মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ইরান যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন? কেন? মুখে ইরানকে পৃথিবীকে থেকে মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন– এ বিষয়টি ট্রাম্প হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, ২০২৬ সালের মে মাসের প্রথমার্ধে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই উত্তেজনার অবসান হবে কিসে, কীভাবে?
নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক ডেভিড ই. স্যাঙ্গার এবং স্টিভেন এরলাঙ্গার-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে ইতি টানার ঘোষণা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত হোয়াইট হাউসের বাগাড়ম্বরপূর্ণ দাবি এবং যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফলের মধ্যকার ব্যবধানকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ মে হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা করেন যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এবং এটি এখন সমাপ্ত। রুবিওর মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টা এখন কেবল একটি রক্ষণাত্মক এবং মানবিক অপারেশন। তবে এই দাবির পেছনে যে বিশাল ফাঁক রয়েছে তা স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় যে, যুদ্ধ বিরতির এক মাস পরেও আকাশে মিসাইল উড়ছে এবং মার্কিন রণতরীগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান নিয়মিত আক্রমণ চালাচ্ছে।
ডেভিড ই. স্যাঙ্গার তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধকে তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছেন এবং একে কোনোমতে ধামাচাপা দিতে চাইছেন। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প যে পাঁচটি বড় লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে কেবল ইরানের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যটিই অর্জিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। বাকি চারটি লক্ষ্য– ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করা, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোকে সমর্থন বন্ধ করতে বাধ্য করা এবং ইরানি শাসনের পরিবর্তন ঘটানো– এখনো অধরা রয়ে গেছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পরেও ইরানের অর্ধেকের বেশি ক্ষেপনাস্ত্র এবং মিসাইল লঞ্চার অক্ষত আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের পারমাণবিক মজুত এখনও অক্ষত এবং তারা বর্তমানে আগের চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
ইরানে ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্সস্টিভেন এরলাঙ্গারের প্রতিবেদনে ইরানের প্রতি ট্রাম্পের এই ‘ম্যাজিক ফর্মুলা’ বা জাদুর কাঠির সন্ধানের সমালোচনা করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছিল যে, ‘সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ’ এবং বিমান হামলা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ইরানের মনোবিজ্ঞান এবং তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার ফল। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর ইরান প্রজেক্টের ডিরেক্টর আলী ভায়েজ এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনি উভয়েই মত দিয়েছেন যে, ইরান দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করে আসছে এবং তাদের কাছে দেশের জিডিপির চেয়ে শাসন ব্যবস্থার টিকে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের ধারণা ছিল যে, ইরান তাদের তেল মজুত রাখার জায়গা হারাবে এবং কয়েক দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে ইরানের এখনও কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধকে ‘সমাপ্ত’ ঘোষণার পেছনে কেবল সামরিক নয়, বরং গভীর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। ডেভিড স্যাঙ্গার উল্লেখ করেছেন যে, মার্কিন কংগ্রেসের ‘ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট’ অনুযায়ী ৬০ দিনের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন, যা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এছাড়া তার নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি বিভক্ত হয়ে পড়ছিল। কারণ ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি আমেরিকাকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে বের করে আনবেন। আগামী সপ্তাহে তার পরিকল্পিত চীন সফরের আগে তিনি বিশ্বকে দেখাতে চান যে আমেরিকা বিজয়ী হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি এখন উন্মুক্ত। এই কারণেই ট্রাম্প তার ভাষায় পরিবর্তন এনে যুদ্ধকে কখনো ‘এক্সকারশন’ (ভ্রমণ), কখনো ‘ডিটোর’ (পথ পরিবর্তন), আবার কখনো ‘মিনি ওয়ার’ বলে অভিহিত করছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালিতে এখনো উত্তেজনা বিরাজমান এবং কোনো বাণিজ্যিক জাহাজই বিমার ঝুঁকির কারণে সেখানে প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছে না।
ইরানের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ইরানের নেতারা বিশ্বাস করেন চাপের মুখে নতি স্বীকার করলে ভবিষ্যতে আরও বেশি চাপ আসবে। তাই তারা হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায় এবং এমনকি যুদ্ধের পর পুনর্গঠন কাজের জন্য সেখানে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ‘টোল’ আদায়ের পরিকল্পনাও করছে। স্টিভেন এরলাঙ্গার দেখিয়েছেন যে, ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ট্রাম্প যে ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা ইরানকে উল্টো পরমাণু সমৃদ্ধকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আলী ভায়েজের ভাষায়, ট্রাম্প একটি ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ বা মুখ রক্ষার পথ না দিয়ে কেবল আত্মসমর্পণ দাবি করছেন, যা ইরানের মতো দেশের ক্ষেত্রে কাজ করবে না। ইরান বর্তমানে একটি ‘শীতল শান্তি’ বা ‘কোল্ড পিস’-এর বিনিময়ে তাদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে রাজি নয়।
হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজ। ছবি: রয়টার্সপ্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের বক্তব্য থেকেও প্রশাসনের দ্বিধা স্পষ্ট। হেগসেথ আগে ‘সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী’ হামলার কথা বলতেন। এখন তিনি বলছেন আমেরিকা লড়াই খুঁজছে না। অন্যদিকে জেনারেল কেইন জানিয়েছেন যে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইরান অন্তত ১০ বার মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে বড় ধরনের যুদ্ধের পর্যায়ভুক্ত না করার সিদ্ধান্তটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে আসছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রয়োজনে হোয়াইট হাউস যুদ্ধের সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর এই বিস্তারিত বিশ্লেষণগুলো থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে যুদ্ধের একটি দ্রুত এবং কৃত্রিম সমাপ্তি ঘোষণা করতে চাইছে। যাতে তারা আসন্ন নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে পারে। কিন্তু কৌশলগতভাবে ইরান এখনো পরাজয় স্বীকার করেনি এবং অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও তাদের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার দাবিটি যেমন রাশিয়ার বা চীনের সমর্থন পাচ্ছে না, তেমনি মিত্র দেশগুলোও বড় কোনো সংঘাতে জড়াতে অনীহা প্রকাশ করছে। ট্রাম্পের এই ‘রেটরিক্যাল লিপ’ বা বাগাড়ম্বরপূর্ণ আলাপ সাময়িকভাবে মার্কিন জনমতকে শান্ত করতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং পারমাণবিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগের কারণ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। যুদ্ধের ময়দানে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করার এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংঘাতের কোনো সহজ সমাধান নেই এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত উভয় পক্ষ একটি পারস্পরিক লাভজনক ও সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কমার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।