বিদ্রোহের সুরেই তিনি নতিস্বীকার করবেন না। ব্যাকবেঞ্চের বহু এমপির বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি অভিবাসন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া চালু রাখবেন। তবে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বা অজনপ্রিয় হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার খুব একটা অভিজ্ঞতা তার নেই। ফলে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিলে তিনি খুব দ্রুত ভেঙে পড়তে পারেন—এমন একটি ঝুঁকি থেকেই যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক নতুন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড়ে এসে পৌঁছেছে। চীনের উদীয়মান স্টার্টআপ ‘মুনশট এআই’ তাদের তৈরি নতুন এআই মডেল ‘কিমি কে৩’ উন্মোচন করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বহু অর্থায়নে পরিচালিত শীর্ষস্