চার মাস বয়সী এক কন্যা শিশুকে নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের মেঝেতে টানা তিন রাত কাটাতে হয়েছে কুড়িগ্রামের কচাকাটার বাসিন্দা সুমি আক্তারকে। চতুর্থ দিনে একটি শয্যা মিললেও সেখানে ওই শিশুটিকে একাই থাকতে দেওয়া সম্ভব হয়নি, অন্য তিনটি শিশুর সাথে একই শয্যা ভাগাভাগি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।
রমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের বর্তমান চিত্রটি ঠিক এমনই করুণ। হাসপাতালটির শিশু বিভাগে নিবন্ধিত শয্যা সংখ্যা মাত্র ৮৬টি। অথচ প্রতিদিন গড়ে ২৬০ থেকে ৩০০ জন শিশু রোগী ভর্তি থাকছে এখানে, যা অনুমোদিত ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুন।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে মেঝেতে এবং একই বেডে একাধিক শিশুকে গাদাগাদি করে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর যেমন চরম মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের মতো ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু বিভাগে অনুমোদিত ১৫০ জন নার্সের পদের বিপরীতে বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৫০ জনের মতো। সেপ্টেম্বর মাসেই হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত শিশুদের কেউ হামে আক্রান্ত ছিল না বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
ওয়ার্ড ১০-এর ইনচার্জ নার্স ডলি খাতুন জানান, তার ওয়ার্ডে মাত্র ৪০টি শয্যা রয়েছে, কিন্তু প্রতিনিয়ত ১৮০ জনের মত শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। শীতকালে শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বাড়ার সাথে সাথে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান তিনি।
এছাড়া, নবজাতকদের জন্ডিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফটোথেরাপি মেশিনের তীব্র সংকট রয়েছে। গাইবান্ধার ইসমাইল হোসেন জানান, তার নবজাতক সন্তান ৩১ দিন ধরে চিকিৎসাধীন। অনেক সময় একটি মেশিনের নিচেই দুটি শিশুকে রেখে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
রমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এএনএম তানভীর চৌধুরী বলেন, “ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় একই শয্যায় তিন-চারজন বা তারও বেশি শিশুকে গাদাগাদি করে রাখতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কয়েক গুন বেড়ে যাচ্ছে।”
৭ বছরেও চালু হয়নি ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল
রমেক হাসপাতালের এই তীব্র ভিড় ও দুর্ভোগ কমানোর লক্ষ্যেই বিভাগীয় শহরের নগর ভবনের কাছে প্রায় সাত বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল ১০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল। সেখানে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, ল্যাবরেটরি, অপারেশন থিয়েটার ও কেবিনের সুবিধা রয়েছে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণের সাত বছর পার হয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালের জুনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ৬৫৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি পদ সৃজনের প্রস্তাব পাঠানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বর্তমানে হাসপাতালটিতে কেবল সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ সেবা চালু রয়েছে। কিন্তু ভর্তি ও অন্যান্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ওয়াজেদ আলী বলেন, “সম্প্রতি হাসপাতালটির জন্য তিন ট্রাক আসবাবপত্র এসেছে। তবে কবে নাগাদ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া যাবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর।”
চিকিৎসকরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের এই বিশেষায়িত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা গেলে রমেক হাসপাতালের ওপর রোগী সামলানোর এই অস্বাভাবিক চাপ অনেকটাই কমে আসত।