চরচা ডেস্ক

বৈশ্বিক সম্পদ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ বৃদ্ধির হার বেশ উঁচুতে রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে–ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ছে অভাবিত গতিতে। ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল এযাবৎকালে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। কিন্তু এই সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতেই কুক্ষিগত হচ্ছে। কারণ, এই একই সময়ে সম্পদ বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল ব্যাংক ইন সুইজারল্যান্ডের (ইউবিএস) প্রকাশিত বার্ষিক ‘গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউবিএস খুব কাছ থেকে বিশ্বজুড়ে সম্পদের গতিমুখ বদলের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে সম্পদ কীভাবে, কেন এবং কোথায় তৈরি হচ্ছে, আর সেই ধারা কত দ্রুত পাল্টাচ্ছে, তা বোঝা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউবিএস বিশ্বের মোট সম্পদের মধ্যে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন (৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি) ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। ১৬০ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি ৫০টির বেশি বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
প্রতিষ্ঠানটির করা বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন ২০২৬-এ বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ বলতে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের কথা ভাবা হয়। কিন্তু একটি দেশের সম্পদ কীভাবে মাপা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরই বদলে দিতে পারে এই তালিকা। একটি দেশের অর্থনীতিকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র দেখা যায় না। গড় সম্পদ বাড়লেও সম্পদের মধ্যম মান কমে গেছে। অর্থাৎ, সমাজে আর্থিক অসাম্য বেড়েছে।
ইউবিএসের প্রতিবেদনের এই অংশটি একটু ব্যাখ্যা করা যাক। গড় সম্পদ হিসাব করা হয় মূলত গাণিতিক গড় দিয়ে। আর মধ্যম সম্পদ বা সম্পদের মধ্যম মান নির্ধারণ করা হয় সম্পদের পরিমাণের তালিকার মধ্যম বিন্দুটি চিহ্নিত করার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ–কোনো জায়গায় থাকা ১০ ব্যক্তির গড় সম্পদ পাওয়া যাবে তাদের মোট সম্পদকে ১০ দিয়ে ভাগ করলে। ধরা যাক জায়গাটিতে থাকা ১০ ব্যক্তির প্রত্যেকেরই সম্পদ ১০০ টাকা করে। তাহলে ওই স্থানের মাথাপিছু গড় সম্পদ হবে ১০০ টাকা। এবার ওই স্থান থেকে একজন বেরিয়ে গেল এবং সেখানে একজন লাখপতি ঢুকল। তখন কী হবে? তখন তাদের গড় সম্পদ এক লাফে বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ১০ টাকা। যদিও ওই স্থানে উপস্থিত বাকি নয়জনের কারও সম্পদই এমনটি ১৫০ টাকাও নয়।
ফলে ইউবিএস যে বলছে, গড় সম্পদ দিয়ে একটি বাজার বা সমাজের আর্থিক অবয়ব সঠিকভাবে পাওয়া যায় না, তা বোধগম্য।
আসা যাক গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৬-এর কাছে। প্রতিবেদনে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ ধনী দেশের তালিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ বৃদ্ধির হারের একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে।

সবচেয়ে ধনী দেশ কোনগুলো?
মাথাপিছু গড় সম্পদের হিসাবে বিশ্বের শীর্ষ ৩০-এ শুরুতেই রয়েছে সুইজারল্যান্ড। দেশটিতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় সম্পদের পরিমাণ ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারেরও বেশি। সেরা পাঁচে সুইজারল্যান্ডের পরই আছে যুক্তরাষ্ট্র, লুক্সেমবার্গ, হংকং ও অস্ট্রেলিয়া।
প্রশ্ন হলো, ধনী দেশের সবাই কি ধনী? এর সোজাসুজি উত্তর হচ্ছে–না।
ইউবিএসের রিপোর্ট বলছে, গড় সম্পদ অনেক সময় কয়েকজন অতিধনীর কারণে অনেক বেশি দেখাতে পারে। তাই মেডিয়ান বা মধ্যম সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন, গড় সম্পদে সুইজারল্যান্ড বিশ্বের এক নম্বরে। কিন্তু মধ্যম সম্পদে দেশটির স্থান অষ্টমে। আবার যুক্তরাষ্ট্র গড় সম্পদে দ্বিতীয় হলেও মধ্যম সম্পদে ২৮তম। অন্যদিকে লুক্সেমবার্গ তিনটি সূচকেই শীর্ষ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে।
অর্থাৎ, একটি দেশের মোট সম্পদ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই সম্পদ কীভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টন হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের সম্পদের কেন্দ্র কোথায়?
২০২৫ সালের শেষে বিশ্বের মোট ব্যক্তিগত সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো আমেরিকা মহাদেশে।
আঞ্চলিক হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকা ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ, এশিয়া-প্যাসিফিক ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা (ইএমইএ) ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
আর দেশভিত্তিক হিসেবে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। একা যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে বিশ্বের ৩৫.৭ শতাংশ ব্যক্তিগত সম্পদ। এই তালিকায় পশ্চিম ইউরোপের অংশ প্রায় ২২ শতাংশ। গ্রেটার চীনের (হংকং, ম্যাকাও, তাইওয়ানসহ) অংশ ১৮.৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেটার চীন মিলিয়েই বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক। তাহলে কি সম্পদের মানচিত্র বদলাচ্ছে? হ্যাঁ, তবে পরিবর্তনটি সরলরৈখিক নয়।
২০২৫ সালে ইউরোপের মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থান এবং সম্পদ বৃদ্ধির কারণে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক সম্পদের অংশ বেড়ে ২৫ শতাংশ থেকে ২৬.৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশ কমে ৩৬ শতাংশ থেকে ৩২.৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, এর একটি বড় কারণ ছিল ডলারের বিপরীতে ইউরোর শক্তিশালী হওয়া। অর্থাৎ, এটি সবসময় অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন নয়, মুদ্রাবিনিময় হারও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এশিয়ার ভেতরেও বদল আসছে
এশিয়াকে একটি একক অঞ্চল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। প্রতিবেদন বলছে, গ্রেটার চীন এখনো বিশ্বের ১৮.৫ শতাংশ সম্পদের মালিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে আরও ১১.৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২০ সালের পর থেকে সম্পদ বৃদ্ধির দিক থেকে কয়েকটি এশীয় দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রকৃত (মুদ্রাস্ফীতি সমন্বিত) গড় সম্পদ ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মধ্যম সম্পদ বৃদ্ধিতে জাপান শীর্ষে রয়েছে, যা ২০২০ সালের পর ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে মধ্যম সম্পদ বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। ভারত ও থাইল্যান্ডেও মধ্যম সম্পদ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থাৎ, এশিয়ার ভেতরে সম্পদের কেন্দ্রও ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। শুধু চীন নয়, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অর্থনীতিও দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে।
২০০০ সালে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর হাতে ছিল বিশ্বের মাত্র ৮.৪ শতাংশ সম্পদ। ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২০২৫ সালে কিছুটা কমে ২৬.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যমতে, এর অর্থ এই নয় যে উদীয়মান দেশগুলো পিছিয়ে পড়ছে। বরং তারা পরিণত অর্থনীতি হওয়ায় তাদের প্রবৃদ্ধি এখন ধীরে ধীরে উন্নত দেশগুলোর গতির কাছাকাছি চলে আসছে।
বিশ্বে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে?
২০২৫ সালে বিশ্বের কোটিপতির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় আরও ১.৫ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইউবিএসের প্রতিবেদনে। সংখ্যার হিসাবে এর অর্থ–প্রায় ১০ লাখ নতুন ডলার মিলিয়নিয়ার (কমপক্ষে ১০ লাখ ডলারের মালিক), অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬৮০ জনেরও বেশি মানুষ মিলিয়নিয়ারের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে পূর্ব ইউরোপ।
এ ক্ষেত্রে অঞ্চলটির দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে লিথুয়ানিয়া (৮ শতাংশ)। এরপর রয়েছে তুরস্ক (৬.৪ শতাংশ), লাটভিয়া (৫.৭ শতাংশ) ও হাঙ্গেরি (৫.৩ শতাংশ)। তবে সবচেয়ে বেশি নতুন মিলিয়নিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৪ লাখ ৪১ হাজারের বেশি নতুন ডলার মিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, দিনে প্রায় ১২০০ জন। এটি বিশ্বের নতুন মিলিয়নিয়ারদের প্রায় অর্ধেকের সমান।
এরপর রয়েছে, যুক্তরাজ্য (৪৩ হাজার ১৩৯ জন), ফ্রান্স (৩৪ হাজার ৬০৪ জন) স্পেন (৩২ হাজার ৭০৭ জন) ও জাপান (৩১ হাজার ৪২৮ জন)। এই তালিকায় ৬-এ আছে ভারত। সেখানে নতুন ধনীর সংখ্যা ৩১ হাজার ৩৩ জন।

ইউবিএসের গত বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ডে প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজনেরও বেশি মানুষ মার্কিন ডলারের হিসাবে কোটিপতি। এ বছর লুক্সেমবার্গে এই অনুপাতটি প্রতি ছয়জনে একজন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ হংকংয়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় একজনের কাছে ১০ লাখ বা তার বেশি মার্কিন ডলারের সম্পদ রয়েছে। এর ঠিক পরপরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডস, যেখানে প্রায় ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোটিপতি।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে এই হার ৪.৫ শতাংশের কাছাকাছি, আর জাপান, স্পেন ও ইতালিতে এটি ২.৫ থেকে ২.৮ শতাংশের মধ্যে।
উন্নত জীবনযাত্রার মানসম্পন্ন ছোট অর্থনীতি বা দেশগুলোতেই সাধারণত কোটিপতিদের এই সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
ইউবিএসের এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বিশ্বের সম্পদের কেন্দ্র এখনো মূলত যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ এবং চীনের হাতেই রয়েছে। তবে সেই মানচিত্র স্থির নয়।
একদিকে ইউরোপ আবারও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে এশিয়ার ভেতরে সম্পদের নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো গত দুই দশকে বৈশ্বিক সম্পদে নিজেদের অংশ তিন গুণেরও বেশি বাড়িয়েছে।
অর্থাৎ, বিশ্বের সম্পদের ভারসাম্য ধীরে ধীরে আরও বহুমুখী হচ্ছে। ভবিষ্যতের প্রশ্ন আর শুধু কে সবচেয়ে ধনী তা নয়, বরং পরবর্তী সম্পদ কোথায় সৃষ্টি হবে এবং কোন অঞ্চল সেই সম্পদ ধরে রাখতে পারবে, সেটিই আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বৈশ্বিক সম্পদ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ বৃদ্ধির হার বেশ উঁচুতে রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে–ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ছে অভাবিত গতিতে। ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল এযাবৎকালে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। কিন্তু এই সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতেই কুক্ষিগত হচ্ছে। কারণ, এই একই সময়ে সম্পদ বৈষম্য আরও গভীর হয়েছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল ব্যাংক ইন সুইজারল্যান্ডের (ইউবিএস) প্রকাশিত বার্ষিক ‘গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউবিএস খুব কাছ থেকে বিশ্বজুড়ে সম্পদের গতিমুখ বদলের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে সম্পদ কীভাবে, কেন এবং কোথায় তৈরি হচ্ছে, আর সেই ধারা কত দ্রুত পাল্টাচ্ছে, তা বোঝা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউবিএস বিশ্বের মোট সম্পদের মধ্যে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন (৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি) ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। ১৬০ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি ৫০টির বেশি বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
প্রতিষ্ঠানটির করা বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদন ২০২৬-এ বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ বলতে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের কথা ভাবা হয়। কিন্তু একটি দেশের সম্পদ কীভাবে মাপা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরই বদলে দিতে পারে এই তালিকা। একটি দেশের অর্থনীতিকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র দেখা যায় না। গড় সম্পদ বাড়লেও সম্পদের মধ্যম মান কমে গেছে। অর্থাৎ, সমাজে আর্থিক অসাম্য বেড়েছে।
ইউবিএসের প্রতিবেদনের এই অংশটি একটু ব্যাখ্যা করা যাক। গড় সম্পদ হিসাব করা হয় মূলত গাণিতিক গড় দিয়ে। আর মধ্যম সম্পদ বা সম্পদের মধ্যম মান নির্ধারণ করা হয় সম্পদের পরিমাণের তালিকার মধ্যম বিন্দুটি চিহ্নিত করার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ–কোনো জায়গায় থাকা ১০ ব্যক্তির গড় সম্পদ পাওয়া যাবে তাদের মোট সম্পদকে ১০ দিয়ে ভাগ করলে। ধরা যাক জায়গাটিতে থাকা ১০ ব্যক্তির প্রত্যেকেরই সম্পদ ১০০ টাকা করে। তাহলে ওই স্থানের মাথাপিছু গড় সম্পদ হবে ১০০ টাকা। এবার ওই স্থান থেকে একজন বেরিয়ে গেল এবং সেখানে একজন লাখপতি ঢুকল। তখন কী হবে? তখন তাদের গড় সম্পদ এক লাফে বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ১০ টাকা। যদিও ওই স্থানে উপস্থিত বাকি নয়জনের কারও সম্পদই এমনটি ১৫০ টাকাও নয়।
ফলে ইউবিএস যে বলছে, গড় সম্পদ দিয়ে একটি বাজার বা সমাজের আর্থিক অবয়ব সঠিকভাবে পাওয়া যায় না, তা বোধগম্য।
আসা যাক গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট ২০২৬-এর কাছে। প্রতিবেদনে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ ধনী দেশের তালিকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ বৃদ্ধির হারের একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে।

সবচেয়ে ধনী দেশ কোনগুলো?
মাথাপিছু গড় সম্পদের হিসাবে বিশ্বের শীর্ষ ৩০-এ শুরুতেই রয়েছে সুইজারল্যান্ড। দেশটিতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় সম্পদের পরিমাণ ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারেরও বেশি। সেরা পাঁচে সুইজারল্যান্ডের পরই আছে যুক্তরাষ্ট্র, লুক্সেমবার্গ, হংকং ও অস্ট্রেলিয়া।
প্রশ্ন হলো, ধনী দেশের সবাই কি ধনী? এর সোজাসুজি উত্তর হচ্ছে–না।
ইউবিএসের রিপোর্ট বলছে, গড় সম্পদ অনেক সময় কয়েকজন অতিধনীর কারণে অনেক বেশি দেখাতে পারে। তাই মেডিয়ান বা মধ্যম সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন, গড় সম্পদে সুইজারল্যান্ড বিশ্বের এক নম্বরে। কিন্তু মধ্যম সম্পদে দেশটির স্থান অষ্টমে। আবার যুক্তরাষ্ট্র গড় সম্পদে দ্বিতীয় হলেও মধ্যম সম্পদে ২৮তম। অন্যদিকে লুক্সেমবার্গ তিনটি সূচকেই শীর্ষ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে।
অর্থাৎ, একটি দেশের মোট সম্পদ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই সম্পদ কীভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টন হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের সম্পদের কেন্দ্র কোথায়?
২০২৫ সালের শেষে বিশ্বের মোট ব্যক্তিগত সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো আমেরিকা মহাদেশে।
আঞ্চলিক হিসাব অনুযায়ী, আমেরিকা ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ, এশিয়া-প্যাসিফিক ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা (ইএমইএ) ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
আর দেশভিত্তিক হিসেবে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। একা যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে বিশ্বের ৩৫.৭ শতাংশ ব্যক্তিগত সম্পদ। এই তালিকায় পশ্চিম ইউরোপের অংশ প্রায় ২২ শতাংশ। গ্রেটার চীনের (হংকং, ম্যাকাও, তাইওয়ানসহ) অংশ ১৮.৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেটার চীন মিলিয়েই বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক। তাহলে কি সম্পদের মানচিত্র বদলাচ্ছে? হ্যাঁ, তবে পরিবর্তনটি সরলরৈখিক নয়।
২০২৫ সালে ইউরোপের মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থান এবং সম্পদ বৃদ্ধির কারণে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক সম্পদের অংশ বেড়ে ২৫ শতাংশ থেকে ২৬.৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশ কমে ৩৬ শতাংশ থেকে ৩২.৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, এর একটি বড় কারণ ছিল ডলারের বিপরীতে ইউরোর শক্তিশালী হওয়া। অর্থাৎ, এটি সবসময় অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন নয়, মুদ্রাবিনিময় হারও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এশিয়ার ভেতরেও বদল আসছে
এশিয়াকে একটি একক অঞ্চল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। প্রতিবেদন বলছে, গ্রেটার চীন এখনো বিশ্বের ১৮.৫ শতাংশ সম্পদের মালিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে আরও ১১.৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২০ সালের পর থেকে সম্পদ বৃদ্ধির দিক থেকে কয়েকটি এশীয় দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রকৃত (মুদ্রাস্ফীতি সমন্বিত) গড় সম্পদ ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মধ্যম সম্পদ বৃদ্ধিতে জাপান শীর্ষে রয়েছে, যা ২০২০ সালের পর ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে মধ্যম সম্পদ বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। ভারত ও থাইল্যান্ডেও মধ্যম সম্পদ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থাৎ, এশিয়ার ভেতরে সম্পদের কেন্দ্রও ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। শুধু চীন নয়, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অর্থনীতিও দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে।
২০০০ সালে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর হাতে ছিল বিশ্বের মাত্র ৮.৪ শতাংশ সম্পদ। ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছায়। তবে ২০২৫ সালে কিছুটা কমে ২৬.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যমতে, এর অর্থ এই নয় যে উদীয়মান দেশগুলো পিছিয়ে পড়ছে। বরং তারা পরিণত অর্থনীতি হওয়ায় তাদের প্রবৃদ্ধি এখন ধীরে ধীরে উন্নত দেশগুলোর গতির কাছাকাছি চলে আসছে।
বিশ্বে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে?
২০২৫ সালে বিশ্বের কোটিপতির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় আরও ১.৫ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইউবিএসের প্রতিবেদনে। সংখ্যার হিসাবে এর অর্থ–প্রায় ১০ লাখ নতুন ডলার মিলিয়নিয়ার (কমপক্ষে ১০ লাখ ডলারের মালিক), অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬৮০ জনেরও বেশি মানুষ মিলিয়নিয়ারের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। মিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে পূর্ব ইউরোপ।
এ ক্ষেত্রে অঞ্চলটির দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে লিথুয়ানিয়া (৮ শতাংশ)। এরপর রয়েছে তুরস্ক (৬.৪ শতাংশ), লাটভিয়া (৫.৭ শতাংশ) ও হাঙ্গেরি (৫.৩ শতাংশ)। তবে সবচেয়ে বেশি নতুন মিলিয়নিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৪ লাখ ৪১ হাজারের বেশি নতুন ডলার মিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, দিনে প্রায় ১২০০ জন। এটি বিশ্বের নতুন মিলিয়নিয়ারদের প্রায় অর্ধেকের সমান।
এরপর রয়েছে, যুক্তরাজ্য (৪৩ হাজার ১৩৯ জন), ফ্রান্স (৩৪ হাজার ৬০৪ জন) স্পেন (৩২ হাজার ৭০৭ জন) ও জাপান (৩১ হাজার ৪২৮ জন)। এই তালিকায় ৬-এ আছে ভারত। সেখানে নতুন ধনীর সংখ্যা ৩১ হাজার ৩৩ জন।

ইউবিএসের গত বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ডে প্রতি সাতজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজনেরও বেশি মানুষ মার্কিন ডলারের হিসাবে কোটিপতি। এ বছর লুক্সেমবার্গে এই অনুপাতটি প্রতি ছয়জনে একজন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ হংকংয়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় একজনের কাছে ১০ লাখ বা তার বেশি মার্কিন ডলারের সম্পদ রয়েছে। এর ঠিক পরপরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডস, যেখানে প্রায় ৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোটিপতি।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে এই হার ৪.৫ শতাংশের কাছাকাছি, আর জাপান, স্পেন ও ইতালিতে এটি ২.৫ থেকে ২.৮ শতাংশের মধ্যে।
উন্নত জীবনযাত্রার মানসম্পন্ন ছোট অর্থনীতি বা দেশগুলোতেই সাধারণত কোটিপতিদের এই সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
ইউবিএসের এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বিশ্বের সম্পদের কেন্দ্র এখনো মূলত যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ এবং চীনের হাতেই রয়েছে। তবে সেই মানচিত্র স্থির নয়।
একদিকে ইউরোপ আবারও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে এশিয়ার ভেতরে সম্পদের নতুন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো গত দুই দশকে বৈশ্বিক সম্পদে নিজেদের অংশ তিন গুণেরও বেশি বাড়িয়েছে।
অর্থাৎ, বিশ্বের সম্পদের ভারসাম্য ধীরে ধীরে আরও বহুমুখী হচ্ছে। ভবিষ্যতের প্রশ্ন আর শুধু কে সবচেয়ে ধনী তা নয়, বরং পরবর্তী সম্পদ কোথায় সৃষ্টি হবে এবং কোন অঞ্চল সেই সম্পদ ধরে রাখতে পারবে, সেটিই আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।