Advertisement Banner

একদলীয় শাসনের পথে ভারত

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
একদলীয় শাসনের পথে ভারত
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ফেসবুক

ভারতের চার রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল দেশটির রাজনীতির বাঁক বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদি ‘কংগ্রেস মুক্ত’ ভারতের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালে এসে মনে হচ্ছে শুধু কংগ্রেস নয়, বিজেপি-বিরোধী মুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন মোদি ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৫ মে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল ‘কংগ্রেস-মুক্ত ভারত’, যা বর্তমানে একটি ‘বিজেপি-বিরোধীমুক্ত ভারতে’র দিকে ধাবিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধীদের পরাজয় ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এক দশকের বেশি সময় আগে যখন নরেন্দ্র মোদি জাতীয় রাজনীতিতে আবির্ভূত হন, তখন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের প্রাচীনতম দল কংগ্রেসকে নির্মূল করা। ২০১৪ সালে লোকসভায় কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ২০৬ থেকে এক লাফে ৪৪-এ নেমে আসা ছিল সেই পতনের সূচনা। বর্তমানে মোদির নেতৃত্বাধীন জোট ২১টি রাজ্যে ক্ষমতায় থাকলেও কংগ্রেসের হাতে রয়েছে মাত্র ৪টি রাজ্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটি এসেছে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, যখন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকের এম কে স্টালিনের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতারও পরাজয় ঘটেছে। এর ফলে ১৯৭০-এর দশকের জরুরি অবস্থার পর ভারতকে আবারও একটি ‘এক-নেতা নির্ভর রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে বিরোধীদের হাতে নামমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা অবশিষ্ট রয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যে বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বর্তমানে বিজেপির শতবর্ষী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দর্শনের কাছে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিজেপির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দলটির আদর্শগত অঙ্গীকার এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তারা বিভিন্ন বর্ণ ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত হলেও বিজেপি তাদের ঐক্যবদ্ধ করার রণকৌশলে সফল হয়েছে। দাতা গোষ্ঠীদের কাছে বিজেপির ব্যবসাবান্ধব ভাবমূর্তি দলটিকে আর্থিক ও কাঠামোগতভাবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বিজেপি সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: ফেসবুক
বিজেপি সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: ফেসবুক

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জোট ৪২.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে কিছুটা ধাক্কা খেলেও, এরপর থেকে তারা নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুগত শ্রীনিবাস রাজুর মতে, ২০২৪ সালের মোদি ছিলেন এক ‘আহত বাঘের’ মতো, যিনি বর্তমানে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তার রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিচ্ছেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিজেপি কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে নতুন ভোটারদের কাছে পৌঁছেছেন, যা তাদের সাফল্যের পথ প্রশস্ত করেছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, মোদি সরকার কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার মতো কৌশল অবলম্বন করেছে।

প্রতিবেদনে মোদি সরকারের কৌশলী পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দুই মেয়াদে নোট বাতিল, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ বা অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের মতো বিতর্কিত ও আলোচিত প্রকল্পগুলোতে গুরুত্ব দিলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তারা রাজ্য নির্বাচনে জয়ের জন্য জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। হরিয়ানা এবং মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপির বিজয় বিরোধীদের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোকে ভেঙে দুই টুকরো করে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া বিজেপির কৌশলগত সক্ষমতাকেই তুলে ধরে।

অন্যদিকে, দিল্লির আম আদমি পার্টির (এএপি) অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর লাগাতার অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনাকে বিরোধীরা মোদির রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে লাখ লাখ নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ায় এবং ২৭ লাখ মানুষের ভোট দিতে না পারাটা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের পেছনে কেবল ভোটার তালিকা নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং মুসলিম তোষণ নীতির অভিযোগ সাধারণ ভোটারদের একটি অংশকে বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে বিজেপির প্রবেশ তেমন জোরালো না হলেও সেখানে এম কে স্টালিন এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ই বিজয় নামের এক অভিনেতার কাছে পরাজিত হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে ছিল। ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং ব্যাপক বেকারত্বের শিকার।

নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ফেসবুক
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ফেসবুক

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৫০ লাখ যুবক ডিগ্রি অর্জন করলেও মাত্র ২৮ লাখ মানুষ চাকরি পাচ্ছেন। এতসব অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভোটারদের অসন্তোষ মোদির বিরুদ্ধে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরাথ মনে করেন, বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করে; তারা প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জনতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে বিরোধী শিবিরের ফাটলগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম।

বর্তমানে কংগ্রেসের নেতৃত্বে থাকা রাহুল গান্ধী একটি দুর্বল বিরোধী জোটের প্রধান হিসেবে রয়েছেন, যাকে মোদি এবং তার সমর্থকরা প্রায়ই একজন ‘বংশের উত্তরাধিকারী’ হিসেবে উপহাস করেন। ২০২৯ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে মোদির বয়স হবে ৭৮ বছর। তিনি তখন দলের নেতৃত্বে থাকবেন কি না–তা অনিশ্চিত। তবে সুগত শ্রীনিবাস রাজুর মতে, ভারত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব জরুরি। কারণ কেউই কার্যত একদলীয় শাসন পছন্দ করে না। প্রতিবেদন শেষে এই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন মোদির অপরাজেয় ভাবমূর্তি এবং বিজেপির সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে, যা দেশটিকে একটি নিরঙ্কুশ একক আধিপত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সম্পর্কিত