ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে মুসলমান ভোট বিভক্ত হয়ে পড়া। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা একচ্ছত্রভাবেই মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও মুসলমানদের তৃণমূলের ভোটব্যাংক মনে করা হলেও সেখানে বড় ধরনের বিভক্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ, মুসলমানরা এককভাবে তৃণমূলকে ভোট দেননি। বিজেপির বিরাট কৌশলগত সাফল্য ছিল তৃণমূলের মুসলিম ভোট ব্যাংককে বিভক্ত করে ফেলা।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুও একই কথা বলছে। তাদের প্রতিবেদনের ভাষ্য, মুসলিম ভোটে বিভক্তি ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচনে সরাসরি বিজেপির অনুকূলে গেছে।
বাংলাদেশের কাছের মালদহ জেলায় মোট ভোটারের ৫০ শতাংশ মুসলমান। সেখানকার ১২টি বিধানসভা আসনের ৬টিতেই বড় ব্যবধানে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থীরা। প্রায় একই চিত্র মালদহের পাশের জেলা মুর্শিদাবাদেও। সেখানে ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোট। মুর্শিদাবাদের ২২টি বিধানসভা আসনের ৮টিতে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থীরা।
পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর বামফ্রন্ট শাসন চালিয়েছিল। তখন বলা হতো মুসলিম ভোট ব্যাংকই ছিল সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের শক্তি। ২০১১ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায় তিন দশকেরও বেশি সময়ের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসেন। তখন দেখা গিয়েছিল মুসলিমরা বামফ্রন্টের বদলে বেছে নিয়েছিলেন মমতার তৃণমূলকে। একই প্রবণতা ছিল ২০১৬ ও ২০২১–এর বিধানসভা নির্বাচনেও। ২০২৬–এ এসে সেই ভোট ব্যাংকে বিচ্যুতি বা বিভক্তিই মমতার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
বিভক্ত মুসলিম ভোট যে বিজেপি পেয়েছে, এটা অবশ্য বলা যাচ্ছে না। এবারের নির্বাচনে নওশাদ সিদ্দিকির নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ তৃণমূলের ভোট কাটার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই আইএসএফ এবার বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেধে নির্বাচন করেছে। এবারের নির্বাচনে বামফ্রন্ট–আইএসএফ জোট আসন পেয়েছে ২টি। এ ছাড়াও মালদহের তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক হুমায়ূন কবীর দল থেকে পদত্যাগ করে আমজনতা উন্নয়ন পার্টি নামে একটি দল গড়ে ১৪৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধে। এই জোটও দুটি আসন পেয়েঠছে এবারের নির্বাচনে। আইএসএফ ও আমজনতা উন্নয়ন পার্টি নির্বাচনে ৪.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এই পরিসংখ্যানেই মুসলিম ভোট বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি অনেকটাই পরিষ্কার। অল্প ব্যবধানে তৃণমূল যেসব আসনে হেরেছে, সেসব আসনে এই নওশাদ সিদ্দিকি আর হুমায়ূন কবীরের দলের ভোট বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নামে ভোটার তালিকা সংস্কারের কাজ করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। এই এসআইআর নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ছিল তৃণমূল শিবিরে। তৃণমূলের ভোট নষ্ট করার জন্যই এমনটা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। এই এসআইআরে ৯১ লাখ ভোটার বাদ পড়েছেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। তৃণমূল এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলেও মুসলিমদের অভিযোগ ছিল। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়া নিয়েও ক্ষোভ ছিল। সে কারণে মুসলিমরা বিকল্প হিসেবে আইএসএফ ও আমজনতা উন্নয়ন পার্টিকে ভোট দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্যজুড়ে হিন্দু ভোটারদের মেরুকরণ বিজেপি-কে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছিল, বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলিম ভোটের এই বহুমুখী বিভাজনই তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় নিশ্চিত করল।